উত্তর কোরিয়াকে ঠেকাতে পরমাণু সাবমেরিন, ইন্দো-প্যাসিফিকেও নজর দক্ষিণ কোরিয়ার
উত্তর কোরিয়ার (South Korea) ক্রমবর্ধমান সাবমেরিন ও পরমাণু সক্ষমতার মোকাবিলায় পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন বহর তৈরির পরিকল্পনা করছে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে সিউলের এই পরিকল্পনা এখন আর শুধু কোরীয় উপদ্বীপের আশপাশের জলসীমায় প্রতিরোধ গড়ে তোলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, দীর্ঘ সময় জলের নিচে থাকার ক্ষমতার কারণে ভবিষ্যতে এই সাবমেরিনগুলি ইন্দো-প্যাসিফিকের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ সুরক্ষা এবং মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে বৃহত্তর জলতলের সহযোগিতাতেও ভূমিকা নিতে পারে।
এই পরিকল্পনা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু এখন বদলে গিয়েছে। প্রশ্ন শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন প্রয়োজন কি না, তা নয়। বরং এই সাবমেরিনগুলি কোথায় এবং কী ধরনের অভিযানে ব্যবহার করা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কেন পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন?
হ্যানইয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব পাবলিক পলিসির অধ্যাপক এবং সাবমেরিন বিশেষজ্ঞ মুন গুন-সিক মনে করেন, পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল দীর্ঘ সময় জলের নিচে থাকার ক্ষমতা।
তাঁর মতে, ডিজেলচালিত সাবমেরিনকে ব্যাটারি চার্জ করার জন্য দিনে একাধিকবার জলের উপরিভাগের কাছাকাছি আসতে হয়। সেই সময় শত্রুর নজরে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন দীর্ঘ সময় জলের নিচে থাকতে পারে এবং প্রয়োজন হলেই কেবল উপরে উঠতে হয়।
Advertisements
উত্তর কোরিয়া নিজেও পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরির দিকে এগোচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিনগুলির গতি ও দীর্ঘ সময় জলের নিচে থাকার ক্ষমতার সঙ্গে প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনের পক্ষে পাল্লা দেওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মূল লক্ষ্য উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিন
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তাবিত সাবমেরিনগুলির প্রধান লক্ষ্য থাকবে উত্তর কোরিয়ার পানির নিচে থাকা পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে নজরদারি করা এবং প্রয়োজন হলে প্রতিরোধ করা।
বিশেষ করে পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিনগুলিকে দীর্ঘ সময় ধরে অনুসরণ করার ক্ষেত্রে পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন বড় সুবিধা দিতে পারে। প্রচলিত সাবমেরিনের তুলনায় বেশি সময় পানির নিচে থেকে অভিযান চালানোর ক্ষমতা সিউলের নৌবাহিনীর নজরদারি ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে মুনের মতে, ভবিষ্যৎ বহরের দায়িত্ব শুধু কোরীয় উপদ্বীপের জলসীমায় সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।
ভারত মহাসাগর থেকে মালাক্কা প্রণালী
দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি বহনকারী জাহাজগুলি ভারত মহাসাগর এবং মালাক্কা প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে আসে। ফলে হরমুজ প্রণালী বা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বড় ধরনের নিরাপত্তা সঙ্কট তৈরি হলে দীর্ঘপাল্লার অভিযানে পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন মোতায়েন করা যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এই ধরনের সক্ষমতা দক্ষিণ কোরিয়াকে শুধু নিজের উপকূল রক্ষার ক্ষেত্রেই নয়, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ দিতে পারে।
ইন্দো-প্যাসিফিকে বাড়তে পারে মার্কিন সহযোগিতা
দক্ষিণ কোরিয়ার পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন ভবিষ্যতে মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জলতলের সহযোগিতার পরিধিও বাড়াতে পারে। সেজং ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট চেং সিয়ং-চ্যাংয়ের মতে, উত্তর কোরিয়ার পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন মোকাবিলাই থাকবে প্রধান লক্ষ্য। তবে এর পাশাপাশি এই বহর উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং দক্ষিণ কোরিয়া-মার্কিন জোটকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তাঁর মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার এই সক্ষমতা চিনের কৌশলগত হিসাবেও প্রভাব ফেলবে এবং শেষ পর্যন্ত ইন্দো-প্যাসিফিকে মার্কিন কৌশলকেও সমর্থন করতে পারে।
ওয়াশিংটনের প্রশ্ন, সিউলের জবাব কী?
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেও প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল সম্প্রতি বলেছেন, পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন কেনার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার একটি ‘যথার্থ কারণ’ এবং পরিষ্কার অপারেশনাল পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
এর আগে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যদি সাবমেরিনগুলি মূলত কোরীয় উপদ্বীপের কাছাকাছি জলসীমাতেই পরিচালিত হয়, তাহলে এই ধরনের অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।
এর ফলে বিতর্কটি আরও তীব্র হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া কি শুধুমাত্র উত্তর কোরিয়াকে ঠেকানোর জন্য এই সাবমেরিন তৈরি করবে, নাকি ভবিষ্যতে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দীর্ঘপাল্লার অভিযানের জন্যও এগুলিকে প্রস্তুত করবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
২০৩০-এর দশকে প্রথম সাবমেরিন
ওয়াশিংটনের প্রশ্ন থাকলেও সিউল প্রকল্পটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং এই প্রকল্পকে আরও শক্তিশালী ও গঠনমূলক দক্ষিণ কোরিয়া-মার্কিন জোটের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তৈরি বা জলে নামানোর পর্যায়ে যেতে পারে এবং দশকের শেষ দিকে তা নৌবাহিনীতে কমিশন করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মতে, দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার ক্ষমতা এবং উচ্চ গতিশীলতার কারণে এই সাবমেরিন উত্তর কোরিয়ার সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
প্রাথমিক নকশা ও গবেষণার জন্য আগামী বছরের প্রতিরক্ষা বাজেটে ১০০ বিলিয়ন ওন, অর্থাৎ প্রায় ৭৪.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-কে প্রকল্পটি নিয়ে পরামর্শ শুরু করার ইচ্ছার কথাও আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে।
মার্কিন কংগ্রেসেও নজর
এই প্রকল্প নিয়ে ওয়াশিংটনে কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত মূল্যায়নও শুরু হয়েছে। মার্কিন সেনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটি দক্ষিণ কোরিয়ার পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন কর্মসূচি ইন্দো-প্যাসিফিকের নিরাপত্তা, পরমাণু বিস্তারজনিত ঝুঁকি, ব্যয় এবং ভবিষ্যতের দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ হল এই প্রকল্পের কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করা। শুধু সামরিক প্রতিযোগিতা বা প্রতীকী সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য নয়, উত্তর কোরিয়ার হুমকি মোকাবিলার পাশাপাশি সমুদ্রবাণিজ্য সুরক্ষা এবং মিত্রদের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতায় এই সাবমেরিনের বাস্তব ভূমিকা কী হবে, সেটিও পরিষ্কার করতে হবে।
সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগোলে দক্ষিণ কোরিয়ার পরমাণু শক্তিচালিত সাবমেরিন প্রথমে উত্তর কোরিয়া-কেন্দ্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার ক্ষমতা এবং দূরপাল্লার অভিযানের সম্ভাবনার কারণে ভবিষ্যতে তা কোরীয় উপদ্বীপের সীমা পেরিয়ে বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলতল সক্ষমতায় পরিণত হতে পারে।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন