জন্মাষ্টমীর পুজোর সময় কোন মন্ত্র উচ্চারণ করলে মিলবে ফল?
ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল। প্রতি বছর এই তিথিতেই দেশজুড়ে পালিত হয় তাই জন্মাষ্টমী। এ দিন মন্দিরের পাশাপাশি বহু বাড়িতেও বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়। শাস্ত্র মতে, নিষ্ঠা ও ভক্তি সহকারে জন্মাষ্টমীর পুজো করলে শ্রীকৃষ্ণের কৃপা লাভ করা যায়। একই সঙ্গে কিছু বিশেষ মন্ত্রোচ্চারণ করলে, তার সুফল পাওয়া যায়। শাস্ত্র অনুসারে, গৃহস্থদের জন্মাষ্টমীর পুজো করা উচিত। সম্ভব হলে পরিবারের সকল সদস্য একসঙ্গে পুজোয় অংশ নিন। তা সম্ভব না হলে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গেও এই পুজো করতে পারেন।
জন্মাষ্টমীর পুজোর বিধি
প্রথমে নিয়ম মেনে গুরুদেবের পুজো করুন। গুরুপুজো ও ধ্যানের পর গণেশের প্রার্থনা করে মূল পুজো শুরু করতে হয়। গণেশের দ্বাদশ নাম স্মরণ করে বাধা দূর করার প্রার্থনা করা হয়। তিনিই হলেন বিঘ্নহর্তা।
গণেশের প্রার্থনা
‘একদন্তং মহাকায়ং লম্বোদর গজাননম।
বিঘ্নবিনাশকং দেবং হেরম্বং পনমাম্যহম।
ওঁ সর্ববিঘ্ন বিনাশয় সর্বকল্যাণ হেতবে।
পার্বতী প্রিয় পুত্রায় গণেশায় নমো নমঃ।’
এর পর ডান হাতে জল, অক্ষত চাল, ফুল ও সিঁদুর নিয়ে পুজোর সংকল্প করতে হবে। নিজের গোত্র ও নাম উচ্চারণ করে শ্রীকৃষ্ণের সন্তুষ্টির জন্য পুজো করার সংকল্প নিন এবং সেই জল মাটিতে ফেলে দিন।
এর পর জলপূর্ণ একটি কলসি নিজের ডান দিকে রেখে তাতে বরুণ দেবতার আবাহন করুন। অক্ষত চাল ও ফুল দিয়ে কলসির পুজো করে গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু ও কাবেরী-সহ পবিত্র নদীগুলিকে কলসিতে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানাতে হয়।
এর পর পঞ্চপাত্রের জল মাথায় ছিটিয়ে শুদ্ধিকরণের মন্ত্র পাঠ করুন—
‘ওঁ অপবিত্রঃ পবিত্রো বা সর্বাবস্থাং গতোপি বা।
যঃ স্মরেত পুণ্ডরীকাক্ষং স বাহ্যাভ্যন্তরঃ শুচিঃ।’
এর পর একটি সুন্দর চৌকি বা দোলনায় শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ স্থাপন করুন। প্রথমে ধ্যানমন্ত্র পাঠ করে কৃষ্ণকে স্মরণ করুন। তার পর ষোড়শোপচারে পুজো শুরু করুন।
প্রথমে আসন পেতে করে অর্ঘ্য দিতে হবে। জল, সিঁদুর ও অক্ষত চাল দিয়ে অর্ঘ্য নিবেদন করুন। এর পর আচমনী দিয়ে জল অর্পণ করে শ্রীকৃষ্ণের স্নান করাতে হবে।
পঞ্চামৃত স্নান
