৪৮০ কিমি গতির জেট জেরান, রাশিয়ার ড্রোনে বদলাচ্ছে যুদ্ধের অর্থনীতি
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলার (Drone Warfare) কৌশলে বড় পরিবর্তন আনছে রাশিয়া। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে মস্কো জেট-চালিত নতুন প্রজন্মের জেরান ড্রোনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর…
ইউক্রেনের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলার (Drone Warfare) কৌশলে বড় পরিবর্তন আনছে রাশিয়া। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে মস্কো জেট-চালিত নতুন প্রজন্মের জেরান ড্রোনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর তথ্য বিশ্লেষণ করে বিবিসি ভেরিফাই জানিয়েছে, আগস্ট জুড়ে প্রায় প্রতিদিনই এই দ্রুতগতির ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
জুনে জেট-চালিত জেরানের হামলার সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫০। জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১,৬০০-তে। আগস্টে সেই সংখ্যা আরও বেড়ে প্রায় ২,৮০০-তে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে এই নতুন ধরনের ড্রোনের ব্যবহার কয়েক গুণ বেড়েছে।
৪৮০ কিমি প্রতি ঘণ্টার বেশি গতিতে ছুটছে জেরান
পুরনো প্রপেলারচালিত জেরান ড্রোনের তুলনায় নতুন সংস্করণের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হল গতি। নতুন জেট-চালিত জেরান ঘণ্টায় ৩০০ মাইলের বেশি, অর্থাৎ ৪৮০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে উড়তে পারে বলে বিবিসি জানিয়েছে।
গতির এই বৃদ্ধি ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ধীরগতির প্রপেলারচালিত ড্রোন শনাক্ত করার পর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে সেগুলিকে মোকাবিলা করার জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি সময় থাকে। কিন্তু দ্রুতগতির জেরান সেই প্রতিক্রিয়ার সময় অনেকটাই কমিয়ে দেয়। ফলে ইউক্রেনকে এখন নতুন ধরনের প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরির দিকে নজর দিতে হচ্ছে।
Advertisements
নতুন ইন্টারসেপ্টর মিসাইল তৈরির চেষ্টা ইউক্রেনের
ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের উপপ্রধান মেজর জেনারেল ভাদিম স্কিবিৎসকি জানিয়েছেন, নতুন জেরান মোকাবিলায় এমন ইন্টারসেপ্টর মিসাইল প্রয়োজন, যেগুলি দ্রুতগতির এই ড্রোনের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউক্রেনের চারটি সংস্থা ইতিমধ্যেই নতুন জেরান সংস্করণ ধ্বংস করার জন্য তৈরি মিসাইল পরীক্ষা শুরু করেছে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু ড্রোনের সংখ্যাই নয়, আকাশ প্রতিরক্ষার অর্থনীতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে যদি তুলনামূলকভাবে বেশি দামের প্রতিরোধী অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।
ড্রোনের সঙ্গে ডিকয় ও ব্যালিস্টিক মিসাইল
রাশিয়ার নতুন কৌশল শুধু দ্রুতগতির ড্রোন ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মস্কো একই হামলায় একাধিক ধরনের অস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করছে। বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়া এখন সাধারণ ড্রোন, জেট-চালিত দ্রুতগতির ড্রোন, ডিকয় ড্রোন এবং ব্যালিস্টিক মিসাইল একসঙ্গে ব্যবহার করে বড় আকারের হামলা চালাচ্ছে। এই ধরনের জটিল হামলা প্রায় সপ্তাহে একবার দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে একই সময়ে একাধিক ধরনের হুমকি সামলাতে হচ্ছে।
সস্তা ড্রোন ও দামি ক্রুজ মিসাইলের মাঝামাঝি
নতুন জেরান ড্রোনের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু তার গতির কারণে নয়। এর পিছনে রয়েছে যুদ্ধের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব। প্রপেলারচালিত ড্রোন তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং ব্যাপক সংখ্যায় তৈরি করা সম্ভব হলেও সেগুলি ধীরগতির। অন্যদিকে ক্রুজ মিসাইল অনেক দ্রুত এবং কঠিন লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, কিন্তু সেগুলির উৎপাদন খরচও বেশি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বড় সংখ্যায় ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করা ব্যয়বহুল। জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করে রাশিয়া এমন একটি অস্ত্র তৈরি করার চেষ্টা করছে, যা এই দুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ ক্রুজ মিসাইলের কাছাকাছি গতি, কিন্তু ড্রোনের মতো তুলনামূলকভাবে কম খরচে ব্যাপক উৎপাদনের সম্ভাবনা।
আসল লক্ষ্য, আকাশ প্রতিরক্ষাকে চাপে ফেলা
নতুন জেরানের ক্ষেত্রে রাশিয়ার লক্ষ্য সম্ভবত ক্রুজ মিসাইলের সঙ্গে সব দিক থেকে পাল্লা দেওয়া নয়। বরং এমন একটি অস্ত্র তৈরি করা, যা যথেষ্ট দ্রুত এবং একই সঙ্গে এতটাই সস্তা যে সেটি বড় সংখ্যায় ব্যবহার করা যায়। একসঙ্গে বহু ড্রোন ও মিসাইল পাঠানো হলে ইউক্রেনকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কোন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে দামি ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করা হবে। সেই পরিস্থিতিতে ডিকয় ও তুলনামূলক সস্তা ড্রোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। অর্থাৎ একটি দ্রুতগতির ড্রোনকে একা দেখলে বিষয়টি যতটা সরল মনে হয়, বড় হামলার ক্ষেত্রে তার প্রভাব অনেক বেশি।
বদলে যাচ্ছে ড্রোন যুদ্ধের হিসাব
রাশিয়ার নতুন জেরান কৌশল তাই শুধু একটি দ্রুতগতির ড্রোন তৈরির গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার মধ্যে খরচের ভারসাম্য বদলে দেওয়ার চেষ্টা। কম খরচে তৈরি করা যায় এমন ড্রোনকে দ্রুতগতির করে বড় সংখ্যায় পাঠানো এবং তার সঙ্গে ডিকয়, প্রচলিত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ মিসাইল মিশিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষাকে ব্যস্ত রাখাই এই কৌশলের বড় বৈশিষ্ট্য।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে ভবিষ্যতের ড্রোন যুদ্ধে শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নয়, একটি অস্ত্র ধ্বংস করতে প্রতিপক্ষকে কত খরচ করতে হচ্ছে, সেই অর্থনৈতিক হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। রাশিয়ার জেট-চালিত জেরান সেই পরিবর্তনেরই একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন