৬০-এ শাহরুখের Skincare বিজ্ঞাপন! মার্কেটিং চমক, নাকি বদলাচ্ছে সৌন্দর্যের ধারণা?
২০২৬ সালে এসে এমন একটি দৃশ্য হয়তো অনেকের কাছেই অপ্রত্যাশিত। ৬০ বছর বয়সি শাহরুখ খান এবার কোনও সিনেমা বা পুরুষদের পণ্যের বিজ্ঞাপনে নন, তিনি সামনে রয়েছেন একটি স্কিনকেয়ার (Skincare) ক্যাম্পেনের। ফক্সটেলের ‘লেট ইওর গ্লো থ্রু’ প্রচারে বলিউডের বাদশাহকে দেখানোর পর থেকেই অগস্ট মাস থেকে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে জোরদার আলোচনা।
এটি নিছক মার্কেটিংয়ের কৌশল, নাকি সৌন্দর্য ও স্কিনকেয়ারের বাজারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত? প্রশ্নটি উঠছে কারণ এতদিন স্কিনকেয়ারের বিজ্ঞাপনে মূলত মহিলাদেরই কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে দেখা যেত। বয়স বাড়লেও অভিনেত্রীদের অনেক সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন সৌন্দর্যের মূল লক্ষ্য হল আরও কমবয়সি দেখানো। শাহরুখ খানকে সামনে রেখে ফক্সটেলের প্রচার সেই প্রচলিত ধারণাকেই কিছুটা চ্যালেঞ্জ করেছে।
স্কিনকেয়ার কি শুধু মহিলাদের জন্য?
গত এক দশকে ভিটামিন সি, নিয়াসিনামাইড, পেপটাইড, রেটিনল এবং হায়ালুরোনিক অ্যাসিডের মতো উপাদান নিয়ে অসংখ্য স্কিনকেয়ার পণ্য বাজারে এসেছে। ব্র্যান্ডগুলির বিজ্ঞাপনে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ব্যবহার করে ব্রণ, কালো দাগ, ডার্ক সার্কল, সূক্ষ্ম রেখা এবং বলিরেখার মতো সমস্যার সমাধানের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু এই সমস্যাগুলি শুধুমাত্র মহিলাদের হয় না। পুরুষদেরও একই ধরনের ত্বকের সমস্যা থাকে। তবুও সৌন্দর্য ও ত্বকের যত্নের বাজারে পুরুষদের অংশগ্রহণ দীর্ঘদিন তুলনামূলকভাবে পিছনে ছিল।
Advertisements
ফক্সটেলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রোমিতা মজুমদার অবশ্য জানিয়েছেন, শাহরুখ খানের সঙ্গে এই অংশীদারিত্বকে সরাসরি পুরুষদের স্কিনকেয়ার বাজারে প্রবেশের ঘোষণা হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে ৬০ বছর বয়সি এক পুরুষ সুপারস্টারকে সামনে আনার সিদ্ধান্ত যে ব্র্যান্ডের দর্শনকে আরও বিস্তৃত করেছে, তা স্পষ্ট।
কেন শাহরুখ খান?
ফক্সটেলের মতে, শাহরুখ খানকে বেছে নেওয়ার কারণ শুধুমাত্র তাঁর বয়স নয়। বরং তাঁর দীর্ঘ কেরিয়ারে পরিবর্তন, সাফল্য, ব্যর্থতা, সমালোচনা এবং নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠার অভিজ্ঞতাই তাঁকে এই প্রচারের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে।
রোমিতা মজুমদারের বক্তব্য অনুযায়ী, ২৫ বছর বয়সি কোনও তারকাকে দিয়ে এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা বা ভবিষ্যতের ছবি তুলে ধরা যায়। কিন্তু এমন একজন মানুষ, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে জনসমক্ষে পরিবর্তন ও নানা পর্যায়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন, তাঁর মাধ্যমে অন্য ধরনের বার্তা দেওয়া সম্ভব।
ফক্সটেলের নতুন প্রচারের বক্তব্যও অনেকটা সেই জায়গায়। ভালো স্কিনকেয়ারের অর্থ নিজের মুখের উপর নতুন একটি চেহারা তৈরি করা নয়। বরং ত্বকের ভিতরে কী ঘটছে তা বোঝা, সমস্যার উৎসের দিকে নজর দেওয়া এবং নিজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকে আরও ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলাই এর মূল ভাবনা।
অ্যান্টি-এজিং নয়, ত্বককে বোঝার বার্তা
এই প্রচারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল, এটি সরাসরি অ্যান্টি-এজিং বা বয়সের ছাপ মুছে ফেলার কথা বলছে না। সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে সৌন্দর্যের বিজ্ঞাপনে প্রশ্ন থাকে, কীভাবে আরও কমবয়সি দেখাবেন। ফক্সটেলের প্রচারে সেই জায়গা থেকে কিছুটা সরে এসে নিজের ত্বককে বোঝার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শাহরুখ খানকেও কোনও নির্দিষ্ট ময়েশ্চারাইজার বা সিরাম বিক্রি করতে দেখা যাচ্ছে না। কোনও নির্দিষ্ট উপাদানের তালিকা বা পণ্যের বৈশিষ্ট্য বোঝানোর পরিবর্তে তাঁকে ব্যবহার করা হয়েছে ব্র্যান্ডের বৃহত্তর ভাবনাকে সামনে আনার জন্য।
রোমিতা মজুমদারের বক্তব্য, তাঁরা শাহরুখকে কোনও ময়েশ্চারাইজার বিক্রি করার জন্য খুঁজছিলেন না। বরং এমন একজনকে প্রয়োজন ছিল, যিনি একটি বড় ব্র্যান্ড-ভাবনাকে মানুষের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারবেন।
ভারতের স্কিনকেয়ার বাজার দ্রুত বাড়ছে
এই প্রচারের সময়টিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারন্যাশনাল মার্কেট অ্যানালিসিস রিসার্চ অ্যান্ড কনসাল্টিং বা আইএমএআরসি-র তথ্য অনুযায়ী, ভারতের স্কিনকেয়ার বাজার ২০২৫ সালে ৯.০৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৬ সালে ১০.৩২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
ফক্সটেল প্রায় চার বছর ধরে ব্যবসা করছে এবং ইতিমধ্যেই ১ কোটির বেশি গ্রাহকের কাছে পৌঁছেছে বলে সংস্থার দাবি। রোমিতা মজুমদারের মতে, এবার ব্র্যান্ডের পরবর্তী পর্যায়কে আরও বড় করে দেখার সময় এসেছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, লক্ষ্য শুধু একটি নির্দিষ্ট পণ্য বা ক্যাটাগরি বিক্রি করা নয়, বরং এমন একটি ব্র্যান্ড তৈরি করা যার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে এবং যা আরও বড় পরিসরে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।
সৌন্দর্যের ধারণা বদলাচ্ছে?
রোমিতা মজুমদারের মতে, দীর্ঘদিন সৌন্দর্যের ধারণা ছিল বেশ সংকীর্ণ। সেখানে তরুণ, প্রধানত মহিলা এবং অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষিত একটি নির্দিষ্ট চেহারাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত। কিন্তু এখন ক্রেতারা অনেক বেশি সচেতন। তাঁরা পণ্যের উপাদান, কার্যকারিতা এবং নিজেদের নির্দিষ্ট ত্বকের সমস্যার সমাধান হবে কি না, সেই বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এমনকি কোনও পণ্য পুরুষদের জন্য না মহিলাদের জন্য, সেই প্রশ্নের চেয়েও ত্বকের সমস্যার সঙ্গে পণ্যটি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটিই অনেকের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনকে স্কিনকেয়ার শিল্পের জন্য স্বাস্থ্যকর বিবর্তন বলেই মনে করেন ফক্সটেলের প্রধান নির্বাহী।
সামাজিক মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
শাহরুখ খানকে ফক্সটেলের স্কিনকেয়ার প্রচারে দেখা যাওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া একরকম নয়। কেউ এটিকে অসাধারণ মার্কেটিং সিদ্ধান্ত বলছেন, আবার কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, একজন অত্যন্ত ধনী সুপারস্টার সত্যিই কম দামের স্কিনকেয়ার পণ্য ব্যবহার করেন কি না।
কিছু ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতার মতে, আগে শুধুমাত্র কোনও তারকার উপস্থিতিই ব্র্যান্ডের প্রতি মানুষের বিশ্বাস তৈরি করতে পারত। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ক্রেতারা বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি পণ্যের কার্যকারিতা এবং ব্র্যান্ডের বিশ্বাসযোগ্যতাও যাচাই করেন।
অন্যদিকে কিছু ইনফ্লুয়েন্সারের মতে, শাহরুখ খানকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর করা নিঃসন্দেহে একটি চতুর পদক্ষেপ। কারণ এর মাধ্যমে পুরুষদের মধ্যেও স্কিনকেয়ার নিয়ে আগ্রহ বাড়তে পারে এবং সৌন্দর্যের প্রচলিত ধারণাও বদলাতে পারে।
শাহরুখের আগে সৌন্দর্য পণ্যের বিজ্ঞাপন
স্কিনকেয়ারের ক্ষেত্রে এই প্রথম শাহরুখ খানকে দেখা গেলেও সৌন্দর্য ও পার্সোনাল কেয়ারের বিজ্ঞাপনে তিনি আগেও কাজ করেছেন। লাক্স, ডেনভার ফর মেন, সিনথল, জয় এবং গডরেজ ম্যাজিক বডিওয়াশের মতো ব্র্যান্ডের প্রচারে তাঁকে দেখা গিয়েছে। তবে এবার বিষয়টি আলাদা। কারণ ৬০ বছর বয়সি এক পুরুষ অভিনেতাকে একটি স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ডের বৃহত্তর প্রচারের মুখ করা হয়েছে।
মার্কেটিং গিমিক নাকি বাজারের বদল?
শাহরুখ খানকে সামনে রেখে ফক্সটেলের এই প্রচার শেষ পর্যন্ত কতটা ব্যবসায়িক সাফল্য পাবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট, স্কিনকেয়ার নিয়ে আলোচনাকে এটি আরও বিস্তৃত করেছে।
ফক্সটেলের প্রধান নির্বাহীর মতে, কোনও ব্র্যান্ড সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা চাইলে তাকে মানুষের সমালোচনা ও প্রশ্নের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ আলোচনা এবং সমালোচনা একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক প্রভাব তৈরির অংশ।
শাহরুখ খানকে ৬০ বছর বয়সে স্কিনকেয়ার ক্যাম্পেনের কেন্দ্রে বসিয়ে ফক্সটেল অন্তত একটি পুরনো ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, সৌন্দর্য, বয়স এবং ত্বকের যত্ন কি সত্যিই কোনও নির্দিষ্ট লিঙ্গ বা বয়সের মধ্যে সীমাবদ্ধ?
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন