ভারতে বড় EV বিপ্লবের ইঙ্গিত, পেট্রল-ডিজেল গাড়িতে কড়া নীতি আসছে?
নয়াদিল্লি: আগামী পাঁচ বছরে ভারতের অটোমোবাইল শিল্পে বড়সড় পরিবর্তন আসতে চলেছে (EV Revolution)। দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি পেট্রল ও ডিজেলচালিত প্রচলিত গাড়ির ক্ষেত্রে…
নয়াদিল্লি: আগামী পাঁচ বছরে ভারতের অটোমোবাইল শিল্পে বড়সড় পরিবর্তন আসতে চলেছে (EV Revolution)। দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি পেট্রল ও ডিজেলচালিত প্রচলিত গাড়ির ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতি আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে কেন্দ্র। এমনই ইঙ্গিত দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপদেষ্টা তরুণ কাপুর।
নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ৬৬তম SIAM Annual Convention-এ বক্তব্য রাখতে গিয়ে তরুণ কাপুর বলেন, ভারতের অটোমোবাইল সেক্টর আগামী পাঁচ বছরে শুধুমাত্র ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হবে না, বরং একটি বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে যাবে। এই পরিবর্তনের জন্য গাড়ি নির্মাতাদের এখন থেকেই প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
পেট্রল-ডিজেল গাড়িতে আরও কড়া বিধিনিষেধ?
তরুণ কাপুরের বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে ইন্টারনাল কম্বাসশন ইঞ্জিন বা ICE গাড়ির উপর সম্ভাব্য বিধিনিষেধ। দিল্লি-এনসিআরে ইতিমধ্যেই যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতে তার মডেল দেশের অন্যান্য এলাকাতেও প্রয়োগ করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে কার্যকর হওয়া বিভিন্ন নীতি দেশের অন্য অংশের জন্যও একটি মডেল হিসেবে কাজ করতে পারে। সেই ধরনের বিধিনিষেধ আরও এলাকায় চালু হলে ইলেকট্রিক গাড়ির চাহিদা দ্রুত বাড়তে পারে। দিল্লির ২০২৬ সালের ইভি নীতিতেও ধাপে ধাপে বিভিন্ন ধরনের গাড়িকে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় নিয়ে আসার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
Read More: ৫ কোটির বিনিময়ে ধর্ষণ-কাণ্ডে রফা! কাঠগড়ায় পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর স্ত্রী
Advertisements
২০২৭ থেকে নতুন N1 গুডস ক্যারিয়ার ইলেকট্রিক হতে পারে
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নতুন N1 গুডস ক্যারিয়ার। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন করে রেজিস্ট্রেশন হওয়া N1 শ্রেণির পণ্যবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে ইলেকট্রিক মডেল বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর পর আরও বড় পরিবর্তন আসতে পারে দুই-চাকার গাড়ির ক্ষেত্রে। ২০২৮ সালের এপ্রিল থেকে নতুন দুই-চাকার গাড়ির রেজিস্ট্রেশন শুধুমাত্র ইলেকট্রিক মডেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তবে এই নীতিগুলির জাতীয় স্তরে কার্যকর হওয়ার সময় ও পরিধি নিয়ে এখনও বিস্তারিত সরকারি ঘোষণা আসেনি।
ডিজেল নির্ভরতা কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
ভারতের ইভি রূপান্তরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাগুলির একটি হিসেবে ভারী বাণিজ্যিক গাড়ি, বিশেষ করে ট্রাকের কথা উল্লেখ করেছেন তরুণ কাপুর। তাঁর বক্তব্য, দেশের শক্তি নিরাপত্তার জন্য ডিজেলের ব্যবহার কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পেট্রলের চাহিদা বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসারের সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু ভারী যানবাহনে ডিজেলের উপর নির্ভরতা কমানো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার তাই বৈদ্যুতিক ট্রাককে শুধুমাত্র পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছে না। কয়েকশো ইলেকট্রিক ট্রাকের ছোট প্রকল্প দিয়ে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। বাজারকে কয়েক গুণ নয়, ১০ গুণ বা তারও বেশি হারে বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন।
Read More: লক্ষাধিক সাইবার হামলার আশঙ্কা! ব্রিকসের আগে ‘ডিজিটাল দুর্গ’ গড়ছে ভারত
খনি ও কয়লা শিল্পকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান
বড় ফ্লিট অপারেটরদের এই পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। বিশেষ করে খনি ও কয়লা শিল্পে ব্যবহৃত ভারী যানবাহনকে ইলেকট্রিক করার মাধ্যমে দ্রুত বড় পরিসরে বৈদ্যুতিক ট্রাকের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন ডিজেলের ব্যবহার কমবে, অন্যদিকে বড় বাণিজ্যিক ফ্লিটে ইভির বাস্তব প্রয়োগও বাড়বে।
দেশীয় ব্যাটারি উৎপাদনে জোর
ইলেকট্রিক গাড়ির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ব্যাটারি। সেই কারণে আমদানি করা ব্যাটারির উপর কর এবং অন্যান্য নীতি নিয়েও সরকার পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছেন কাপুর। এর মূল লক্ষ্য হল দেশে ব্যাটারি উৎপাদনের পরিকাঠামো এবং স্থানীয় ভ্যালু অ্যাডিশন বাড়ানো। ভারত যাতে শুধুমাত্র বিদেশ থেকে ব্যাটারি বা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আমদানির উপর নির্ভরশীল না থাকে, সেদিকেই নজর সরকারের।
চার্জিং পরিকাঠামো নিয়েও উদ্বেগ
ইভি প্রসারের পথে চার্জিং পরিকাঠামোও বড় সমস্যা। দেশে বিভিন্ন তেল বিপণন সংস্থা ইতিমধ্যেই বহু চার্জিং স্টেশন তৈরি করেছে। কিন্তু ব্যবহার কম হওয়ায় কিছু স্টেশন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে পরিষেবা দিচ্ছে না। তরুণ কাপুরের মতে, শুধু চার্জিং স্টেশন তৈরি করলেই হবে না। প্রয়োজন পেশাদার চার্জিং অপারেটর, যারা দীর্ঘমেয়াদে পরিকাঠামো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারবে। ইভি আরও সাশ্রয়ী করতে সরকার নতুন ধরনের ফাইন্যান্সিং মডেল, ব্যাটারি সোয়াপিং এবং হাইওয়েতে উন্নত চার্জিং পরিকাঠামোর মতো বিভিন্ন বিকল্পও বিবেচনা করছে।
Read More: ভোটার তালিকা থেকে বাদ রাঘব চাড্ডা! আপ-এর বিরুদ্ধে ‘প্রতিহিংসা’র তোপ বিজেপি সাংসদের
শুধু পরিবেশ নয়, শক্তি নিরাপত্তাও লক্ষ্য
ভারতের ইভি নীতির পিছনে পরিবেশগত কারণের পাশাপাশি এনার্জি সিকিউরিটি-ও গুরুত্বপূর্ণ বলে স্পষ্ট করেছেন কাপুর। ভারত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি আমদানি করে। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসারকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখছে সরকার। একই সঙ্গে এই পরিবর্তনকে দেশের অটোমোবাইল শিল্পের জন্য বড় সুযোগ হিসেবেও দেখছেন তিনি। দেশীয় গবেষণা ও উন্নয়ন, গাড়ির ডিজাইন, যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়লে ভারত বিশ্ব বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। তরুণ কাপুরের বার্তা, আগামী পাঁচ বছরে ভারতের অটোমোবাইল শিল্পে ছোট ছোট পরিবর্তনের বদলে একটি বড় রূপান্তর প্রয়োজন। সেই পরিবর্তন সফল করতে সরকার এবং গাড়ি শিল্পকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।