সোনার আমদানি শুল্ক বাড়তেই চোরাই সোনার রমরমা, ১০ গ্রামে সস্তা ৮,০০০ টাকা - 24 Ghanta Bangla News
Home

সোনার আমদানি শুল্ক বাড়তেই চোরাই সোনার রমরমা, ১০ গ্রামে সস্তা ৮,০০০ টাকা

Spread the love

কলকাতা: ভারতে সোনার বাজারে (Gold Price) নতুন করে চাপ তৈরি করছে চোরাই সোনা (Gold Smuggling)।  রাজস্ব গোয়েন্দা অধিদফতর বা ডিআরআই-এর লাগাতার অভিযানের পরেও দেশের বুলিয়ন বাজারে বেড়ে চলেছে অবৈধ পথে আসা সোনার প্রভাব। শিল্পমহলের দাবি, চোরাই সোনা বৈধ ব্যবসায়ী এবং গয়না বিক্রেতাদের উপর চাপ বাড়াচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, বৈধ বাজারের তুলনায় অবৈধ পথে আসা সোনা প্রতি ১০ গ্রামে প্রায় ৮,০০০ টাকা পর্যন্ত কম দামে বিক্রি হচ্ছে।

এই দামের বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে মূলত সোনা আমদানির শুল্ক বাড়ানোর পর। মে মাসে সরকার সোনার আমদানি শুল্ক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেছে। এর ফলে বৈধ পথে আমদানি করা সোনার খরচ বেড়েছে এবং একই সঙ্গে ধূসর বাজার বা গ্রে মার্কেটে চোরাই সোনার আকর্ষণ বেড়েছে।

আরও পড়ুন: ১৯০টি পরমাণু যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানকে পেছনে ফেলল ভারত, শীঘ্রই টপকাবে ব্রিটেনকেও

১০০ টনের বেশি সোনা ঢুকতে পারে দেশে

শিল্পমহলের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে অবৈধ পথে ১০০ টনের বেশি সোনা ভারতে ঢুকতে পারে। ডিআরআই সংগঠিত সোনা পাচার চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করলেও অবৈধ ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

Advertisements


   


   

২৫ জুলাই প্রকাশিত সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জায়গায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চালানো একাধিক অভিযানে ডিআরআই বিদেশি উৎসের ২৭ কেজির বেশি চোরাই সোনা বাজেয়াপ্ত করেছে। এই অভিযানে ১২ জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। তবে শিল্পমহলের বক্তব্য, অভিযান বাড়লেও বৈধ ও অবৈধ সোনার দামের ব্যবধান পাচারকারীদের জন্য বড় আর্থিক সুযোগ তৈরি করছে।

আরও পড়ুন: গালওয়ান সংঘর্ষের পর প্রথম! ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে হতে পারে মোদী- জিনপিং দ্বিপাক্ষিক বৈঠক

কেন চোরাই সোনা এত সস্তা?

ভারতে সোনা আমদানির খরচের সঙ্গে যুক্ত কর বাড়লে বৈধ পথে আমদানি করা সোনার দাম স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। অন্যদিকে অবৈধ পথে আনা সোনার ক্ষেত্রে এই আমদানি শুল্ক এবং সংশ্লিষ্ট কর দিতে হয় না।

ফলে পাচারকারীরা বৈধ বাজারের তুলনায় কম দামে সোনা বিক্রি করেও লাভ করতে পারে। বর্তমানে প্রতি ১০ গ্রামে প্রায় ৮,০০০ টাকা পর্যন্ত ছাড়ে চোরাই সোনা বিক্রির খবর সেই দামের ব্যবধানকেই সামনে নিয়ে এসেছে। ইন্ডিয়া বুলিয়ন অ্যান্ড জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক সিনিয়র আধিকারিকের বক্তব্য, অবৈধ সোনা আমদানি প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কোনও সুবিধা দেয় না। বরং এই ধরনের দামের ছাড়ই প্রমাণ করে যে গ্রে মার্কেট সক্রিয় রয়েছে।

আরও পড়ুন:  দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে আসছেন না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, কেন?

বিশ্ব সোনা পরিষদের সতর্কবার্তাও ছিল

সোনার আমদানি শুল্ক বাড়লে ভারতীয় বাজার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের ব্যবধান বেড়ে যেতে পারে। আর সেই ব্যবধান যত বাড়ে, ততই পাচারকারীদের কাছে অবৈধ পথে সোনা আনার আর্থিক প্রণোদনা তৈরি হয়। বিশ্ব সোনা পরিষদ বা ডব্লিউজিসি আগেও এই প্রবণতার কথা উল্লেখ করেছে। ২০১৩ সালের শুরুতে সরকার সোনার আমদানি শুল্ক ৪ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানোর পর একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ২০১৪ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে অনানুষ্ঠানিক পথে সোনা আমদানি বেড়ে প্রায় সাত গুণ হয়ে ৭০ টনে পৌঁছেছিল। ২০১৩ সালের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ টন।

