পুতিনের Aurus Senat কেন ‘চাকার উপর দুর্গ’? রুশ প্রেসিডেন্টের গাড়ির রহস্য
বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রনেতারা যখন কোনও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে যান, তখন তাঁদের কনভয়ও হয়ে ওঠে সেই সফরের অন্যতম আকর্ষণ। ব্রিকস সম্মেলন উপলক্ষে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির…
বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রনেতারা যখন কোনও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে যান, তখন তাঁদের কনভয়ও হয়ে ওঠে সেই সফরের অন্যতম আকর্ষণ। ব্রিকস সম্মেলন উপলক্ষে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ব্যবহৃত অরাস সেনাত এখন নয়াদিল্লিতে। এটি শুধুমাত্র একটি বিলাসবহুল লিমুজিন নয়, বরং রাশিয়ার নিজস্ব প্রযুক্তি, শিল্পক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
পুতিন সাধারণত প্রায় দুই ডজন গাড়ির কনভয়ের সঙ্গে চলাচল করেন। তবে বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত সরকারি গাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হয় অরাস সেনাত। গাড়িটিকে অনেক সময় ‘চাকার উপর দুর্গ’ বলেও বর্ণনা করা হয়।
বিদেশি গাড়ির বদলে রাশিয়ার নিজস্ব লিমুজিন
অরাস সেনাত তৈরি হয়েছে রাশিয়ার কোর্তেজ প্রকল্পের অধীনে। এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল রুশ রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের জন্য বিদেশি গাড়ির বিকল্প তৈরি করা। ২০১৮ সালে অরাস সেনাত প্রথম সামনে আসে। গাড়িটি তৈরি করে অরাস মোটরস, যার সঙ্গে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যামি, সোলার্স জেএসসি এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহির তাওয়াজুন হোল্ডিং যুক্ত রয়েছে। সেনাতের ডিজাইনে সোভিয়েত আমলের জিস-১১০ লিমুজিনের প্রভাব রয়েছে। গাড়িটির উঁচু, সোজা এবং আনুষ্ঠানিক নকশায় রাশিয়ার পুরনো রাষ্ট্রীয় গাড়ির ঐতিহ্যের ছাপ স্পষ্ট।

Advertisements
৫৯৮ হর্সপাওয়ারের শক্তিশালী হাইব্রিড ইঞ্জিন
স্ট্যান্ডার্ড অরাস সেনাতে রয়েছে ৪.৪ লিটারের টুইন-টার্বো ভি৮ হাইব্রিড ইঞ্জিন। এটি প্রায় ৫৯৮ হর্সপাওয়ার শক্তি এবং ৮৮০ এনএম টর্ক উৎপন্ন করতে পারে বলে জানা যায়। ইঞ্জিনের সঙ্গে রয়েছে ৯-স্পিড অটোমেটিক গিয়ারবক্স এবং অল-হুইল ড্রাইভ। এছাড়াও অরাস সেনাতের ভি১২ হাইব্রিড সংস্করণও তৈরি করা হয়েছে। গাড়িটির ওজন এবং আর্মারের কারণে এটি সাধারণ বিলাসবহুল সেডানের মতো হালকা নয়। তারপরও প্রায় ৬ সেকেন্ডে ০ থেকে ১০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে পৌঁছতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সর্বোচ্চ গতি প্রায় ২৪৯ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা হতে পারে।
বুলেট থেকে বিস্ফোরণ, নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় বিষয়
অরাস সেনাতের আসল বিশেষত্ব এর বিলাসিতা নয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যবহারের জন্য তৈরি গাড়িতে মোটা আর্মার, শক্তিশালী বডি স্ট্রাকচার এবং বিশেষ নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং আর্মার-পিয়ার্সিং বুলেট প্রতিরোধ করতে সক্ষম আর্মার, গ্রেনেড বিস্ফোরণ এবং গাড়ির নিচে বিস্ফোরণের প্রভাব সামলানোর ব্যবস্থা। জানালায় রয়েছে বহুস্তরীয় বুলেট-প্রতিরোধী কাচ, যার পুরুত্ব কয়েক সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়াও রয়েছে রান-ফ্ল্যাট টায়ার। অর্থাৎ টায়ার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গাড়ি চলতে পারে। রয়েছে শক্তিশালী ফুয়েল ট্যাঙ্ক, জরুরি নির্গমনের ব্যবস্থা এবং অগ্নিনির্বাপণ প্রযুক্তি। রাসায়নিক হামলার মতো পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে গাড়িতে স্বাধীন অক্সিজেন এবং ফিল্টারিং ব্যবস্থাও থাকার দাবি রয়েছে। ফলে বাইরের পরিবেশ বিপজ্জনক হলেও যাত্রীদের সুরক্ষিত রাখার জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে।
সাধারণ ক্রেতার জন্যও রয়েছে সেনাত
রাষ্ট্রপ্রধানের বিশেষ সংস্করণের পাশাপাশি অরাস সেনাতের বেসামরিক সংস্করণও অত্যন্ত সীমিত সংখ্যায় বিক্রি করা হয়। এর দাম প্রায় ১ কোটি ৮০ লক্ষ রুশ রুবল, ভারতীয় মুদ্রায় আনুমানিক ২.৫ কোটি টাকা। তবে প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত গাড়ির সঙ্গে সাধারণ বেসামরিক সংস্করণের নিরাপত্তা এবং সরঞ্জামের ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকার সম্ভাবনাই বেশি। রাশিয়ার কাছে অরাস সেনাতের গুরুত্ব শুধু একটি গাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মার্সিডিজ-মেবাখ বা রোলস-রয়েসের মতো পশ্চিমা বিলাসবহুল রাষ্ট্রীয় গাড়ির পরিবর্তে রাশিয়ার নিজস্ব একটি বিকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কেন এই গাড়ি এত গুরুত্বপূর্ণ?
পুতিনের অরাস সেনাত এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের হংকি এন৭০১, দুটিই নিজ নিজ দেশের রাষ্ট্রীয় গাড়ি শিল্পের প্রতীক। বিশেষ করে অরাস সেনাতের মাধ্যমে মস্কো দেখাতে চায়, রাষ্ট্রপ্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ এবং বিলাসবহুল গাড়ি তৈরি করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রাশিয়ার নিজেরই রয়েছে।
ব্রিকস সম্মেলনে পুতিনের কনভয়ের অংশ হিসেবে নয়াদিল্লির রাস্তায় অরাস সেনাতের উপস্থিতি তাই শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়। এটি রাশিয়ার নিজস্ব শিল্পক্ষমতা এবং পশ্চিমা গাড়ি নির্মাতাদের উপর নির্ভরতা কমানোর একটি প্রতীকী বার্তাও বহন করছে।
বিশাল আকার, ভারী আর্মার, শক্তিশালী ইঞ্জিন এবং অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে অরাস সেনাতকে সাধারণ বিলাসবহুল গাড়ির সঙ্গে তুলনা করা কঠিন। রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য তৈরি এই গাড়ির মূল উদ্দেশ্য একটাই, সর্বোচ্চ নিরাপত্তার মধ্যে চলাচল নিশ্চিত করা।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন