“শক্তিশালী ভারত মানেই আগ্রাসন নয়”, নিরাপত্তা নিয়ে বড় বার্তা প্রাক্তন চিফ অফ ডিফেন্সের
নয়াদিল্লি: ভারতকে আরও শক্তিশালী হতে হবে। তবে শক্তিশালী হওয়া মানেই আগ্রাসী হয়ে ওঠা নয়, বরং দেশের মানুষ ও জাতীয় স্বার্থকে রক্ষা করার সক্ষমতা তৈরি করা।…
নয়াদিল্লি: ভারতকে আরও শক্তিশালী হতে হবে। তবে শক্তিশালী হওয়া মানেই আগ্রাসী হয়ে ওঠা নয়, বরং দেশের মানুষ ও জাতীয় স্বার্থকে রক্ষা করার সক্ষমতা তৈরি করা। শনিবার এমনই বার্তা দিলেন ভারতের প্রাক্তন চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান (Anil Chauhan)। নয়াদিল্লির প্রধানমন্ত্রীর মিউজিয়াম অ্যান্ড লাইব্রেরিতে আয়োজিত ২২তম ভারতরত্ন পণ্ডিত গোবিন্দ বল্লভ পন্থ মেমোরিয়াল লেকচার-এ ‘ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে হুমকি ও চ্যালেঞ্জ’ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন তিনি।
‘শক্তি আগ্রাসন নয়, সুরক্ষার সক্ষমতা’
জেনারেল অনিল চৌহান বলেন, বর্তমান বিশ্বে ভারত ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় দেশ হয়ে উঠছে। কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা হল, শুধু আকর্ষণীয় হওয়াই যথেষ্ট নয়, ভারতকে একইসঙ্গে শক্তিশালীও হতে হবে। তাঁর বক্তব্য, “শক্তি আগ্রাসন নয়। শক্তি হল সুরক্ষা দেওয়ার, প্রতিরোধ গড়ে তোলার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং এরপর অবদান রাখার সক্ষমতা।” তিনি আরও বলেন, নিরাপদ ভারত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অন্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে পারে। একইসঙ্গে সেই সহযোগিতা করতে গিয়ে নিজের স্বাতন্ত্র্য ও জাতীয় স্বার্থ হারিয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই।
Read More: শনিবারের ভোরেই যোগী রাজ্যে গুঁড়িয়ে গেল সরকারি জমিতে অবৈধ মসজিদ
ভূ-রাজনীতি থেকে প্রযুক্তি, একাধিক চ্যালেঞ্জ
আধুনিক সময়ে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সামনে একাধিক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রাক্তন CDS। এর মধ্যে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, যুদ্ধের বদলে যাওয়া ধরন এবং তথ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। তাঁর মতে, পুরনো আন্তর্জাতিক ভারসাম্যগুলি দুর্বল হয়ে পড়ছে, অথচ নতুন বিশ্বব্যবস্থার কাঠামো এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক সম্পর্কও ক্রমশ বিষয়ভিত্তিক ও স্বার্থনির্ভর হয়ে উঠছে। কোনও দেশ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অংশীদার হলেও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। আবার কোনও একটি অঞ্চলে নিরাপত্তা সহযোগী দেশ অন্য অঞ্চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিতে পারে।
Advertisements
‘শক্তিই সঠিক’ ধারণা বাড়ছে
এই পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ফলে বিভিন্ন দেশের শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা বাড়ছে বলেও সতর্ক করেন জেনারেল চৌহান। তাঁর মতে, সামরিক শক্তি এখন অনেক ক্ষেত্রে শেষ বিকল্প হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতির প্রথম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ‘শক্তিই সঠিক’ ধরনের ধারণা ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ভারতকে নিজের জাতীয় শক্তির বিভিন্ন স্তরকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
Read More:মোদী রাজ্যে হিন্দু খুনে অভিযুক্ত ফয়সালকে প্রকাশ্যেই উত্তম মধ্যম পুলিশের
‘কগনিটিভ কলোনিয়ালিজম’ নতুন হুমকি
প্রাক্তন CDS-এর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ‘কগনিটিভ কলোনিয়ালিজম’ বা মানসিক পরাধীনতার নতুন ধরনের হুমকি। তিনি বলেন, বিশ্ব এমন একটি সময়ের দিকে এগোচ্ছে যেখানে মানুষের চিন্তাভাবনা, সমাজ নিজের সম্পর্কে কীভাবে ভাববে, কোন বিষয়কে মূল্যবান মনে করবে, কাকে বিশ্বাস করবে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী সম্ভাবনা কল্পনা করবে, সেগুলিকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। অর্থাৎ, লক্ষ্য শুধু কোনও দেশের ভূখণ্ড বা সামরিক শক্তি নয়, মানুষের চিন্তাভাবনাও হয়ে উঠছে।
জাতীয় নিরাপত্তার ভিত্তি রাষ্ট্র গঠন
ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু সামরিক শক্তি বাড়ালেই হবে না বলেও মন্তব্য করেন জেনারেল চৌহান। তাঁর মতে, জাতীয় নিরাপত্তার শুরু হয় রাষ্ট্র গঠন থেকে। আর রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানগুলির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদৃষ্টি থাকতে হবে এবং কোনও সমস্যা বড় নিরাপত্তা হুমকিতে পরিণত হওয়ার আগেই তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে। এর পাশাপাশি গোটা ব্যবস্থার ভিত্তিতে থাকতে হবে এমন নাগরিক, যাঁরা দেশ ও জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে সচেতন।
‘পুরনো ও নতুন দুই ক্ষেত্রেই শক্তি বাড়াতে হবে’
আধুনিক নিরাপত্তা পরিবেশের মোকাবিলায় ভারতকে বিভিন্ন ধরনের জাতীয় শক্তির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে হবে বলে মত দেন প্রাক্তন CDS। সামরিক শক্তির পাশাপাশি নতুন ও পুরনো উভয় ক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত নীতি এবং কৌশল তৈরি করার প্রয়োজন রয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
ভারতের দ্বিতীয় CDS ছিলেন জেনারেল চৌহান
জেনারেল অনিল চৌহান ছিলেন ভারতের দ্বিতীয় চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মজীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ ও দেশীয়করণ। পরবর্তীতে তিনি এমন একটি টাস্ক ফোর্সের নেতৃত্ব দেন, যার মাধ্যমে ভারতের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা এবং দেশের প্রথম ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার নিয়োগের পথ তৈরি হয়।
‘আগামী দিনের হুমকির জন্য এখনই প্রস্তুতি দরকার’
ভারতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ নিয়ে বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ভারতরত্ন পণ্ডিত গোবিন্দ বল্লভ পন্থের নাতি রঞ্জন পন্থ বলেন, ভারতের সামনে থাকা হুমকির ধরন দ্রুত বদলে গিয়েছে। আগের প্রজন্ম যেখানে যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন এবং দৃশ্যমান সামরিক সক্ষমতার মাধ্যমে নিরাপত্তা মূল্যায়ন করত, এখন যুদ্ধক্ষেত্র ক্রমশ ড্রোন, নেটওয়ার্ক, সাইবার এবং মহাকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে।
তাঁর মতে, জেনারেল চৌহানের দীর্ঘ সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই এই বক্তৃতায় প্রথমবারের মতো একজন সেনা কর্মকর্তার কাছ থেকে ভারতের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে শোনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।