৮ সপ্তাহের মধ্যে টাকার সবচেয়ে বড় পতন, ডলারের দাম ছুঁল ৯৪.৮৩ টাকা
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা বাড়ায় মঙ্গলবার ফের চাপের মুখে পড়ল ভারতীয় টাকা (Indian Rupee)। ডিলারদের মতে, বাড়তে থাকা…
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা বাড়ায় মঙ্গলবার ফের চাপের মুখে পড়ল ভারতীয় টাকা (Indian Rupee)। ডিলারদের মতে, বাড়তে থাকা তেলের দাম, আমদানিকারকদের ডলার চাহিদা এবং বিদেশি বিনিয়োগের দুর্বল প্রবাহ টাকার উপর চাপ তৈরি করেছে।
মঙ্গলবার লেনদেন শেষে ১ ডলারের দাম দাঁড়ায় ৯৪.৮৩ টাকা। আগের দিন যা ছিল ৯৪.৪৯ টাকা। অর্থাৎ একদিনে টাকার দাম কমেছে ৩৪ পয়সা। ১৪ জুলাইয়ের পর এটাই টাকার সবচেয়ে বড় একদিনের পতন।
ব্রেন্ট ক্রুড ১০০ ডলারের দিকে
আগের দুই সেশনে প্রায় অপরিবর্তিত থাকার পর মঙ্গলবার টাকার উপর নতুন করে চাপ তৈরি হয়। পশ্চিম এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলার প্রতি ব্যারেলের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় ভারতের মতো অপরিশোধিত তেল আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ক্ষেত্রে উদ্বেগ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমদানিকারকরা আগাম ঝুঁকি কমাতে বেশি ডলার কিনছেন। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহও টাকার পক্ষে যথেষ্ট সহায়ক হয়নি। এইচডিএফসি সিকিউরিটিজের সিনিয়র রিসার্চ অ্যানালিস্ট দিলীপ পারমার বলেন, টানা দুই সেশন অপরিবর্তিত থাকার পর ঝুঁকি এড়ানোর প্রবণতা এবং চড়া তেলের দামের কারণে ভারতীয় টাকা দ্রুত দুর্বল হয়েছে। বাজারে ডলারের আগ্রাসী কেনাকাটা তারল্যকে ছাপিয়ে যাওয়ায় এই পতন হয়েছে। তাঁর মতে, চলমান ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ এবং বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের সহায়ক প্রবাহের অভাবও পতনকে আরও তীব্র করেছে।
ইরান যুদ্ধের পর টাকার পতন ৪ শতাংশের বেশি
চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এখনও পর্যন্ত ভারতীয় টাকা ০.৩৭ শতাংশ শক্তিশালী হয়েছে। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হিসাব করলে টাকার দাম কমেছে ৪.০৬ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের এক ডিলার জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দুর্বল অবস্থায় বাজার খুলেছিল টাকা। গোটা সেশনেই চাপ বজায় ছিল। ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কায় টানা তৃতীয় দিনের মতো তেলের দাম বাড়ায় টাকার উপর চাপ আরও বেড়েছে।
Advertisements
পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনায় বাড়ছে উদ্বেগ
পশ্চিম এশিয়ায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ায় বাজারের উদ্বেগও বেড়েছে। ইয়েমেনের ইরান-ঘনিষ্ঠ হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা চালানোর পর উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে তেহরান আমেরিকার বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’-এর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে ভারতের আমদানি খরচ আরও বাড়তে পারে। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে টাকার উপর।
RBI-এর হস্তক্ষেপেও ফের চাপ
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া বা RBI ডলার বিক্রি করে টাকার পতন ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। এর ফলে গত সপ্তাহে টাকা দুই মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল। তবে তেলের দাম ফের বাড়তে শুরু করায় সেই শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ডিলারের মতে, RBI-এর ডলার বিক্রি সাম্প্রতিক সময়ে টাকার ঘুরে দাঁড়ানোয় সাহায্য করেছিল। কিন্তু অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এখন সতর্ক অবস্থানে থাকতে পারে।
আমদানিকারকদের ডলার চাহিদা এখনও বেশি
বাজারে স্থানীয় আমদানিকারকদের হেজিং চাহিদা এখনও যথেষ্ট বেশি। ফলে টাকার সাম্প্রতিক লাভ আরও বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি আমদানিকারকদের আগাম ডলার কেনার প্রবণতা থাকলে টাকার উপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। দিলীপ পারমারের হিসাব অনুযায়ী, নিকট ভবিষ্যতে স্পট মার্কেটে টাকা ৯৪.৪৫ থেকে ৯৫.১০-এর মধ্যে লেনদেন করতে পারে। ৯৫.১০ স্তরটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ এবং ৯৪.৪৫ গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক স্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বন্ড বাজারে বড় পরিবর্তন নেই
টাকার পাশাপাশি সরকারি বন্ডের বাজারেও মঙ্গলবার খুব বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। ১০ বছরের সরকারি বন্ডের ফলন ৬.৯৭ শতাংশে প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। অন্যদিকে ৫ বছরের সরকারি বন্ডের ফলন ২ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৬.৫২ শতাংশ হয়েছে। বাজারের নজর এখন মূলত তেলের দাম এবং আমেরিকার মুদ্রানীতির দিকে।
সামনে নজরে মার্কিন মুদ্রাস্ফীতি ও Fed
আগামী দিনে টাকার গতিপথ নির্ধারণে অপরিশোধিত তেলের দাম এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের মুদ্রানীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। আগামী শুক্রবার আমেরিকার ভোক্তা মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশিত হওয়ার কথা। এই তথ্য আগামী সপ্তাহের ফেডারেল রিজার্ভের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বাজারের প্রত্যাশাকে প্রভাবিত করতে পারে। পরবর্তী ফেডারেল রিজার্ভ FOMC বৈঠক ১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
বিদেশি মূলধন টানতে একাধিক পদক্ষেপ
টাকার উপর চাপ কমাতে এবং দেশে বিদেশি মূলধনের প্রবাহ বাড়াতে সাম্প্রতিক সময়ে RBI ও কেন্দ্র সরকার একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন FCNR(B) আমানতের হেজিং খরচে ভর্তুকি, এই ধরনের আমানতকে CRR ও SLR থেকে ছাড় এবং FCNR(B) আমানত ও যোগ্য ECB-এর জন্য বিশেষ সুবিধার ডলার-টাকা সোয়াপ।
এছাড়া সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সুদের আয় এবং মূলধনী লাভের উপর আয়কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। RBI Fully Accessible Route বা FAR-এর আওতায় দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগও বাড়িয়েছে। তেলের দাম যদি আরও বাড়ে এবং পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এই পদক্ষেপগুলির পরেও ভারতীয় টাকার উপর চাপ বজায় থাকতে পারে। আগামী কয়েক দিনে ৯৫ টাকা প্রতি ডলারের স্তর তাই বাজারের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন