শত্রুর ঘাঁটিও কাঁপত ভারতীয় এই পাইলটের দাপটে, চেনেন ‘জাম্বো’-কে?

ছোটবেলা থেকেই তাঁর চোখ ছিল আকাশের দিকে। বিমান দেখলেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতেন। মনে মনে হয়তো ভাবতেন, একদিন তিনিও ওই আকাশে উড়বেন। সেই স্বপ্ন নিয়েই ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা। অবশেষে ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে যোগ দিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সে। তখন কে জানত, এই স্বপ্নই একদিন তাঁকে যুদ্ধের ভয়ঙ্কর আকাশে নিয়ে যাবে!

তাঁর উচ্চতা ছিল ছ’ফুটেরও বেশি। শরীরও ছিল বেশ পেশিবহুল। তাই সহকর্মীরা মজা করে তাঁকে ডাকতেন ‘জাম্বো’ নামে। তবে এই হাসিখুশি ডাকনামের আড়ালে ছিলেন অসম্ভব সাহসী এক মানুষ। পুরো নাম কারুণ কৃষ্ণ মজুমদার। ককপিটে ঢুকলেই বদলে যেত তাঁর চেহারা — সামনে শুধু বিমান, আকাশ আর মিশন।

সময়টা ১৯৪২ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। জাপানি বাহিনী বার্মায় আক্রমণ শুরু করেছে। সেখানেই যুদ্ধের ময়দানে নামতে হলো ‘জাম্বো’কে। শত্রুর ঘাঁটিতে হামলা চালাতে তিনি বিমান নিয়ে উড়ে যেতেন খুব নীচে দিয়ে। ঝুঁকি ছিল প্রচণ্ড, কিন্তু ভয় যেন তাঁকে ছুঁতেই পারত না।

এক দিন তাঁকে দেওয়া হলো Westland Lysander। বিমানটি মূলত নজরদারি ও যোগাযোগের কাজে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ‘জাম্বো’র হাতে সেটিই হয়ে উঠল আক্রমণের অস্ত্র। তিনি উড়ে গেলেন Mae Hong Son-এর জাপানি বিমানঘাঁটির দিকে। খুব নীচে দিয়ে গিয়ে সেখানে বোমা ফেললেন। এক বার নয়, এমন একাধিক বিপজ্জনক মিশনে অংশ নিলেন তিনি।

তাঁর সাহসের কথা তখন আর শুধু সহকর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। যুদ্ধের ময়দানে তাঁর কৃতিত্ব পেল বড় স্বীকৃতি। তাঁকে দেওয়া হলো Distinguished Flying Cross বা DFC। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই সম্মান পাওয়া প্রথম ভারতীয় এয়ার ফোর্স অফিসার ছিলেন তিনি। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার পরেও তাঁর মন শান্ত হলো না। কারণ তাঁর আসল টান ছিল — নিজে বিমান ওড়ানো।

১৯৪৪ সালে সেই ইচ্ছাই তাঁকে আরও বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল। বিমান ওড়ানোর সুযোগ পেতে তিনি Wing Commander-এর পদ ছেড়ে দিলেন। তার পর নিলেন P-51 Mustang বিমানের প্রশিক্ষণ। পরে যোগ দিলেন No. 268 Squadron, Royal Air Force-এ। এ বার যুদ্ধের ময়দান বদলে গেল। ‘জাম্বো’ পৌঁছে গেলেন ইউরোপের আকাশে।

এ বার তাঁর হাতে ছিল আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তিনি ফ্রান্সের আকাশে উড়ে শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ জায়গার ছবি তুলতেন। একটি মিশনে নজর ছিল Seine নদীর রেল সেতুগুলির দিকে। আর একটি মিশনে তিনি উড়ে গেলেন Falaise Gap-এর উপর দিয়ে। এই তথ্য পরে মিত্রবাহিনীর কাজে আসে। নরম্যান্ডির ঐতিহাসিক D-Day অভিযানের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব ছিল।

এমন কাজের জন্য আবারও তাঁর হাতে উঠল DFC। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও আকাশের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়নি। ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের একটি প্রদর্শনী দলের সঙ্গে তিনি উড়ছিলেন। লাহোরের Walton Airbase-এ ছিল এমনই একটি বিমান প্রদর্শনী। সেদিন ‘জাম্বো’ বেছে নিয়েছিলেন Hawker Hurricane। কেউ জানত না, সেটিই হতে চলেছে তাঁর শেষ উড়ান।

প্রদর্শনীর সময় বিমানটি নিয়ে একটি কঠিন কসরত করছিলেন তিনি। হঠাৎ বিমানের একটি undercarriage বা চাকার অংশ নীচে বেরিয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে বিমানের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে। মাত্র ৩১ বছর বয়সে শেষ হয়ে যায় কারুণ কৃষ্ণ মজুমদারের জীবন। কিন্তু আকাশ ছোঁয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে ‘জাম্বো’ যাত্রা শুরু করেছিলেন, তাঁর সাহসের গল্প আজও ইতিহাসের পাতায় উড়ে বেড়ায়।