এপস্টেইনের ভয়ঙ্কর নিয়ন্ত্রণের কৌশল ফাঁস, বেঁচে ফেরা মহিলার বিস্ফোরক দাবি - 24 Ghanta Bangla News
Home

এপস্টেইনের ভয়ঙ্কর নিয়ন্ত্রণের কৌশল ফাঁস, বেঁচে ফেরা মহিলার বিস্ফোরক দাবি

Spread the love

নিউইয়র্ক: যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অভিযুক্ত প্রয়াত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টেইন (Jeffrey Epstein) কীভাবে তাঁর আশপাশে থাকা তরুণীদের নিয়ন্ত্রণ করতেন, সেই বিষয়ে প্রথমবার প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন তাঁর সঙ্গে যুক্ত এক নারী জুলিয়া মলচানোভা। তাঁর দাবি, এপস্টেইন নারীদের জীবনের প্রায় প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং নিজের নির্যাতন আড়াল করতে তাঁদের ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট’ হিসেবে পরিচয় দিতেন।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মলচানোভা বলেন, এপস্টেইনের বাড়িতে বাস্তবে যা ঘটত, ‘অ্যাসিস্ট্যান্ট’ শব্দটি তার কোনও সঠিক বর্ণনা নয়। বাইরের কেউ বাড়িতে এলে এপস্টেইন তাঁকে অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতেন, যাতে নির্যাতনের বিষয়টি প্রকাশ না পায়। মলচানোভার কথায়, এটি ছিল বাস্তবতা আড়াল করার একটি আইনি কৌশল।

আরও পড়ুন: জ্বলছে তেলের ট্যাঙ্কার? খর্গ দ্বীপের কাছে জোরালো বিস্ফোরণ, ইরানে ফের মার্কিন হামলা

নিজের নামে ক্রেডিট কার্ড ও কেনাকাটার তথ্য

মলচানোভা জানান, ২০১৯ সালের গোড়ায় ক্রেডিট মনিটরিং অ্যাপ পরীক্ষা করার সময় তিনি নিজের নামে এমন কয়েকটি ক্রেডিট কার্ড এবং কেনাকাটার তথ্য দেখতে পান, যেগুলির বিষয়ে তাঁর কোনও ধারণাই ছিল না।তাঁর দাবি, অ্যাকাউন্টগুলি তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তিনি সেগুলি কখনও ব্যবহার করেননি।

Advertisements


   


   

এর কয়েক মাস পর, ৪ এপ্রিল ২০১৯, তিনি এপস্টেইনকে একটি বার্তা পাঠান। সেখানে তিনি লেখেন যে তিনি একটি ‘স্বাভাবিক জীবন’ চান। নিজের নামে এপস্টেইন তৈরি করা একটি সংস্থার বিষয়েও তিনি জানতেন না বলে জানান। ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে তাঁর অস্বস্তি হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন।

রাশিয়া থেকে নিউইয়র্ক, তারপর বদলে গেল জীবন

মলচানোভার দাবি, তিনি যখন ২২ বছর বয়সি, তখন রাশিয়া থেকে নিউইয়র্কে এসেছিলেন। সেই সময় তিনি ইংরেজি বলতে পারতেন না। রাস্তায় এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। প্রথমে তাঁকে বন্ধুত্বপূর্ণ বলেই মনে হয়েছিল। পরের দিন এপস্টেইন তাঁকে প্রাতরাশে আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁর জীবন ও আগ্রহের বিষয়ে জানতে চান। মলচানোভা জানান, এপস্টেইন জানতে পারেন যে তিনি একটি নির্যাতনমূলক সম্পর্কে ছিলেন এবং ডিজাইন ও ফ্যাশনে আগ্রহী।

আরও পড়ুন: আদানির পর এবার টাটা কেমিক্যালসকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিল কেনিয়া

এরপর এপস্টেইন তাঁকে বলেন, ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে এবং নিউইয়র্কের ফ্যাশন ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা FIT-তে ভর্তি হওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারেন। প্রাতরাশের পর মলচানোভা রাশিয়ার নিজের শহরে ফিরে যান। পরে এপস্টেইন তাঁকে আবার নিউইয়র্কে আসতে বলেন এবং জানান, তাঁর সচিব FIT-তে একটি সফরের ব্যবস্থা করবেন।

প্যারিসের পর নিউইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্ট

পরবর্তী সময়ে প্যারিসে প্রেমিকের সঙ্গে থাকাকালীন মলচানোভার আবার এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। একটি দোকানে প্রেমিকের সঙ্গে তাঁর ঝামেলা হলে তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে যান এবং এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মলচানোভার দাবি, এপস্টেইন প্যারিসে পরিচিত একজনের মাধ্যমে রাশিয়ায় ফেরার টিকিটের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন। এরপর তাঁকে নিউইয়র্কের একটি অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে আরও কয়েকজন নারী থাকতেন। তাঁর দাবি, এই সময় থেকেই নির্যাতন শুরু হয়। তিনি বলেন, তখন তিনি বিভ্রান্ত ও দিশেহারা ছিলেন। কী ঘটছে, তা সেই মুহূর্তে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি; অনেক পরে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

পোশাক থেকে ওজন, সবকিছুতেই নিয়ন্ত্রণ

মলচানোরার বর্ণনা অনুযায়ী, এপস্টেইন ধীরে ধীরে নারীদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেন এবং পরে সেই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়ে উঠত। তাঁর অভিযোগ, এপস্টেইন নারীদের ক্রেডিট কার্ড দিতেন, কিন্তু কীভাবে টাকা খরচ করা হচ্ছে তার হিসাব চাইতেন। এমনকি প্রতিটি কেনাকাটার রসিদের ছবি তুলে রাখার নির্দেশও দেওয়া হতো। এপস্টেইনের দেওয়া ফোন এবং ল্যাপটপও তাঁর অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত থাকত বলে মলচানোভার দাবি।

শুধু অর্থ নয়, কী পোশাক পরতে হবে, কীভাবে চুল সাজাতে হবে, এমনকি ওজন কত থাকবে, সেসব বিষয়েও তিনি নির্দেশ দিতেন বলে অভিযোগ। নারীদের এপস্টেইনকে বিভিন্ন উপহারের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বার্তা পাঠাতেও বলা হতো। যেমন কোনও ব্রডওয়ে শো দেখানোর জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানানো। মলচানোভার দাবি, কেউ তা করতে অস্বীকার করলে এপস্টেইন চিৎকার করতেন।

ঘরে আটকে রাখার অভিযোগ

মলচানোভা আরও দাবি করেছেন, কখনও কখনও নারীদের একটি ঘরের মধ্যে থাকতে বলা হতো এবং বাইরে বেরোতে নিষেধ করা হতো। একবার তাঁকে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ওইভাবে আটকে রাখা হয়েছিল বলেও তাঁর দাবি। আরেক ঘটনায় তিনি জানান, এপস্টেইনের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি দ্বীপে তাঁকে দুই থেকে তিন দিন থাকতে হয়েছিল।

তাঁর অভিযোগ, এপস্টেইন নারীদের বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতেন এবং তাঁদের উপর হওয়া নির্যাতনের বিষয়ে কাউকে কথা বলতে দিতেন না। এমনকি আশপাশের মানুষদের নতুন তরুণীদের তাঁর কাছে নিয়ে আসতে উৎসাহিত করা হতো বলেও মলচানোভার দাবি। তিনি জানান, নিজে কখনও কোনও নারীকে এপস্টেইনের কাছে নিয়ে যাননি। তাঁর দাবি, এই নির্দেশ মানতে অস্বীকার করার জন্য তাঁকেও শাস্তি দেওয়া হয়েছিল।

সাহায্য চাইতেও ভয় পেতেন

মলচানোভা জানান, সেই সময় তিনি প্রায়ই বিষণ্ণ থাকতেন। একবার এপস্টেইনের কাছে থেরাপিস্টের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চেয়েছিলেন বলেও দাবি করেন। কিন্তু এপস্টেইন তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর মতে, এপস্টেইনের প্রভাব এবং ক্ষমতার কারণে পুলিশের কাছে যাওয়ার কথাও তিনি ভাবতে পারেননি।

এপস্টেইনের রাজনৈতিক নেতা এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল বলে তিনি জানতেন। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে নিজের জীবনের উপর বিপদ আসতে পারে বলে তিনি ভয় পেতেন।

মলচানোভার এই প্রথম প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে উঠে আসা অভিযোগগুলি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা। এপস্টেইন ২০১৯ সালে ফেডারেল যৌন পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পর কারাগারে মারা যান। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং তাঁর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *