বানের জলে তিন দিনে মৃত্যু দুই কিশোর-সহ চার জনের
এই সময়, মালদা: গত বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত বানভাসি ভূতনি এবং সংলগ্ন এলাকায় সবমিলিয়ে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। এ দিন দুপুরে আনিকুল ইসলাম (৩০) নামে এক কৃষক খুসবুটোলা এলাকায় পাট বাঁচাতে ডিঙি নৌকায় চেপে নিজের খেতে যাচ্ছিলেন। এমন সময়ে আচমকা তাঁর ডিঙি উল্টে যায়। জলে তলিয়ে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পরে বাসিন্দারা এসে তাঁকে কোনওমতে উদ্ধার করে নিয়ে যান মথুরাপুর গ্রামীণ হাসপাতালে। সেখানকার চিকিৎসক আনিকুলকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে ভূতনি থেকে কিছুটা দূরে কালিয়াচক-৩ ব্লকের বৈষ্ণবনগর থানার পারদেওনাপুর এলাকায় দুই কিশোর বন্যার জলে দাপাদাপি করছিল। এমন সময়ে আচমকা ডুবে গেলে দীর্ঘক্ষণ তাদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। শেষমেশ রাতের দিকে পুলিশ-প্রশাসন তাদের মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। মৃত রাইহান রহমান (১১) এবং ইয়াকুব শেখের (১২) বাড়ি শোভাপুর-পারদেওনাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কাবাতুল্লা এলাকায়। ওই দুই কিশোর স্থানীয় একটি হাইস্কুলে যথাক্রমে পঞ্চম এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করত। মৃত কিশোরদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মালদার অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন) অনিন্দ্য সরকার। গত বুধবার ভূতনির বাপ্পিটোলা এলাকায় আনিকুলের মতোই বন্যার জলে ডিঙি উল্টে মৃত্যু হয়েছিল দ্বিজেন মণ্ডল (৩২) নামে এক যুবকের।
এমনিতেই গঙ্গা এবং ফুলহার নদীর জল হু হু ঢুকে ভুতনি-সহ কালিয়াচক-৩ ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছে। হীরানন্দপুর, উত্তর ও দক্ষিণ চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতেরই প্রায় ৭০টি এলাকা প্লাবিত হয়েছে বলে খবর। ভেসে গিয়েছে বাড়িঘর। অসংখ্য মানুষ ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। এরই মধ্যে তিন দিনে দুই কিশোর-সহ চার জনের মৃত্যু উদ্বেগ বাড়িয়েছে প্রশাসনের। গঙ্গার বাঁধ ভাঙার পাশাপাশি প্লাবিত এলাকার বাসিন্দাদেরও ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে। তাঁরা ইতিমধ্যেই নানা অভিযোগ করছেন। বানভাসি হীরানন্দপুরের বাসিন্দা সবিতা মণ্ডল, রিনা মণ্ডল, বিজয় মণ্ডলের বক্তব্য, ‘বিধায়ক, মন্ত্রী এলাকায় এসে সবটা দেখে গিয়েছেন। শুরু থেকেই শুধু আশ্বাস মিলছে। আমাদের অসহায়তা দূর করার ক্ষেত্রে কোনও উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।’
যদিও মানিকচকের বিজেপি বিধায়ক গৌড়চন্দ্র মণ্ডল বলেন, ‘এমন কথা কারা বলছেন জানি না। তবে প্রতিদিন নিয়ম করে ভুতনির প্লাবিত এলাকায় গিয়ে বানভাসি মানুষদের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। সুষ্ঠু ভাবে ত্রাণ সামগ্রী বণ্টন করা হচ্ছে।’ মালদার পুলিশ সুপার অনুপম সিংয়ের বক্তব্য, ‘দুই কিশোরের জলে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাটি দুঃখজনক। তবে ভূতনি থানার পুলিশ বানভাসিদের বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করছে।’ তিনি জানান,
কেশরপুর, কালুটনটোলা, বাল্লিটোলা, হীরানন্দপুর-সহ জলে ডুবে থাকা এলাকাগুলিতে খোলা হয়েছে বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর। শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা নয়, নিজেরাই জলে নেমে অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে পুলিশ।
এ দিকে, বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেও একদল ঠিকাদার আড়ালে মুচকি হাসছেন বলে অভিযোগ প্লাবিত এলাকার বাসিন্দাদের। দক্ষিণ চন্ডীপুরের বাল্লিটোলার বাসিন্দা মনু মণ্ডল, রাজু মণ্ডল, দীপক হালদারদের অভিযোগ, ‘গত বছর প্রায় ১৪ কোটি টাকা খরচ করে ১,৮০০ মিটার বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। সেই বাঁধ এক বছরের মধ্যেই ভেঙে গিয়ে গোটা গ্রাম ভেসে গেল। এই অবস্থায় ঠিকাদাররা ফের বরাদ্দের অপেক্ষায় রয়েছেন। আমাদের অনুমান, জল নামতেই নতুন করে বাঁধ নির্মাণের জন্য টেন্ডার ডাকা হবে। ঠিকাদাররা ফের সরকারি অর্থ তছরূপ করার সুযোগ পেয়ে যাবেন। আমরা এ বার পুরো বিষয়টা মুখ্যমন্ত্রীকে জানাব।’ গতবছর বাঁধ নির্মাণকারী ঠিকাদারদের কোনও মন্তব্য মেলেনি। জেলা প্রশাসনের তরফে আশ্বস্ত করা হয়েছে, আর্থিক তছরূপের অভিযোগে অভিযুক্ত এমন কোনও ঠিকাদারকে নতুন করে কাজের বরাত দেওয়া হবে না। ভাঙন প্রতিরোধের কাজে কোনও অনিয়ম হলে, কেউ ছাড় পাবে না।