সমাজের ভূতরা বাস্তবের মঞ্চে
সব ভূত কি শুধু ভয় দেখায়? কিছু ভূত হয়তো কথা বলতে চায়। জানাতে চায় সেই সব অত্যাচারের কথা, যে কথাগুলি মানুষ মুখে বলতে পারেনি। সমাজের নানা অন্ধকার, বঞ্চনা আর গোপন জবানবন্দি থেকে জন্ম নেওয়া সেই ভূতেদেরই খুঁজে ফিরেছেন ঋকসুন্দর বন্দ্যোপাধ্যায়। লিখেছেন ভূতেদের অভিধান। এ বার সেই অভিধানের পাতার ভূতেরা উঠে আসছে মঞ্চে— ঋকসুন্দরের কণ্ঠে তারা শোনাবে তাদের কাহিনি। গল্প বলার এই যাত্রার শুরুটা বেশ ঘরোয়া। ছেলে ঋভানকে ঘুম পাড়ানোর সময়ে গল্প বলতে-বলতে একদিন তাঁর মনে হয়েছিল, ‘আমাদের এখানে গল্প শুনতে চাওয়া মানুষ প্রচুর, ভয়ের গল্পের তো বটেই! আর ভয়ের গল্প বলতে আলাদা একটা অভিনয় যোগ হয়েই যায়।’ সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয়েছে সরাসরি গল্প বলার আসর। কলকাতা ও শহরতলিতে একের পর এক আয়োজনে এ বার মুখোমুখি বসছেন গল্পকথক ও শ্রোতা— আর মাঝখানে থাকবে ভয়, রহস্য ও অন্ধকারের এক জগৎ।
ভূতের গল্প শোনানোর এই পদ্ধতিতে তাই শুধু গল্পের বিষয়বস্তু নয়, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে গল্প বলার ধরনও। একটি গল্প কখনও কেবল শব্দে তৈরি হয় না। গল্পের সঙ্গে শ্রোতার কল্পনা, গল্পকথকের কণ্ঠ, থেমে যাওয়া, নিঃশব্দ মুহূর্ত এবং চারপাশের আবহ— সব মিলিয়েই তৈরি হয় ভয়ের অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতাকেই আরও জীবন্ত করে তুলতে আয়োজনগুলিতে যুক্ত হয়েছে শব্দ, সঙ্গীত এবং সেটের পরিকল্পনা। গল্পের সেই ঝুলি নিয়ে ঋকসুন্দর ঘুরে বেড়াচ্ছেন শহরের আনাচে-কানাচে, ক্যাফেগুলিতে।
কালীঘাটের পরে হাওড়া, বেলেঘাটার বিভিন্ন ক্যাফেতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এই আসর। সেখানে শুধু গল্প শোনানো নয়, গল্পের সঙ্গে তৈরি হবে একটি বিশেষ আবহ। শব্দ ও আবহ নির্মাণে থাকছেন আকাশ ও ইমন, আর সেট ডিজ়াইনের দায়িত্বে সোমদত্তা। ফলে শ্রোতারা শুধু গল্প শুনবেন না, গল্পের পরিবেশের মধ্যেও প্রবেশ করবেন।
এই গল্প তৈরির নেপথ্যে রয়েছে পারিবারিক সহযোগিতাও। ঋকসুন্দর জানান, তাঁর স্ত্রী রাকাও বিভিন্ন প্লট তৈরিতে তাঁকে সাহায্য করেন। ফলে একটি গল্পের জন্ম থেকে তার পরিবেশনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকছে ভাবনা, আলোচনা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা। ভূতের গল্পকে নিছক চমক বা ভয়ের উপকরণ না বানিয়ে তার মধ্যে মানুষের গল্প, সমাজের অন্ধকার এবং অস্বস্তিকর বাস্তবকে জায়গা দেওয়াই এই প্রচেষ্টার বৈশিষ্ট্য।
এরই মধ্যে একটি অভিনব ভৌতিক ফিউশনের কথাও ভাবা হচ্ছে। হ্যালোউইন এবং ভূত চতুর্দশীকে মিলিয়ে সেই আয়োজনের নাম— ‘হ্যালচতুর্দশী’। পাশ্চাত্যের হ্যালোউইনের উৎসব-সংস্কৃতি ও বাংলার ভূত চতুর্দশীর লোকবিশ্বাস— দুই ভিন্ন ধারাকে মিলিয়ে নতুন ভৌতিক অভিজ্ঞতা তৈরি করার ভাবনা রয়েছে এই আয়োজনে। তবে ‘হ্যালচতুর্দশী’ এখনও ভাবনার পর্যায়ে। আপাতত গল্প বলা চলবে। বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে ভূতেরা বসবে শ্রোতার সামনে, আর গল্পকথকের কণ্ঠে ফিরে আসবে তাদের হারিয়ে যাওয়া কথাগুলি। কারণ ঋকসুন্দরের ভূতেরা শুধু ভয় দেখাতে আসে না— তারা কিছু কথা বলতেও আসে। আর শুনতে আসেন দর্শকরা।