প্রথমে সাধারণ জল দিয়ে স্নান করানোর পর দুধ, দই, ঘি, মধু ও চিনি দিয়ে একে একে স্নান করান। শেষে পঞ্চামৃত দিয়ে স্নান করিয়ে আবার পরিষ্কার জল দিয়ে বিগ্রহটি ধুয়ে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে নিন।
পঞ্চামৃত স্নান মন্ত্র
প্রথমে জল দিয়ে স্নান করিয়ে বলুন—
‘শ্রীকৃষ্ণায় নমঃ, স্নানং সমর্পয়ামি।’
এর পর দুধ দিয়ে স্নান করিয়ে বলুন—
‘শ্রীকৃষ্ণায় নমঃ, দুগ্ধস্নানং সমর্পয়ামি।’
দই দিয়ে স্নান করানোর সময় বলুন—
‘শ্রীকৃষ্ণায় নমঃ, দধিস্নানং সমর্পয়ামি।’
ঘি দিয়ে স্নান করিয়ে বলুন—
‘শ্রীকৃষ্ণায় নমঃ, ঘৃতস্নানং সমর্পয়ামি।’
মধু দিয়ে স্নান করানোর সময় বলুন—
‘শ্রীকৃষ্ণায় নমঃ, মধুস্নানং সমর্পয়ামি।’
চিনি বা শর্করা দিয়ে স্নান করিয়ে বলুন—
‘শ্রীকৃষ্ণায় নমঃ, শর্করাস্নানং সমর্পয়ামি।’
এর পর পঞ্চামৃত দিয়ে স্নান করাতে হবে। সেই সময় পাঠ করুন—
‘ওঁ পঞ্চ নদ্যঃ সরস্বতীমপি যন্তি সস্রোতসঃ।
সরস্বতী তু পঞ্চধা সো দেশেভবৎ সরিত্।
শ্রীকৃষ্ণায় নমঃ, পঞ্চামৃতস্নানং সমর্পয়ামি।’
এর পর কৃষ্ণকে হলুদ বা হলুদাভ রঙের পোশাক ও উত্তরীয় পরিয়ে দিন। হার, মুকুট, কানের দুল, কড়া ইত্যাদি অলঙ্কার পরাতে পারেন। কেশর-কর্পূর মিশ্রিত চন্দন কপালে লাগিয়ে অক্ষত চাল, সুগন্ধি ফুল ও মালা নিবেদন করুন। চন্দন মাখানো তুলসীপাতা শ্রীকৃষ্ণকে অর্পণ করুন।
এর পর ধূপ ও প্রদীপ দেখিয়ে নৈবেদ্য নিবেদন করুন। নৈবেদ্যের সঙ্গে জল রাখুন। নৈবেদ্য মন্ত্র হিসেবে জপ করতে পারেন—
‘ওঁ ক্লীং কৃষ্ণায় গোবিন্দায় গোপীজনবল্লভায় স্বাহাঃ।’
এর পর প্রাণ, অপান, ব্যান, উদান ও সমানের উদ্দেশে পাঁচটি মন্ত্র উচ্চারণ করে কৃষ্ণকে নৈবেদ্য নিবেদন করুন। বিভিন্ন ধরনের তাজা ফলও অর্পণ করুন। মুখশুদ্ধির জন্য তাম্বুল নিবেদন করা হয়।
সবশেষে শ্রীকৃষ্ণের আরতি করুন। আরতির পর দু’হাতে ফুল নিয়ে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করে প্রার্থনা ও নমস্কার করুন।
পুজোর শেষে জপ করুন অত্যন্ত পরিচিত কৃষ্ণমন্ত্র—
‘ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায় নমঃ।’
শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, এই মন্ত্র তিন মালা জপ (জপ মালা তিন চক্র করতে যতটা সময় লাগে) করার কথাও বলা হয়েছে। সবশেষে অক্ষত, ফুল ও সিঁদুর দিয়ে পুজো সম্পূর্ণ করার প্রার্থনা করুন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে পরিবারের সকলের মঙ্গল ও শান্তি কামনা করে পুজো শেষ করুন। এর পর পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সঙ্গে প্রসাদ গ্রহণ করুন।