পুরনো যুদ্ধবিমান ও আর্থিক সংকটে পাকিস্তান, বায়ুসেনার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
ঠাণ্ডা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে বিশ্বের বহু দেশের বায়ুসেনার যুদ্ধবিমানের সংখ্যা কমেছে। তবে একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির কারণে বিমানগুলির সক্ষমতা বেড়েছে। ভারতীয় বায়ুসেনার অনুমোদিত শক্তি যেখানে ৪২.৫টি স্কোয়াড্রন, সেখানে বর্তমানে কার্যকর স্কোয়াড্রনের সংখ্যা ৩০টিরও কম। ১৯৯৬ সালে ভারতীয় বায়ুসেনার যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রনের সংখ্যা প্রায় ৪০-এ পৌঁছেছিল বলে নয়াদিল্লিভিত্তিক কাউন্সিল ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ডিফেন্স রিসার্চের তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।
তবে পাকিস্তানের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিমানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি রাখার চেষ্টা করেছে। নতুন বিমান কেনার পাশাপাশি পুরনো বিমান আধুনিকীকরণ করেও সেই সংখ্যাগত শক্তি ধরে রাখা হয়েছে। কিন্তু এখন পুরনো বিমানগুলির আয়ু শেষের দিকে এবং নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কেনার খরচ ক্রমশ বাড়ছে। তার সঙ্গে রয়েছে পাকিস্তানের দুর্বল অর্থনীতি ও বড় ঋণের বোঝা।
বিশ্বজুড়েই কমেছে যুদ্ধবিমানের সংখ্যা
ঠাণ্ডা যুদ্ধের শেষে বড় ধরনের প্রচলিত যুদ্ধের আশঙ্কা কমে যাওয়ায় বহু দেশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় কমিয়েছিল। এই সময়কে বলা হয় ‘পিস ডিভিডেন্ড’। এর প্রভাব পড়ে সামরিক বাহিনীর আকারেও। আমেরিকার মতো বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেটের দেশেও যুদ্ধবিমানের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ঠাণ্ডা যুদ্ধের শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত যুদ্ধবিমান বহরে প্রায় ৪,৫০০টি বিমান ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা অর্ধেকেরও কম বলে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস ম্যাগাজিনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং রয়্যাল এয়ার ফোর্সের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছে। তবে চিন এই প্রবণতার বড় ব্যতিক্রম। গত কয়েক দশকে চিন শুধু বায়ুসেনার আকার বাড়ায়নি, আধুনিক যুদ্ধবিমান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও দ্রুত এগিয়েছে।
Advertisements
রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযান অবশ্য ইউরোপের হিসাব অনেকটাই বদলে দিয়েছে। ন্যাটো সদস্য দেশগুলি এখন প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে। জোটের নতুন লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত খাতে ব্যয়ের দিকে যাচ্ছে। পোল্যান্ড ও লাটভিয়ার মতো দেশ ইতিমধ্যেই সেই স্তরের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
আধুনিক যুদ্ধবিমান কেন এত ব্যয়বহুল?
যুদ্ধবিমানের সংখ্যা কমার পিছনে শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দায়ী নয়। আধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরি, কেনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচও বিশাল। ১৯৯০ সালের তুলনায় বর্তমান প্রজন্মের যুদ্ধবিমান অনেক বেশি দূর থেকে শত্রুকে শনাক্ত করতে পারে, দূরপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, অনেক বেশি নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে এবং বিভিন্ন সেন্সর ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধে অংশ নিতে পারে।
পাইলটদের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণাও আগের তুলনায় অনেক উন্নত। কিন্তু এই প্রযুক্তির প্রতিটি স্তরের সঙ্গে বাড়ছে বিমানের ক্রয়মূল্য, পরিচালন ব্যয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ। ফলে একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান শুধু সামরিক সম্পদ নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দায়ও হয়ে দাঁড়ায়।
পাকিস্তান এতদিন কীভাবে সংখ্যা ধরে রেখেছে?
পাকিস্তান বিমানবাহিনী বিভিন্ন দেশের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে। এর মধ্যে রয়েছে আমেরিকার এফ-১৬, ফ্রান্সের মিরাজ-৩ ও মিরাজ-৫ এবং চিনের তৈরি এফ-৭, জে-১০ এবং জেএফ-১৭।
জেএফ-১৭-এর ক্ষেত্রে পাকিস্তান চিনের সঙ্গে সহযোগিতায় দেশে বিমানটি তৈরি করে। পাকিস্তানের শেষ এফ-৭ স্কোয়াড্রন বর্তমানে জেএফ-১৭ ব্লক-৩-এ রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই পরিবর্তন সম্পূর্ণ হলে জেএফ-১৭-নির্ভর স্কোয়াড্রনের সংখ্যা ছয় থেকে বেড়ে সাত হবে।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর তিনটি এফ-১৬ স্কোয়াড্রনও রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ১৯৮০-এর দশকে এবং একটি প্রায় ২০১০ সালের দিকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
এর পাশাপাশি রয়েছে মিরাজ-৩ ও মিরাজ-৫-এর চারটি স্কোয়াড্রন। পাকিস্তান ১৯৬৭ সালে মিরাজ যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত করা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে সৌদি আরব এবং রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্সের কাছ থেকেও কিছু ব্যবহৃত বিমান সংগ্রহ করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের বহরে যুক্ত হয়েছে চিনের জে-১০সিই যুদ্ধবিমান।
৬টি স্কোয়াড্রন বদলানোর চাপ
এখানেই পাকিস্তানের জন্য বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আগামী কয়েক বছরে দুটি এফ-১৬ এবং চারটি মিরাজ স্কোয়াড্রন, অর্থাৎ মোট ছয়টি স্কোয়াড্রনের যুদ্ধবিমান প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হতে পারে। প্রায় ১৫টি ফ্রন্টলাইন যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রনের মধ্যে ছয়টি স্কোয়াড্রনকে প্রতিস্থাপন করতে হলে সেটি মোট শক্তির প্রায় ৪০ শতাংশের সমান। ফলে নতুন বিমান দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সামনে বড় ধরনের সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
প্রশিক্ষণ ও রূপান্তর ইউনিটগুলিকে ধরলে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান পরিচালনাকারী স্কোয়াড্রনের সংখ্যা প্রায় ২২। কমব্যাট কমান্ডার্স স্কুলে এফ-১৬, জেএফ-১৭ এবং মিরাজের একটি করে স্কোয়াড্রন রয়েছে। এর পাশাপাশি এফ-১৬ এবং জেএফ-১৭ পরিচালনাকারী চারটি অপারেশনাল কনভার্সন ইউনিট রয়েছে। এর বাইরে আকাশপথে আগাম সতর্কীকরণ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং অন্যান্য বিশেষ মিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ইউনিট রয়েছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা পুরনো মিরাজ ও এফ-১৬
পাকিস্তানের পুরনো যুদ্ধবিমানগুলির বয়স এখন বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মিরাজ বহর অত্যন্ত পুরনো। কিছু এফ-১৬-ও তাদের নির্ধারিত টেকনিক্যাল টোটাল লাইফ বা পরিষেবা-জীবনের সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। পাকিস্তানের ‘দেশীয়’ যুদ্ধবিমান কর্মসূচির ক্ষেত্রে সর্বশেষ বড় প্রকাশ্য অর্ডার ছিল ২০২০ সালে। সেই সময় ৫০টি জেএফ-১৭ ব্লক-৩ যুদ্ধবিমানের অর্ডার দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান ২০টি জে-১০ যুদ্ধবিমান সংগ্রহ করেছে এবং সেই সরবরাহের শেষ বিমানগুলিও পেয়েছে। প্রকাশ্যে ঘোষিত অর্ডারগুলির হিসাব ধরলে, নতুন বড় যুদ্ধবিমান কেনার কর্মসূচি না নিলে পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান বহরের সংখ্যা আগামী দিনে কমতে পারে।
জে-৩৫ কি পাকিস্তানের সমাধান হতে পারে?
