মহসিন নকভির হাত থেকে ট্রফি না নেওয়ার কারণ স্পষ্ট করল BCCI
মহিলা এশিয়া কাপের ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে ৭২ রানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি মহসিন নকভির হাত থেকে ট্রফি গ্রহণ…
মহিলা এশিয়া কাপের ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে ৭২ রানে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি মহসিন নকভির হাত থেকে ট্রফি গ্রহণ করেনি ভারতীয় মহিলা দল। এই ঘটনা ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন করে বিতর্ক। এবার পুরো বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI)।
বিসিসিআইয়ের সচিব দেবজিৎ সইকিয়া সোমবার জানিয়েছেন, নকভির কাছ থেকে ট্রফি না নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল সম্পূর্ণ সচেতন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের আবেগের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
আগে থেকেই এসিসিকে জানানো হয়েছিল
সইকিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, ফাইনালের আগেই ভারতীয় দলের ট্রফি বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলকে জানিয়ে দিয়েছিল বিসিসিআই। তিনি বলেন, দেশের পরিস্থিতি এবং মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া আবেগ বিবেচনা করেই বিসিসিআই মনে করেছিল, প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে ভারতীয় দলের ট্রফি গ্রহণ করা উপযুক্ত হবে না। বিসিসিআই সচিবের বক্তব্য, এটি কোনও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং পরিস্থিতি বিবেচনা করে বোর্ডের নেওয়া একটি দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান।
‘খেলোয়াড়, টুর্নামেন্ট বা ক্রিকেটের বিরুদ্ধে নয়’
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সইকিয়া স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত কোনও খেলোয়াড়, এশিয়া কাপ বা ক্রিকেটের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য, “এটি একটি দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত, যা আমরা যে অবস্থান বজায় রেখেছি তারই প্রতিফলন। এটি খেলোয়াড়, টুর্নামেন্ট বা খেলার বিরুদ্ধে ছিল না।”
Advertisements
২০২৫ সালের এশিয়া কাপেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। পাহালগামে সন্ত্রাসবাদী হামলায় ২৬ জনের মৃত্যুর পর ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে। সেই বছর পুরুষদের এশিয়া কাপ জেতার পর সূর্যকুমার যাদবের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলও মহসিন নকভির কাছ থেকে ট্রফি নেয়নি। এরপর ২০২৬ সালের মহিলা এশিয়া কাপের ফাইনালেও সেই অবস্থান বজায় রাখল বিসিসিআই।
ভারত এশিয়া কাপ খেলল কেন?
ট্রফি বিতর্কের পাশাপাশি আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে, যদি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক এতটাই তিক্ত হয়, তাহলে ভারত এশিয়া কাপে অংশ নিল কেন? এই বিষয়ে সইকিয়া জানান, বহুদেশীয় প্রতিযোগিতায় ভারতের অংশগ্রহণ এবং ট্রফি গ্রহণের বিষয় দুটি সম্পূর্ণ আলাদা। ভারত এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে নিজেদের ক্রীড়া সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করেছে। ভারত সরকারের অনুমোদিত নীতির আওতায় বহুদেশীয় প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান। সইকিয়ার বক্তব্য, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রতি ভারতের দায়বদ্ধতা বা খেলার চেতনার সঙ্গে কোনও আপস করা হয়নি।
ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালের এপ্রিলের পাহালগাম হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। মে মাসে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সব ধরনের ম্যাচ বয়কট করা উচিত কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে মতভেদ রয়েছে। তবে সইকিয়া জানিয়েছেন, ভারত সরকার যে বহুদেশীয় প্রতিযোগিতায় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার অনুমতি দিয়েছে, সেই ক্রীড়া সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা ভারত পালন করবে।
ট্রফি নয়, মাঠের সাফল্যই বড় কথা
ভারতীয় দল ট্রফি হাতে নিয়ে ছবি তুলতে না পারলেও দলের পারফরম্যান্স নিয়ে বিসিসিআই অত্যন্ত সন্তুষ্ট। সইকিয়ার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ভারতীয় মহিলা দল মাঠে নিজেদের কাজ নিখুঁতভাবে করেছে। শ্রীলঙ্কাকে ৭২ রানে হারিয়ে এশিয়া কাপ জয়ের মাধ্যমে হরমনপ্রীত কৌরের দল নিজেদের দায়িত্ব সম্পূর্ণ করেছে বলেই মনে করছেন বিসিসিআই সচিব। তিনি বলেন, ভারতীয় মহিলা দল যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সেটিই করেছে। অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে এশিয়া কাপ জিতেছে তারা। গোটা দেশ এবং বিসিসিআই দলের এই সাফল্যে গর্বিত এবং এই অর্জন সম্পূর্ণভাবে খেলোয়াড় ও ভারতীয় ক্রিকেটের।
এবার লক্ষ্য এশিয়ান গেমস
এশিয়া কাপের সাফল্যের পর ভারতীয় মহিলা দলের সামনে এবার আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। হরমনপ্রীত কৌরের দল জাপানের উদ্দেশে রওনা হবে এবং এশিয়ান গেমসে নিজেদের সোনা ধরে রাখার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে। হ্যাংঝৌয়ে অনুষ্ঠিত আগের এশিয়ান গেমসে ভারতীয় মহিলা দল সোনা জিতেছিল। এবার সেই সাফল্য ধরে রাখাই দলের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। সইকিয়াও জানিয়েছেন, এখন বিসিসিআইয়ের পুরো নজর এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতির দিকে। এই মুহূর্তে কোনও বিতর্ক বা অন্য কোনও বিষয়কে দলের প্রস্তুতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না। অর্থাৎ, ট্রফি বিতরণী নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বিসিসিআইয়ের বার্তা স্পষ্ট, এশিয়া কাপে অংশগ্রহণ ছিল ক্রীড়া দায়বদ্ধতার অংশ, আর মহসিন নকভির হাত থেকে ট্রফি না নেওয়া ছিল দেশের পরিস্থিতি ও আবেগ বিবেচনায় নেওয়া একটি আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত।