ন্যাটোকে চাপে ফেলতে রাশিয়ার গোপন মহড়া, আর্কটিকে কেবল অচলের প্রযুক্তি পরীক্ষা - 24 Ghanta Bangla News
Home

ন্যাটোকে চাপে ফেলতে রাশিয়ার গোপন মহড়া, আর্কটিকে কেবল অচলের প্রযুক্তি পরীক্ষা

Spread the love

Russia Secret Drill: আর্কটিক অঞ্চলে সমুদ্রতলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেবল অচল করে দেওয়ার সম্ভাব্য প্রযুক্তি নিয়ে গোপন মহড়া চালিয়েছে রাশিয়া। এমনই দাবি উঠে এসেছে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন একটি প্রযুক্তি পরীক্ষার মহড়া চালানো হয়েছে, যা ব্যবহার করে সমুদ্রতলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব হতে পারে, অথচ হামলার পর সহজে কোনও দৃশ্যমান চিহ্ন নাও মিলতে পারে।

ঘটনাটি ঘটেছে নরওয়ের সভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে। পশ্চিমা দুই কর্মকর্তার দাবি, রাশিয়ার সমুদ্রতল যুদ্ধ পরিচালনা বিভাগের অধীনে থাকা গুগি বা গ্লাভনোয়ে আপ্রাভলেনিয়ে গ্লুবোকোভোদনিখ ইস্লেদোভানি রাশিয়ার গভীর সমুদ্রযান ব্যবহার করে এই মহড়া চালায়।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই মহড়ায় কোনও কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মূলত সম্ভাব্য সংঘাতের পরিস্থিতিতে কীভাবে ওই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে, সেটিই অনুশীলন করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

Read More: ইরানের গোপন পরমাণু কেন্দ্রে নির্মাণকাজ, পাহাড়ে ঘেরা ‘পিকঅ্যাক্স’ সাইটে হামলার হুঙ্কার ট্রাম্পের

Advertisements


   


   

সভালবার্ডের কাছে রুশ মহড়া

পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, চলতি বছরের বসন্তে সভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের কাছে রুশ গভীর সমুদ্রযান মোতায়েন করা হয়েছিল। সেগুলির মাধ্যমে সমুদ্রতলের কেবল অচল করার প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহার অনুশীলন করা হয়। মহড়াটির উদ্দেশ্য ছিল ন্যাটোর সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতিতে এই ধরনের প্রযুক্তি কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে, তা পরীক্ষা করা। তবে ওই প্রযুক্তি ঠিক কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে কোনও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। পশ্চিমা কর্মকর্তারাও প্রযুক্তিটির কার্যপ্রণালী সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে চাননি।

ব্রিটেন, নরওয়ে ও আমেরিকার নজরদারি

রুশ জলযানগুলির গতিবিধির উপর নজর রেখেছিল ব্রিটেন, নরওয়ে এবং আমেরিকা। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, তিন দেশের বাহিনী রুশ জলযানগুলিকে সমুদ্রে মোকাবিলা করে এবং মহড়াটি সম্পূর্ণ করতে বাধা দেয়। এরপর রুশ জলযানগুলি ওই এলাকা ছেড়ে চলে যায়।

তবে ঘটনাটিতে কোনও সমুদ্রতলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এটি বাস্তব নাশকতার ঘটনা নয়, বরং সম্ভাব্য প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে একটি মহড়া ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

সভালবার্ডের কেবল এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

সভালবার্ডের চারপাশে থাকা সমুদ্রতলের যোগাযোগ কেবলগুলি আর্কটিক অঞ্চলের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো। দুটি ফাইবার-অপটিক কেবল এই দ্বীপপুঞ্জকে নরওয়ের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রতিটি কেবলের দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার। সমুদ্রের প্রায় ২,৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত এগুলি বিস্তৃত। এই কেবলগুলির মাধ্যমে স্ভালস্যাট থেকে বিপুল পরিমাণ উপগ্রহ সংক্রান্ত তথ্য পরিবহণ করা হয়। স্ভালস্যাট হল বিশ্বের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ গ্রাউন্ড স্টেশন, যা নাসার নিয়ার-স্পেস নেটওয়ার্কের সঙ্গেও যুক্ত। ফলে এই কেবলগুলিতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হলে শুধু স্থানীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, গুরুত্বপূর্ণ উপগ্রহ-সংক্রান্ত তথ্য পরিবহণও প্রভাবিত হতে পারে।

Read More: দক্ষিণ চিন সাগরে ‘ব্রহ্মোস বলয়’: চিনের বেড়াজালে কৌশলগত ফাঁদ পাতছে ভারত?

চিহ্ন না রেখে নাশকতার আশঙ্কা

এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হল, যে প্রযুক্তির মহড়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে সেটি এমনভাবে কেবল অচল করার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, যাতে হামলার পর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া কঠিন হয়।সাধারণত সমুদ্রতলের কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কেবল কাটা বা ভেঙে যাওয়ার মতো শারীরিক প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এমন কোনও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে যাতে দৃশ্যমান ক্ষতির চিহ্ন কম থাকে, তাহলে হামলার কারণ এবং দায়ী পক্ষ শনাক্ত করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পশ্চিমা নিরাপত্তা মহলে এই কারণেই ঘটনাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

‘গ্রে-জোন’ যুদ্ধের নতুন হাতিয়ার?

সমুদ্রতলের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে সেটি তথাকথিত গ্রে-জোন যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।গ্রে-জোন যুদ্ধ বলতে এমন কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়, যা সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের পর্যায়ে না গিয়েও প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো, অর্থনীতি বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি করতে পারে।

সমুদ্রতলের কেবল অচল করে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানো হলে তার প্রভাব বড় হতে পারে। কিন্তু হামলার পেছনে কে রয়েছে, কীভাবে হামলা চালানো হয়েছে, তা প্রমাণ করা কঠিন হলে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।

ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ নিয়ে উদ্বেগ

রাশিয়ার সমুদ্রতল যুদ্ধের সক্ষমতা বাড়ানোর এই ধরনের খবর পশ্চিমা গোয়েন্দা মহলে আরও একটি উদ্বেগ তৈরি করেছে। কিছু মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে মস্কো ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি পরীক্ষা করার চেষ্টা করতে পারে।

ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী, কোনও সদস্য দেশের উপর সশস্ত্র হামলাকে জোটের সমস্ত সদস্যের উপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আক্রান্ত সদস্যকে সাহায্য করার জন্য অন্য সদস্যরা পদক্ষেপ নিতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রতলের পরিকাঠামোয় হামলা হলে সেটি ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করার একটি উপায় হতে পারে বলে কিছু বিশ্লেষকের আশঙ্কা। তবে সভালবার্ডের কেবলগুলিতে হামলা চালানোর কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রাশিয়ার রয়েছে, এমন প্রমাণ রয়টার্সের প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

Read More: আমেরিকার হামলায় ধ্বংস ৫ ইরানি ট্যাঙ্কার, জর্ডনের ঘাঁটিতে পালটা মিসাইল হানা

ইউরোপের পরিকাঠামো নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার সম্ভাব্য নাশকতা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলির উদ্বেগ বেড়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ, গ্যাস পরিকাঠামো, টেলিকম নেটওয়ার্ক এবং সমুদ্রতলের কেবল, সবকিছুকেই সম্ভাব্য ঝুঁকির তালিকায় রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে সমুদ্রের গভীরে থাকা কেবলগুলি নজরদারি ও সুরক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠিন। সভালবার্ডের কাছে রুশ মহড়ার ঘটনা সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তবে হামলা হয়নি, ছিল প্রযুক্তির মহড়া

রয়টার্সের প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এই ঘটনায় কোনও কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। রাশিয়া সভালবার্ডের কেবলগুলিতে হামলা চালিয়েছে, এমন দাবিও প্রতিবেদনে করা হয়নি।

বরং ঘটনাটি থেকে যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা হল, রাশিয়ার সমুদ্রতল যুদ্ধ পরিচালনাকারী বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য একটি প্রযুক্তির সম্ভাব্য প্রয়োগ নিয়ে মহড়া চালিয়েছে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তারা দাবি করছেন।

এর ফলে আর্কটিক অঞ্চলে সমুদ্রতলের যোগাযোগ পরিকাঠামোর নিরাপত্তা এবং রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সমুদ্রতল যুদ্ধ সক্ষমতা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলির উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে এমন প্রযুক্তি সত্যিই যদি কম দৃশ্যমান চিহ্ন রেখে গুরুত্বপূর্ণ কেবল অচল করতে সক্ষম হয়, তাহলে ভবিষ্যতের গ্রে-জোন সংঘাত এবং ন্যাটো-রাশিয়া উত্তেজনায় সমুদ্রতলের পরিকাঠামো আরও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *