মেডিক্যাল রিলিগেশন কাটিয়ে OTA গয়ায় নজির, সৈয়দ আবুর অনুপ্রেরণার জয়
কলকাতা: প্রথম চেষ্টাতেই সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ড বা SSB-তে সুপারিশ। এরপর শুরু অফিসার হওয়ার কঠিন প্রশিক্ষণ। কিন্তু সেই প্রশিক্ষণের প্রথম টার্মেই গুরুতর গোড়ালির চোট। মেডিক্যাল রিলিগেশনের…
কলকাতা: প্রথম চেষ্টাতেই সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ড বা SSB-তে সুপারিশ। এরপর শুরু অফিসার হওয়ার কঠিন প্রশিক্ষণ। কিন্তু সেই প্রশিক্ষণের প্রথম টার্মেই গুরুতর গোড়ালির চোট। মেডিক্যাল রিলিগেশনের কারণে প্রশিক্ষণ থেকে সাময়িকভাবে পিছিয়ে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু সেই ধাক্কাই শেষ পর্যন্ত তাঁর জেদ ও মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।
ওডিশার কটকের বাসিন্দা সিনিয়র আন্ডার অফিসার (SUO) সৈয়দ আবু হুরেরা-র (Syed Abu Hurera) সেনা অফিসার হওয়ার যাত্রা তাই শুধুমাত্র সাফল্যের গল্প নয়। এটি চোট, প্রতিকূলতা, পুনরুদ্ধার এবং ফের নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার গল্প।
শিক্ষকদের পরিবার থেকে সেনাবাহিনীতে
শিক্ষক-শিক্ষিকায় ভরা পরিবারে বড় হয়েছেন আবু হুরেরা। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে সেনাবাহিনীতে অফিসার হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে এগিয়েছেন তিনি। ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক আবু হুরেরার পরিচয় শুধু পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি জাতীয় স্তরের ফুটবলার এবং রাজ্য স্তরের অ্যাথলিট। খেলাধুলার ময়দানে পাওয়া শৃঙ্খলা, প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা, দলগতভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং কঠোর পরিশ্রমের অভ্যাস পরবর্তী সময়ে সামরিক প্রশিক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

Advertisements
প্রথম চেষ্টাতেই SSB-তে সাফল্য
সেনাবাহিনীতে অফিসার হওয়ার লক্ষ্যে তাঁর যাত্রায় বড় সাফল্য আসে প্রথম চেষ্টাতেই। ১৪ SSB এলাহাবাদে প্রথমবারেই সুপারিশ পান তিনি। এই সাফল্যের পর শুরু হয় অফিসার ট্রেনিং অ্যাকাডেমি বা OTA গয়া-য় প্রশিক্ষণ। কিন্তু নির্বাচন থেকে কমিশনিং পর্যন্ত পথ যে সহজ হবে না, তা দ্রুতই বুঝতে পারেন আবু হুরেরা।
প্রশিক্ষণের প্রথম টার্মেই গুরুতর চোট
OTA গয়ায় প্রশিক্ষণ চলাকালীন তাঁর গোড়ালিতে গুরুতর চোট লাগে। শারীরিক সক্ষমতা এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স যেখানে অফিসার প্রশিক্ষণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সেখানে এই চোট তাঁর প্রশিক্ষণের গতিপথে বড় ধাক্কা দেয়। চোটের কারণে প্রথম টার্মেই তাঁকে মেডিক্যাল রিলিগেশনের মুখোমুখি হতে হয়। অর্থাৎ, শারীরিক সমস্যার কারণে প্রশিক্ষণ থেকে তাঁকে সাময়িকভাবে পিছিয়ে যেতে হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে অনেকের কাছেই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন থেমে যাওয়ার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু আবু হুরেরা হাল ছাড়েননি।
চোটকে দুর্বলতা হতে দেননি
চোটের সময়টা ধৈর্য এবং মানসিক শক্তির সঙ্গে মোকাবিলা করেন তিনি। ব্যথা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও সুস্থ হয়ে ফের প্রশিক্ষণে ফেরার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত পুনরুদ্ধার করে নতুন উদ্যমে প্রশিক্ষণে ফেরেন আবু হুরেরা। তাঁর প্রত্যাবর্তন শুধুমাত্র প্রশিক্ষণে ফিরে আসা ছিল না, বরং আগের জায়গা থেকে আরও শক্তিশালীভাবে নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগও ছিল। এরপর শারীরিক প্রশিক্ষণে তাঁর পারফরম্যান্সে সেই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যায়।
শারীরিক প্রশিক্ষণে Merit Card
চোট কাটিয়ে ফেরার পর শারীরিক প্রশিক্ষণে অসাধারণ পারফরম্যান্স করেন তিনি। এর স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন Merit Card। শুধু তাই নয়, অ্যাথলেটিক্সেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন আবু হুরেরা। অ্যাকাডেমিতে অ্যাথলেটিক্সে Gold Medal অর্জন করেন তিনি। অর্থাৎ, যে চোট একসময় তাঁকে প্রশিক্ষণ থেকে পিছিয়ে দিয়েছিল, তার পরেই শারীরিকভাবে অত্যন্ত কঠিন কার্যকলাপে সাফল্য অর্জন তাঁর প্রত্যাবর্তনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
ফুটবল ও অ্যাথলেটিক্সের অভিজ্ঞতা কাজে এসেছে
জাতীয় স্তরে ফুটবল এবং রাজ্য স্তরে অ্যাথলেটিক্সে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিজ্ঞতা আবু হুরেরাকে আগে থেকেই শৃঙ্খলা, সহনশীলতা, দলগত কাজ এবং প্রতিযোগিতার সঙ্গে পরিচিত করে তুলেছিল। তবে OTA-র চোট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা। এখানে শুধু শারীরিক সক্ষমতা যথেষ্ট ছিল না। প্রয়োজন হয়েছিল ধৈর্য, মানসিক দৃঢ়তা এবং আবার শুরু করার মানসিকতা। সেই পরীক্ষাতেই সফল হয়েছেন তিনি।
SSB-র সাফল্যই শেষ নয়
আবু হুরেরার অভিজ্ঞতা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। SSB-তে নির্বাচিত হওয়া সেনা অফিসার হওয়ার দীর্ঘ যাত্রার মাত্র একটি ধাপ। এর পরের প্রশিক্ষণে প্রয়োজন হয় নিয়মিত শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা, শৃঙ্খলা, দলগতভাবে কাজ করার ক্ষমতা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইতিবাচক থাকার মানসিকতা। OTA গয়ায় তাঁর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, প্রশিক্ষণের মাঝখানে তৈরি হওয়া কোনও বাধা ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পথে শেষ কথা নয়।
কটক থেকে নতুন পথে
কটকের শিক্ষক পরিবারের সন্তান হিসেবে সেনাবাহিনীতে অফিসার হওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর জন্য ব্যক্তিগতভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে এই পেশায় আসার মাধ্যমে নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি একটি নতুন দিকও তৈরি করেছেন তিনি। তাঁর যাত্রায় শিক্ষার পরিবেশ, খেলাধুলার অভিজ্ঞতা এবং সামরিক প্রশিক্ষণের কঠোরতা একসঙ্গে মিশেছে। প্রথম চেষ্টায় SSB-তে সুপারিশ, OTA গয়ায় মেডিক্যাল রিলিগেশন, চোট থেকে প্রত্যাবর্তন, Merit Card এবং অ্যাথলেটিক্সে Gold Medal, প্রতিটি ধাপ তাঁর অধ্যবসায়ের আলাদা প্রমাণ।
প্রতিকূলতার পরেও লক্ষ্য থেকে সরে যাননি
সৈয়দ আবু হুরেরার গল্পের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল, কোনও বাধা সাময়িকভাবে পথ আটকে দিতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য থেকে সরিয়ে দিতে পারে না। গোড়ালির চোট তাঁর প্রশিক্ষণকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু তাঁর লক্ষ্যকে থামাতে পারেনি। বরং ফিরে এসে শারীরিক প্রশিক্ষণ ও অ্যাথলেটিক্সে সাফল্য অর্জন করে তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিকূলতার পরে প্রত্যাবর্তন আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ফুটবল ও অ্যাথলেটিক্সের মাঠ থেকে OTA গয়ার কঠোর প্রশিক্ষণ পর্যন্ত আবু হুরেরার যাত্রায় তাই বারবার ফিরে এসেছে একটি বিষয়ই, হার না মানার মানসিকতা। চ্যালেঞ্জ এসেছে, পথ থেমেছে, কিন্তু লক্ষ্য বদলায়নি। তাঁর সাফল্য সেই দৃঢ়তারই প্রতিফলন।