প্রথম সব কিছু – অনীক দত্ত জীবন ও স্মৃতিকথা
এই সময়েই আমি প্রথম নাটক করি। নাটক করার জন্যই ‘ডিবেটিং সোস্যাইটি’র নাম বদল করে ‘ডিবেটিং অ্যান্ড ড্রামাটিক সোসাইটি’ করা হল। ইংরাজি ও বাংলা ভাষায় এখান থেকেই বেশ কিছু প্রযোজনা মঞ্চস্ত হয়। মঞ্চে আমার প্রথম নির্দেশনার হাতেখড়িও হয়ে গেল এখানেই। স্যামুয়েল ব্রেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ নাটকটি আমি পরিচালনা করে মঞ্চস্ত করলাম, যার বাংলা অনুবাদ হল ‘ঈশ্বরবাবু আসছেন’। সব কাগজে সেই নাটকের খবর বেরিয়েছিল। সেই সময়ের অনেক নাট্য ব্যক্তিত্বের প্রশংসার সঙ্গে সঙ্গে আমরা কল শো’ও পেয়েছিলাম।
কলেজেই প্রথম আমার লেখা কবিতা প্রকাশিত হয়। ওখানেই প্রথম নাটকও করি কিন্তু কখনোই আমার মনে হয় নি, আমি শুধুই কবিতা লিখব বা শুধুমাত্র নাটক করেই বাঁচব। আঁকতে পারতাম, আঁকতে ভালোবাসতাম। আঁকা নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে ছিল কিন্তু অন্যদিকে মাথায় সিনেমার পোকা বাসা বাঁধতে শুরু করল। বিভিন্ন ধরণের সিনেমা দেখতে লাগলাম। আমাদের ছোটবেলায় বেশিরভাগই ছিল বড়দের ছবি। সামান্য অন্তরঙ্গ দৃশ্য থাকলেই অনেক বাবা মা সিনেমা হলের মধ্যে তাদের সন্তানের চোখ দুটো হাত দিয়ে চেপে ধরতেন, ফলে আমাদের বেছে বেছে তথাকথিত বাচ্চাদের ছবিই দেখতে হত। তখন ইলেভেন কি টুয়েলভে পড়ি। একদিন বন্ধুদের সঙ্গে ‘মিলোস ফোরম্যানের’ ‘ওয়ান ফ্লু ওভার দ্য কাকুস নেস্ট’ ছবিটা দেখে ফেললাম, ব্যস এই ছবিটাই প্রথম আমার ভাবনা চিন্তাগুলোকে ওলোট পালোট করে দিল। ছবি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করল। পরে দূরদর্শনে ছবি দেখানো শুরু হলে গোগ্রাসে দূরদর্শন গিলতে শুরু করলাম। কোনও অনুষ্ঠানই বাদ দিতাম না। সেখানে হিন্দি বাংলা অনেক ছবি দেখতে পেতাম। বাংলা ছবির মধ্যে উত্তম-সুচিত্রা, তপন সিনহা, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার এবং সত্যজিৎ রায়কে দেখতে পেলাম। অন্যদিকে তুলসী চক্রবর্তী, উত্তমকুমার, সাবিত্রী চ্যাটার্জী, রবি ঘোষ, উৎপল দত্ত বা সৌমিত্র চ্যাটার্জীদের মতো মানুষের অভিনয় দেখে অবাক হয়ে যেতাম। সত্যজিৎ রায়ের বেশ কিছু ছবি আমার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করল। আমি ছবি করার কথা ভাবতে শুরু করলাম। এরমধ্যেই সত্যজিৎ রায়ের ‘অপরাজিত’ দেখে বেশ ভয় পেলাম। ওইরকম অসাধারণ একটা কাজ দেখার পর আমার মনে হল, এরপর আর কি হতে পারে ? এই ছবি দেখার পর আমার ছবি কি কেউ দেখবে ? আমাদের ইন্ডাস্ট্রির অবস্থাও তখন মোটেই ভাল ছিল না। গৌতম ঘোষ, অপর্ণা সেনদের মতো কয়েকজনকে বাদ দিলে বাংলা ছবি একটা গড়পড়তা ধারা বজায় রেখে এগিয়ে চলেছে। এই সময় অপর্ণা সেনের ‘৩৬ চৌরঙ্গি লেন’ দেখে মনে হল, এখানেও তো ভাল কাজ হচ্ছে। ইচ্ছে থাকলে এখানেও ভাল কাজ করা যায়। বিজ্ঞাপনের কাজ তো আমার ছিলই। এই কাজে স্থানীয় ও জাতীয় স্তরে আমার একটু নামধাম হয়েছিল। নিজের উদ্যোগেই কলকাতায় বিজ্ঞাপনের কাজ বাড়ানোর চেষ্টা করতে শুরু করলাম। বিভিন্ন কারনে অনেক পরে আমি কাহিনিচিত্র তৈরি করতে আসি।
একটা সময় আমাদের দুটো চা-বাগান ছিল। আমি আমার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিলাম। বাবা, মা, আত্মীয়স্বজনরা ভাবত আমি পারিবারিক ব্যবসাটাই করব। একটা ব্যক্তিগত পারিবারিক সমস্যার জন্য পরিবার থেকে আমি মাকে নিয়ে অন্যত্র চলে এলাম। প্রায় তেজ্য পুত্রের মতো অবস্থা। এটাই আমার জীবনে প্রথম বড় আঘাত।
অনেক কিছু পেয়েছি, আবার পাইও নি কিন্তু আমার প্রথম বড় পাওয়া হল আমার সন্তান, আমার মেয়েকে পাওয়া। সেই বড় পাওয়াটাও খুব সহজে পাই নি। আমার মেয়ে জন্মানোর সময় ওর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের যে নাড়ি সেটা ওর গলায় জড়িয়ে যায়। খুবই ভয়ংকর একটা অবস্থা তৈরি হয়। খবর শুনে আমি হাসপাতালে পৌঁছতেই ডাক্তার বললেন, ক্রিটিকাল, এক্ষুণি সিজারিয়ন করতে হবে। একটা অজানা আশঙ্কায় স্থির থাকতে পারছিলাম না। সেদিন সব বাধা পেরিয়ে আমার মেয়ের জন্ম হয়েছিল, আমি আমার মেয়েকে পেয়েছিলাম, যেটা ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অনুভূতি। জীবনের অনেক পাওয়াই বেশ উজ্জ্বল হলেও কোনোটাই আমার মেয়েকে পাওয়ার অনুভূতিকে পেরিয়ে যেতে পারে