২০১৩ থেকে ২০১৯, তখনও বন্ধ হয়নি পাচার

২০১৩ সালের শেষ দিক থেকে ২০১৯ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সোনার শুল্ক ১০ শতাংশে স্থির থাকার সময়ও অবৈধ আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ওই সময়ে প্রতি ত্রৈমাসিকে গড়ে প্রায় ৩৪ টন সোনা অনানুষ্ঠানিক পথে ভারতে ঢুকেছিল বলে তথ্য রয়েছে। অর্থাৎ একবার সংগঠিত পাচার নেটওয়ার্ক তৈরি হয়ে গেলে শুল্কের হার কিছুটা স্থিতিশীল হলেও সেই নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে।

২০২২ সালেও শুল্ক বাড়ার পর একই ছবি

২০২২ সালের জুলাইয়ে সরকার কার্যকর সোনা আমদানি শুল্ক ১০.৭৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার পরও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। ওই বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে অনানুষ্ঠানিক সোনা আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭ টন। কিন্তু বছরের শেষে তা বেড়ে প্রায় ৫০ টনে পৌঁছয়। ২০২৩ সালের বড় একটি সময়জুড়েও অবৈধ আমদানির মাত্রা বেশি ছিল। এই পুরনো তথ্যই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে শিল্পমহলের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

সোনার শুল্ক ১৫ শতাংশ কেন করা হল?

চলতি বছরের মে মাসে সরকার সোনা এবং রুপোর আমদানি শুল্ক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল বিদেশ থেকে মূল্যবান ধাতু কেনার প্রবণতা কমানো এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারের উপর চাপ কমানো। নতুন ব্যবস্থায় সোনা ও রুপোর আমদানিতে ১০ শতাংশ বেসিক কাস্টমস ডিউটির সঙ্গে ৫ শতাংশ এগ্রিকালচার ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেস বা এআইডিসি যুক্ত হয়েছে। ফলে কার্যকর আমদানি কর ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৫ শতাংশ হয়েছে। সরকারের আরও একটি লক্ষ্য ছিল ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির উপর চাপ কমানো এবং টাকার উপর কিছুটা সহায়তা তৈরি করা। কারণ এশিয়ার দুর্বল পারফর্ম করা মুদ্রাগুলির মধ্যে ভারতীয় টাকা অন্যতম।

শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশ করার দাবি

অল ইন্ডিয়া জেম অ্যান্ড জুয়েলারি ডোমেস্টিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাজেশ রোকড়ের মতে, সোনা অবৈধভাবে দেশে ঢোকার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সংগঠিত ব্যবসা। তিনি সোনার উপর আমদানি শুল্ক বাড়ানোর বদলে রফতানি বাড়ানোর উপর জোর দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর দাবি, সরকারের সোনার আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। শিল্পমহলের আশঙ্কা, বৈধ এবং অবৈধ বাজারের মধ্যে দামের ব্যবধান বেশি থাকলে সংগঠিত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চোরাই বাজারের প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

২০২৪ সালে শুল্ক কমার পর পাচার কমেছিল

ভারতে সোনা পাচারের প্রবণতা এর আগেও শুল্কের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক দেখিয়েছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি ভারত সোনার আমদানি শুল্ক কমানোর পর অবৈধ বাণিজ্যের প্রবণতা কিছুটা কমেছিল। কিন্তু চলতি বছরের মে মাসে ফের আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশে ওঠায় শিল্পমহল আগেই সতর্ক করেছিল যে সোনা পাচার আবার গুরুত্ব পেতে পারে। বর্তমান বাজারের দামের ব্যবধান সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করছে।

সোনা কেনার ক্ষেত্রে চাহিদা বাড়ছে

অন্যদিকে ভারতে সোনার চাহিদাও কমেনি। সাম্প্রতিক সময়ে সোনার দাম দ্রুত বেড়েছে। একই সময়ে গত এক বছরে শেয়ার বাজার থেকে নেতিবাচক রিটার্ন পাওয়ার কারণে বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে সোনার প্রতি আগ্রহও বেড়েছে।বিশ্ব সোনা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ত্রৈমাসিকে ভারতের গোল্ড এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা গোল্ড ইটিএফ-এ অর্থপ্রবাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮৬ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ২০ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। অর্থাৎ একদিকে সোনার বিনিয়োগ চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে আমদানি শুল্কও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বৈধ বাজারে সোনার দাম বাড়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অবৈধ সোনা বাজারে কম দামে ঢোকানো হলে পাচার আরও বাড়তে পারে।

সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে মানুষকে এক বছরের জন্য সোনা কেনা থেকে দূরে থাকার আবেদন জানিয়েছেন। ভারত তার প্রায় সম্পূর্ণ সোনা ব্যবহারের চাহিদার জন্য আমদানির উপর নির্ভরশীল। ফলে আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করার পাশাপাশি চোরাই সোনার প্রবেশ ঠেকানো এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

ডিআরআই-এর অভিযান অব্যাহত থাকলেও বাজারে যদি বৈধ এবং অবৈধ সোনার দামের ব্যবধান কয়েক হাজার টাকা থাকে, তাহলে পাচারকারীদের জন্য আর্থিক লাভের সুযোগ থেকেই যায়। তাই শিল্পমহলের মতে, শুধু অভিযান নয়, সোনার আমদানি শুল্ক, বৈধ বাজারের প্রতিযোগিতা এবং দেশের সোনার চাহিদা, সব দিক একসঙ্গে বিবেচনা করেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজতে হবে।

আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯

আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ

আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *