জাপানের নতুন যুদ্ধজাহাজে ৩৬০ ডিগ্রি নজর, থাকছে শক্তিশালী SPY-7 Radar
উত্তর কোরিয়া ও আশপাশের অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি মোকাবিলায় নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধজাহাজ তৈরি করছে জাপান। এই দুই জাহাজে থাকবে অত্যাধুনিক এএন/এসপিওয়াই-৭ রাডার (SPY-7 Radar), যা জাপানের সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
জাপানের তৈরি হতে থাকা এই দুই যুদ্ধজাহাজকে বলা হচ্ছে এজিস সিস্টেম ইকুইপড ভেসেল বা এএসইভি। প্রতিটি জাহাজে চারটি স্পাই-৭ রাডার অ্যারে থাকবে। এর ফলে চারদিক মিলিয়ে ৩৬০ ডিগ্রি এলাকায় নজরদারি চালানো সম্ভব হবে।
সম্প্রতি প্রথম জাহাজটির নির্মাণকাজ এগিয়ে যাওয়ার ছবি সামনে এসেছে। সেখানে মাস্টের সঙ্গে বড় স্পাই-৭ রাডার অ্যারেগুলি সংযুক্ত অবস্থায় দেখা গিয়েছে।
ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তে স্পাই-৭
এএন/এসপিওয়াই-৭(ভি)১ রাডারটি মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সংস্থার লং রেঞ্জ ডিসক্রিমিনেশন রাডার কর্মসূচি থেকে উদ্ভূত প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি।
এই রাডারের মূল কাজ শুধু দূর থেকে কোনও বস্তু শনাক্ত করা নয়। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য আকাশপথের হুমকি শনাক্ত, অনুসরণ এবং আলাদা করে চিহ্নিত করতে পারে এটি। এরপর এজিস যুদ্ধ ব্যবস্থা পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
জাপানের দাবি, পুরনো স্পাই-১ রাডারের তুলনায় স্পাই-৭-এর ট্র্যাকিং ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। একই সময়ে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতিবিধির উপর নজর রাখার ক্ষমতাও রয়েছে এই ব্যবস্থায়।
রাডারটি বাস্তব লক্ষ্যবস্তু খোঁজা, শনাক্ত করা, পরিচয় নির্ধারণ, অনুসরণ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো হুমকি থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করার সক্ষমতাও প্রদর্শন করেছে। ২০২৬ সালের মার্চে জাপানের এএসইভি কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাস্তব লক্ষ্যবস্তু অনুসরণের পরীক্ষা করা হয়েছিল।
চারটি রাডার অ্যারে, ৩৬০ ডিগ্রি নজরদারি
প্রতিটি এএসইভিতে চারটি স্পাই-৭ রাডার অ্যারে বসানো হবে। চারটি অ্যারে মিলে জাহাজের চারদিক কভার করবে। ফলে কোনও একটি নির্দিষ্ট দিকের পরিবর্তে চারদিক থেকেই আসা আকাশপথের হুমকির উপর নজর রাখা সম্ভব হবে।
এই ব্যবস্থা এজিস যুদ্ধ ব্যবস্থার সঙ্গে একত্রে কাজ করবে। ফলে রাডার থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র বা অন্যান্য আকাশপথের লক্ষ্যবস্তুকে একই সময়ে অনুসরণ এবং মোকাবিলা করার ক্ষমতা জাহাজগুলির থাকবে।
১২৮টি উল্লম্ব ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কোষ
জাপানের নতুন এই যুদ্ধজাহাজগুলির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র বহনের ক্ষমতা। প্রতিটি এএসইভিতে থাকবে ১২৮টি ভার্টিক্যাল লঞ্চ সিস্টেম বা ভিএলএস সেল।
এই উৎক্ষেপণ কোষগুলিতে এসএম-৩ ব্লক আইআইএ এবং এসএম-৬-এর মতো প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা যাবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন ধরনের অস্ত্র ও প্রযুক্তি যুক্ত করার জন্যও জাহাজগুলিকে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ একটি এএসইভি একই সঙ্গে শক্তিশালী রাডার, এজিস যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারবে।
এজিস অ্যাশোর বাতিলের পর সমুদ্রভিত্তিক সমাধান
জাপান প্রথমে স্থলভিত্তিক এজিস অ্যাশোর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা করেছিল। সেই পরিকল্পনা বাতিল হওয়ার পর সমুদ্রভিত্তিক এই নতুন যুদ্ধজাহাজ তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
জাহাজগুলির অন্যতম সুবিধা হল এগুলিকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করা সম্ভব। ফলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির পরিবর্তে জাপান মোবাইল এবং দীর্ঘসময় ধরে সমুদ্রে সক্রিয় থাকতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাচ্ছে। প্রথম এএসইভি ২০২৭ অর্থবর্ষে জাপানের নৌবাহিনীতে যুক্ত হওয়ার কথা। দ্বিতীয়টি যুক্ত হবে ২০২৮ অর্থবর্ষে। দু’টি জাহাজেই স্পাই-৭ রাডারের সঙ্গে এজিস অস্ত্র ব্যবস্থা একত্রিত করা হবে।
উত্তর কোরিয়া নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
জাপানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার অন্যতম প্রধান কারণ উত্তর কোরিয়া। টোকিওর মতে, পিয়ংইয়ং নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আরও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি তৈরি করছে।
২০২৬ সালের আগস্টে জাপান জানিয়েছিল, উত্তর কোরিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৬৯০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে জাপান সাগরে গিয়ে পড়ে। টোকিও এই উৎক্ষেপণকে জাপান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিল।
জাপানের ২০২৬ অর্থবর্ষের প্রতিরক্ষা বাজেটেও ক্ষেপণাস্ত্র এবং যুদ্ধবিমানসহ আরও বৈচিত্র্যময় ও জটিল হুমকি শনাক্ত ও অনুসরণ করার সক্ষমতা বাড়ানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
চিনও বড় উদ্বেগের কারণ
উত্তর কোরিয়ার পাশাপাশি চিনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিও জাপানের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জাপানের ২০২৬ সালের প্রতিরক্ষা শ্বেতপত্রে চিনকে দেশের “সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
টোকিওর মতে, চিন দ্রুত তার পরমাণু, ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ এবং বিমান বাহিনীর পরিসর ও সক্ষমতা বাড়িয়েছে। ফলে জাপানকে একসঙ্গে একাধিক ধরনের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে এএসইভি প্রকল্প জাপানের প্রতিরক্ষা কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। চারটি স্পাই-৭ রাডার অ্যারে, এজিস যুদ্ধ ব্যবস্থা এবং ১২৮টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কোষ একত্রে এই জাহাজগুলিকে জাপানের ভবিষ্যৎ সমুদ্রভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার অন্যতম শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে পারে।