পাকিস্তান চিনের পঞ্চম প্রজন্মের জে-৩৫ যুদ্ধবিমান পাওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। তবে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক চুক্তি প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়নি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এর আগে চিন থেকে সম্ভাব্য সামরিক সরঞ্জাম কেনার একটি তালিকা সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। পরে সেই পোস্ট মুছে দেওয়া হয়। এর পর থেকেই জে-৩৫ নিয়ে জল্পনা আরও বাড়ে। তবে নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কেনা মানেই শুধু বিমান কেনার খরচ নয়। প্রশিক্ষণ, অস্ত্র, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরো যন্ত্রাংশ, পরিকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয়ও এর সঙ্গে যুক্ত।
চিনের উপর বাড়ছে নির্ভরতা
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানিতে চিনের ভূমিকা আরও বেড়েছে। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম বড় অস্ত্র আমদানিকারক ছিল। ২০১৬ থেকে ২০২০ সময়ের তুলনায় এই সময়ে দেশটির অস্ত্র আমদানি ৬৬ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্বের মোট বড় অস্ত্র আমদানির ৪.২ শতাংশ পাকিস্তানের দখলে ছিল। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ অস্ত্র এসেছে চিন থেকে। আগের পাঁচ বছরের সময়কালে চিনের অংশ ছিল ৭৩ শতাংশ। অর্থাৎ পাকিস্তানের যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জামের ভবিষ্যৎ আধুনিকীকরণে চিনের গুরুত্ব ইতিমধ্যেই অত্যন্ত বেশি।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এত খরচ বহন করবে কীভাবে পাকিস্তান?
এটাই সম্ভবত ইসলামাবাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। পাকিস্তানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে রয়েছে। রয়েছে উল্লেখযোগ্য ঋণের বোঝা এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে পাকিস্তান বিশ্বের প্রায় ৪০তম বৃহত্তম অর্থনীতি। অথচ সামরিক শক্তির বিভিন্ন তালিকায় পাকিস্তানের বিমানবাহিনী বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম হিসেবে স্থান পেয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ পাকিস্তানের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও তার বিমানবাহিনী আকারে অনেক ছোট। একটি বড় সামরিক ট্র্যাকার অনুযায়ী বাংলাদেশের বিমানবাহিনী বিশ্বের ৬৫তম স্থানে রয়েছে। এই তুলনা দেখায়, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে তার বিমানবাহিনীর আকারকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছে।
সংখ্যার লড়াই থেকে আধুনিকতার লড়াই
ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আকাশসেনার সংখ্যাগত ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে পাকিস্তান। পুরনো যুদ্ধবিমান আধুনিকীকরণ এবং নতুন বিমান সংগ্রহের মাধ্যমে সেই লক্ষ্য ধরে রাখার চেষ্টা হয়েছে।
কিন্তু এখন পুরনো বিমানগুলির পরিষেবা-জীবন শেষ হওয়ার পথে। একই সময়ে নতুন যুদ্ধবিমান কেনার খরচ দ্রুত বাড়ছে। ফলে শুধু সংখ্যাগত শক্তি ধরে রাখাই পাকিস্তানের জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
প্রকাশ্যে ঘোষিত নতুন অর্ডারের অভাব এবং পুরনো বহরের অবস্থা দেখে আগামী কয়েক বছর পাকিস্তান বিমানবাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। নতুন বড় যুদ্ধবিমান কর্মসূচি নেওয়া হলে তার অর্থনৈতিক চাপ কতটা বাড়বে, আর তা না হলে যুদ্ধবিমানের সংখ্যা কতটা কমবে, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।
এক কথায়, পাকিস্তানের সামনে সমস্যা শুধু পুরনো যুদ্ধবিমান বদলানোর নয়। একই সঙ্গে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দুর্বল অর্থনীতির মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বড় যুদ্ধবিমান বহর বজায় রাখার জন্য কতটা খরচ করা সম্ভব।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন