ভারত-আমেরিকার মহড়ায় নতুন কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি
নয়াদিল্লি: ভারত ও আমেরিকার সেনাবাহিনীর মধ্যে বার্ষিক যৌথ সামরিক মহড়া যুদ্ধ অভ্যাস ২০২৬ (Yudh Abhyas 2026) শুরু হল। বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই মহড়া দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে যৌথ প্রশিক্ষণের ২২তম পর্ব। চলবে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এবারের মহড়া অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাজস্থানের বিকানের এবং উত্তরাখণ্ডের আউলিতে।
এবারের যুদ্ধ অভ্যাসে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে যুদ্ধের প্রস্তুতি, দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল হামলার সক্ষমতা, উন্নত কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি। ফলে আগের বছরের তুলনায় এবারের মহড়ার পরিসর ও প্রযুক্তিগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
আর্কটিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা ভারতে
এবারের মহড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আমেরিকার ১১তম এয়ারবোর্ন ডিভিশন থেকে আর্কটিক অঞ্চলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেনাদের অংশগ্রহণ। আলাস্কার ফোর্ট ওয়েনরাইটে মোতায়েন এই মার্কিন সেনাদের ভারতের উচ্চ পার্বত্য এলাকায় প্রশিক্ষণে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে তুষারাচ্ছন্ন ও অত্যন্ত ঠান্ডা পরিবেশে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকা মার্কিন সেনারা ভারতীয় সেনার সঙ্গে উচ্চ উচ্চতায় যৌথভাবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে সেনা মোতায়েন, রসদ সরবরাহ এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে এই প্রশিক্ষণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
Read More: ১৯০টি পরমাণু যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলল ভারত, শীঘ্রই টপকাবে ব্রিটেনকেও
Advertisements
অংশ নিচ্ছে মাল্টি-ডোমেন টাস্ক ফোর্স
এবারের মহড়ায় আমেরিকার ৩য় মাল্টি-ডোমেন টাস্ক ফোর্স-ও অংশ নিচ্ছে। এর ফলে যৌথ মহড়ায় দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল হামলার অস্ত্র এবং সমন্বিত কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মাল্টি-ডোমেন যুদ্ধের ধারণায় স্থল, আকাশ, মহাকাশ, সাইবার এবং অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রের সক্ষমতাকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো হয়। যুদ্ধ অভ্যাসের এবারের পর্বে এই ধরনের সমন্বিত সামরিক সক্ষমতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রথমবার ভারতে উন্নত কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা
এবারের যুদ্ধ অভ্যাসের অন্যতম বড় আকর্ষণ হল ভারতে প্রথমবারের মতো উন্নত কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা মোতায়েন করা। অপারেশন পাথওয়েজের কৌশলগত কাঠামোর অধীনে মহড়ায় মোবাইল লো, স্লো, স্মল আনম্যানড এয়ারক্রাফট ইন্টিগ্রেটেড ডিফিট সিস্টেম, সংক্ষেপে এমএলআইডিএস, যুক্ত করা হয়েছে।
Read More: দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে আসছেন না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, কেন?
ছোট আকারের ড্রোন বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নজরদারি থেকে শুরু করে অস্ত্র বহন, লক্ষ্য চিহ্নিতকরণ এবং আক্রমণ, বিভিন্ন কাজে ড্রোন ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। ফলে ড্রোন শনাক্ত, ট্র্যাক এবং নিষ্ক্রিয় করার প্রযুক্তি দুই দেশের সেনার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এবারের যৌথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভারত ও আমেরিকা উদীয়মান এই যুদ্ধক্ষেত্রের হুমকি মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতা আরও বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
বিকানের ও আউলিতে আলাদা ধরনের প্রশিক্ষণ
যুদ্ধ অভ্যাস ২০২৬-এর প্রশিক্ষণ দুটি ভিন্ন ভৌগোলিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। রাজস্থানের বিকানেরে মরু ও শুষ্ক পরিবেশে সামরিক প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকছে। অন্যদিকে উত্তরাখণ্ডের আউলিতে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের পরিস্থিতিতে যৌথ প্রশিক্ষণ হবে। ফলে দুই দেশের সেনারা একই মহড়ার আওতায় ভিন্ন ধরনের ভূপ্রকৃতি ও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করতে পারছেন। বিশেষ করে উচ্চতায় যুদ্ধের ক্ষেত্রে শারীরিক সক্ষমতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অস্ত্র পরিচালনা এবং রসদ সরবরাহের মতো বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
থাকছে কমান্ড পোস্ট ও ফিল্ড ট্রেনিং
এবারের মহড়ায় কমান্ড পোস্ট এক্সারসাইজ এবং ফিল্ড ট্রেনিং এক্সারসাইজ, দুই ধরনের প্রশিক্ষণ রাখা হয়েছে। কমান্ড পোস্ট পর্যায়ে যৌথ বাহিনীর পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যোগাযোগ এবং কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থা নিয়ে প্রশিক্ষণ হবে। অন্যদিকে ফিল্ড ট্রেনিংয়ে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতিতে সেনাদের সক্ষমতা যাচাই করা হবে। মহড়ার শেষে একটি সম্মিলিত লাইভ-ফায়ার প্রদর্শন অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে ভারত ও আমেরিকার দীর্ঘপাল্লার এবং নির্ভুল হামলার বিভিন্ন অস্ত্র ও রকেট ব্যবস্থার ডিজিটাল সমন্বয় তুলে ধরা হবে।
Read More: রাশিয়ার তিন সামরিক বিমান ল্যান্ড করল জুওয়ার বিমানবন্দরে, জোর প্রস্তুতি নয়ডায়
ইন্দো-প্যাসিফিকে নজর
যুদ্ধ অভ্যাস শুধু দুই দেশের সেনাদের প্রশিক্ষণ নয়, বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারত-আমেরিকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সের্জিও গোর এবং ইউএস আর্মি প্যাসিফিকের ডেপুটি কমান্ডিং জেনারেল লেফটেন্যান্ট জেনারেল জোয়েল ‘জেবি’ ভাওয়েল মহড়ার গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ পর্বে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
সের্জিও গোর বলেন, যুদ্ধ অভ্যাস ভারত ও আমেরিকার প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব কতটা শক্তিশালী হয়েছে, তা তুলে ধরে। দুই দেশের সেনারা একসঙ্গে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, একে অপরের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন এবং পারস্পরিক আস্থা ও সক্ষমতা তৈরি করছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের বার্তা
লেফটেন্যান্ট জেনারেল ভাওয়েল যৌথ মহড়ার মাধ্যমে আস্থা তৈরি, অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া এবং মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের প্রতি দুই দেশের প্রতিশ্রুতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রতি বছর ভারতীয় সেনার সঙ্গে আমেরিকার অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী হচ্ছে। যৌথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুই দেশের বাহিনী সম্ভাব্য বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে।
আধুনিক যুদ্ধের জন্য যৌথ প্রস্তুতি
যুদ্ধ অভ্যাস ২০২৬-এর এবারের পর্বে শুধু প্রচলিত সামরিক প্রশিক্ষণ নয়, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের নতুন প্রযুক্তি এবং কৌশলকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল হামলা, ডিজিটাল কমান্ড ও কন্ট্রোল, রকেট ব্যবস্থা এবং কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তির পাশাপাশি উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ, সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে।
২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলা এই মহড়া শেষ হওয়ার পর দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে যৌথ অভিযান পরিচালনা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নতুন ধরনের যুদ্ধক্ষেত্রের হুমকি মোকাবিলায় সমন্বয় আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে ড্রোনের দ্রুত প্রসারের সময়ে এবারের যুদ্ধ অভ্যাসে কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তি ভারত-আমেরিকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন দিক হিসেবে সামনে এসেছে।