হাফ-ম্যাচ অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনে সেরে গেল অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া
অনির্বাণ ঘোষ
রোগের সঙ্গে লড়াই চলছিল বহু দিন। শরীর ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল। বাঁচতে গেলে প্রয়োজন ছিল অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন বা বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট। কিন্তু চিকিৎসার সেই শেষ দরজায় পৌঁছেও বড় ধাক্কা— মেলেনি ‘ফুল ম্যাচ’ ডোনার। শেষ পর্যন্ত সামনে ছিল মাত্র একটি পথ— ‘হাফ ম্যাচ’ বা আংশিক মিলকে আঁকড়ে ঝুঁকিপূর্ণ হ্যাপলো-আইডেন্টিক্যাল ট্রান্সপ্লান্ট।
সেই কঠিন পথেই শেষ পর্যন্ত সাফল্য এনেছে এনআরএস মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ৩২ বছরের ‘সিভিয়ার অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া’ আক্রান্ত মেদিনীপুরের বাসিন্দা ব্রজগোপাল কামিল্যার শরীরে সফল ভাবে সম্পন্ন হয়েছে হ্যাপলো-আইডেন্টিক্যাল বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট। চিকিৎসকদের দাবি, দেশের সরকারি কোনও চিকিৎসা কেন্দ্রে অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার চিকিৎসায় এ ধরনের সফল ট্রান্সপ্লান্ট সম্ভবত এই প্রথম। তাঁদের মতে, সম্পূর্ণ মিলযুক্ত ডোনার না–পাওয়া বহু রোগীর সামনে এই সাফল্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।
গত মার্চে চরম দুর্বলতা, ফ্যাকাশে শরীর, মারাত্মক রক্তাল্পতা, বারংবার রক্ত নেওয়ার ঝক্কি, মাঝেমধ্যে জ্বর, শরীরে কালশিটে দাগ ও অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ার উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসার জন্য প্রথমে ভূবনেশ্বর এইমসে যান ব্রজগোপাল। পরীক্ষা ও বোন ম্যারো বায়োপসির পরে ধরা পড়ে রোগ। তাঁকে এনআরএসে রেফার করা হয়। এই রোগে অস্থিমজ্জা পর্যাপ্ত রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না। ফলে কমে যায় লোহিত রক্তকণিকা (আরবিসি)), শ্বেত রক্তকণিকা (ডবলিউবিসি) ও অণুচক্রিকা (প্লেটলেট)। বাড়ে তীব্র দুর্বলতা, সংক্রমণ ও অনিয়ন্ত্রিত রক্তপাতের ঝুঁকি। গুরুতর ক্ষেত্রে রোগটি বিলক্ষণ প্রাণঘাতীও।
এনআরএসে প্রথমে ইমিউনোসাপ্রেসিভ থেরাপি ও রক্ত দেওয়া চললেও প্রত্যাশিত ফল না মেলায় অ্যালোজেনিক বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু আদর্শ ‘ফুল ম্যাচ’ এইচএলএ (হিউম্যান লিউকোসাইট অ্যান্টিজেন)–যুক্ত ডোনার মেলেনি। রোগীর ৪৪ বছরের ভাইয়ের সঙ্গে মিল ছিল মাত্র ৫/১০। আর এখানেই হ্যাপলো-ট্রান্সপ্লান্টের বড় চ্যালেঞ্জ। এইচএলএ-র পূর্ণ মিল না থাকলে প্রতিস্থাপিত কোষকে রোগীর শরীর প্রত্যাখ্যান করতে পারে। আবার দাতার প্রতিরোধী কোষ রোগীর শরীরের অঙ্গ ও টিস্যুকে আক্রমণ করে ‘গ্রাফ্ট ভার্সাস হোস্ট ডিজিজ’-এর মতো গুরুতর প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই দাতা ও রোগীর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখাই ছিল সবচেয়ে কঠিন।
এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এনআরএসের হেমাটোলজি বিভাগের শিক্ষক–চিকিৎসক সন্দীপ সাহা ও তাঁর দল। প্রশাসন, নার্সিং কর্মী এবং মাইক্রোবায়োলজি, রেডিওথেরাপি ও ব্লাড ব্যাঙ্ক-সহ বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে সম্প্রতি সফল হয় প্রতিস্থাপন। এখন রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ, ফুরিয়েছে রক্ত নেওয়ার প্রয়োজনও। প্রায় চার সপ্তাহ পরে তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।