যখন এআই থমকে দাঁড়ায়
তারা নীরবে স্ক্রিনগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। যন্ত্রগুলো সমস্ত সম্ভাব্য জটিলতাকে সংখ্যায় রূপান্তরিত করতে থাকল। মানুষকে আবার অ্যালগরিদম-অনুমোদিত জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চলছে।
মোট কথা, সর্বনাশ থেমে গিয়েছে। তিন সপ্তাহ আগে কোনও সিস্টেম তাদের বলেনি যে তারা পরস্পরের ‘পছন্দের মানুষ’। আসলে ড্রপডাউন মেনু ছাড়া তাদের পছন্দের ধরনটা তারা জানতই না। যান্ত্রিক সহায়তা ছাড়াই ভালোবাসাটা দানা বেঁধে উঠেছিল।
চিত্রা সোফায় গা এলায়। ‘তা হলে কি আমরা ব্রেকআপ করব?’
‘আসলে, এআই সাধারণত ঠিকই বলে’— ধীরে বলে অর্জুন।
চিত্রা একমত হয়। ‘হ্যাঁ, এআই-অ্যাপ আমার কাজি়নের বিয়ের ছ’মাস আগেই ডিভোর্সের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, যা মিলে গিয়েছিল হুবহু।’
‘আগে বলেছিল বলেই ডিভোর্সটা হয়েছিল কি না, কে জানে। অ্যাপ কিন্তু আমাকে এমন কারও সঙ্গে ডেট করতে বলেছিল যার একটা কুকুর আছে, যে প্রতিদিন যোগা করে এবং কথা বলার মাঝে বাধা দেয় না’— অর্জুন বলে।
‘আমি বাধা দিই?’ চিত্রা মিষ্টি করে হাসল।
‘ঘন ঘন।’ অর্জুন হেসে ওঠে।
‘অ্যাপটা কিন্তু বলছে, পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমাদের সম্পর্ক অস্থিতিশীল’— চিত্রা স্পষ্টতই উদ্বিগ্ন।
অর্জুন বলল, ‘পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমার তো পোড়া টোস্টও খাওয়া
উচিত নয়।’
‘তবুও তুমি খাও’— বলল চিত্রা।
‘হ্যাঁ, কী করব!’
তারা দু’জনেই হেসে ওঠে। ব্যাপারটা বেশ বিদ্রোহীসুলভ মনে হয় দু’জনেরই।
অর্জুনের ফোনে নোটিফিকেশন আসতেই থাকে। চিত্রার সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তাবিত বিষয়: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। প্রস্তাবিত উপহার: ফুল— এতে ঝুঁকি
কম। ব্রেকআপের জন্য প্রস্তাবিত সময়: ২-৪ সপ্তাহ।
‘বাহ্। এটা আমাদের হৃদয় ভাঙারও সময়সূচি বানিয়ে ফেলেছে।’ অর্জুন খানিকটা হতাশই হয়।
চিত্রা হেসে ওঠে— তীক্ষ্ণ, ভিতু হাসি।
চিত্রার ফোনের সুপারিশ আরও খারাপ। অর্জুনের আবেগের ক্ষেত্রে শনাক্ত হয়েছে ‘অস্থিরতা’। পারস্পরিক অসন্তোষের সম্ভাবনা: ৮৮%।
অর্জুন বলল, ‘আমার আবেগ কিন্তু একেবারেই রুচিসম্মত।’
চিত্রা হাসল, তার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘আমার ভয়, কথাটা হয়তো সত্যি।’
নীরবতা নেমে এল তাদের মাঝে, এআই-হীন সময়ে তাদের যে কোনও ঝগড়া-যুদ্ধের চাইতেও ভারী।
এ বার তারা যুক্তিবাদী হওয়ার চেষ্টা করল। পরিস্থিতি, আর তাদের সম্পর্ক যাচাই করার জন্য তারা গেল একটি ‘ডেটা-নির্ভর’ ডেটে। রেস্তোরাঁটি এআই-ই সুপারিশ করেছিল। মেনুও অপটিমাইজ় করেছিল এআই। আলোতেও সামঞ্জস্য করা হয়েছিল।
কিন্তু তাদের ভালো লাগল না একদমই। ‘মনে হচ্ছে আমরা নজরদারির মধ্যে আছি।’— চিত্রা ফিসফিস করে বলে।
অর্জুন মাথা নাড়ে— ‘আমার প্রতিটা কথাকে, প্রতিটা রসিকতাকে স্কোর দেওয়া হচ্ছে, মনে হচ্ছে।’
বাড়ি ফেরার পথে তারা ঝগড়া করল, সব কিছু নিয়ে। এমনকী ঝগড়া করা মানেই ব্যর্থতা কি না, তা নিয়েও।
‘হয়তো আমরা জোর করেই অগোছালো সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি’— চিত্রা বলল।
অর্জুন হাঁটা থামিয়ে দেয়। ‘অগোছালো সম্পর্ক মানেই হয়তো সেখানে কিছু একটা জীবিত আছে, এখনও। মসৃণ কিছুকে তো সহজেই অপটিমাইজ় করা যায়।’
চিত্রা আলতো করে হেসে ওঠে— ‘তোমার কথা ফিলোসফির পডকাস্টের মতো শোনাচ্ছে।’
‘আর তুমি কিন্তু সেগুলো শুনছ।’
বাড়িতে ফিরলে এআই-এর আর একটি নোটিফিকেশন আসে: অতিরিক্ত আলাপ-আলোচনা মানসিক ঝুঁকি বাড়ায়।
চূড়ান্ত সুপারিশ: বন্ধুত্বপূর্ণ ভাবে সম্পর্কটা শেষ করুন।
চিত্রা এ বার উপুড় করে রাখল তার ফোন। তারা মেঝেতে বসল। চিত্রা মাথা রাখে অর্জুনের কাঁধে।
‘তোমার কি মনে হয় ভালোবাসা
যুক্তি মেনে হওয়া উচিত?’— অর্জুন জিজ্ঞেস করে।
‘আমাদের হয়তো ডেটার বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত নয়’— চিত্রা বলল।
‘হয়তো’— অর্জুন উত্তর দিলো। ‘কিন্তু তোমাকে বেছে নেওয়ার জন্য আমি কোনও সাহায্য চাই না।’
চিত্রা হাসল, তার পর একটু কাঁদল, তার পর এমন ভাবে তাকে চুমু খেল যেন সে কোনও বিপজ্জনক কিছুকে বেছে নিচ্ছে।