১৪০ বছর পেরিয়ে আজও জনপ্রিয় 'বৃহৎ মনসামঙ্গল'
প্রশান্ত পাল, পুরুলিয়া
অবিভক্ত মানভূমের কাশীপুরে আঠারো শতকে রচিত হয়েছিল এক মঙ্গল কাব্য। বৃহৎ মনসামঙ্গল নামে সেই কাব্যের রচয়িতা চৈতন্যদাস মণ্ডল। সাকিন বনকাটি, থানা গৌরাঙ্গডি। পয়ার ছন্দে লিখিত হলেও লঘু ত্রিপদী বা দীর্ঘ ত্রিপদীতেও কয়েকটি অধ্যায় রচিত হয়েছে। গ্রাম্য সারল্যে রচিত এই উপাখ্যান বহুদিন ধরে জঙ্গলমহল তথা রাঢ় বঙ্গের মানুষের কাছে সমাদৃত।
গবেষকরা জানাচ্ছেন, সে কালের গৌরাঙ্গডি থানার (অধুনা কাশীপুর) বনকাটি গ্রামের বাসিন্দা চৈতন্যদাস দেবী মনসার খুব ভক্ত ছিলেন। সকালে স্নান করে বাড়ির পাশে সরস্বতী মন্দিরে বসে তিনি এই কাব্য রচনা করেন। গ্রামটি আদ্রা-মেদিনীপুর রেলপথের সিরজাম রেলস্টেশনের খুব কাছে। এই মঙ্গলকাব্যের রচনাকাল ১৮৭৯–তে। জেলার বিশিষ্ট পুঁথি গবেষক প্রবীর সরকার জানাচ্ছেন, কালজ্ঞাপক শ্লোকে স্পষ্ট করে কাব্যের রচনাকাল লিখে গিয়েছেন চৈতন্যদাস, ‘জনরব শাস্ত্র আদি অন্বেষণ করে/রচিল চৈতন্যদাস মনসার বরে।/দিক পৃষ্ঠে বসু ইন্দু শক নিরূপণ/কোষ পৃষ্ঠে বারমাস সালের গণন।/মিথুন রাশির মাসে তৃতীয় দিনেতে/ আদিত্য তনয় বারে সপ্তমী তিথিতে।/সমাপ্ত হৈল গ্রন্থ তৃতীয় প্রহরে/।’
প্রবীর বলছেন, ‘যে সঙ্কেত রয়েছে তা বিশ্লেষণ করলে মেলে ১০ দিক, ৮ অর্থে অষ্টবসু এবং ১ ইন্দু। অর্থাৎ ১০৮১। অঙ্কস্য বামাগতির তত্ত্বে উল্টে গিয়ে এটি হবে ১৮০১ শকাব্দ। শকাব্দের সঙ্গে ৭৮ যোগ করলে খ্রিস্টাব্দ মেলে। এই কাব্যের রচনাকাল ১৮৭৯–তে।’ পঞ্চকোট রাজত্বে তখন মহারাজা নীলমণি সিংদেওয়ের সময়কাল। সিপাই বিদ্রোহের সময়ে যিনি পুরুলিয়া ট্রেজারি লুট, নীলকুঠি পোড়ানো, জেল ভেঙে কয়েদিদের মুক্ত করার অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী। তাঁর সময়ে (১৮২৩-১৮৯৮) চৈতন্যদাস এই কাব্য রচনা করেন।
পুরুলিয়া শহরের বাসিন্দা স্বরূপ দত্ত বলছেন, ‘২১১ গৃষ্ঠার অখণ্ড এই বৃহৎ মনসামঙ্গল প্রকাশ করেছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষ দোলগোবিন্দ দত্ত। বনকাটি গ্রামে গিয়ে জেনেছি চৈতন্যদাসের ছেলে কিছু অর্থের বিনিময়ে বইয়ের মূল পাণ্ডুলিপি দিয়েছিলেন দোলগোবিন্দকে। তৎকালীন মানভূমে তাঁর বইয়ের দোকান ছিল। পাশপাশি ছিলেন প্রকাশকও। প্রায় ১৪০ বছর ধরে পুনর্মুদ্রণ প্রমাণ করে বইটির জনপ্রিয়তা।’
ঘটনা হলো, বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্যের তালিকায় এই বৃহৎ মনসামঙ্গলের উল্লেখ নেই। দুই বাংলা জুড়ে ৭৮ জন মনসামঙ্গল কাব্যের রচয়িতার কথা জানা যায়। সেই তালিকায় ব্রাত্য চৈতন্যদাস। পুরুলিয়া সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বাংলা বিভাগের পাঠ্যক্রমে এই মঙ্গলকাব্যের কয়েকটি পালা যুক্ত করেছে।