‘সম্পর্ক রক্তেরই, DNA দিতে পাড়ি’, উদ্বেগের সাত দিন, অন্ধকারে পরিবার
এই সময়: আদৌ কি ফিরবেন তাঁরা? প্রশ্নটা তাড়া করে বেড়াচ্ছে অসহায় মানুষগুলোকে। সাত দিন পেরিয়ে গিয়েছে। ‘বলুন তো! এত দিনে কি একবারও যোগাযোগ করত না?’ — ভয়ঙ্কর হতাশা গ্রাস করে মিলনকে। তাঁর বাবা স্বপন সিনহা হারিয়ে গিয়েছেন পাহাড়ের কোলে।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পরিবারগুলি ঘিরে ‘মন খারাপ’–এর ছবি। মানসরোবরে বেড়াতে গিয়ে এক সপ্তাহ আগে হড়পা বানের তোড়ে কি ভেসেই গেলেন রাজ্যের এতগুলো মানুষ? আতান্তরে আত্মীয়রা। কী করবেন তাঁরা এখন? কোথায় খুঁজবেন? প্রতিবেশী–আত্মীয়রা ঠারে–ঠোরে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, ‘মেনে নাও।’ কিন্তু, কারও বাবা–মা, কারও সন্তান, কারও ভাই কারও দিদি — এ ভাবে না যাচাই করে, কী করে মেনে নেবেন, হড়পা বানে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে তাঁদের! নেপাল সরকার জানিয়েছে, ডিএনএ স্যাম্পেল নেওয়া হচ্ছে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া পর্যটক দলের আত্মীয়দের। মরিয়া হয়ে কেউ ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছেন কাঠমান্ডুতে। হাতড়ে বেড়াচ্ছেন আহত–নিহতদের তালিকা।
পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের প্রেমবাজারে বাড়ি স্বপনের। অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী। ২৫ অগস্টের পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ছেলে অর্ণব ও মিলন একবার নেপালে থাকা ভারতীয় দূতাবাসে ফোন করছেন। একবার কলকাতার ভবানী ভবনে। মঙ্গলবার খড়্গপুরের এসডিপিও-র সঙ্গেও দেখা করে জানতে চান, ডিএনএ পরীক্ষার কথা। পুলিশ জানিয়েছে, এখনও সরকারি ভাবে সেরকম কোনও নির্দেশিকা আসেনি।
বুধবার বাড়ির বাইরে থেকে ফোন করতেই বেরিয়ে এলেন কলকাতার নেতাজিনগরের গুঞ্জা মুখোপাধ্যায়। বিবর্ণ মুখ। একমাত্র বোন, অবিবাহিতা রিনা বন্দ্যোপাধ্যায় একাই গিয়েছিলেন বেড়াতে। ৫২ বছরের রিনা কথা দিয়ে গিয়েছিলেন মানসরোবরের পবিত্র জল নিয়ে আসবেন। খোঁজ নেই তাঁর। বাড়িতে ৮৪ বছরের বৃদ্ধা মা। গুঞ্জার কথায়, ‘মাকে কিছু বলিনি। ৭ সেপ্টেম্বর ফেরার কথা বোনের। আগেও তো ঘুরতে গিয়েছে। কখনও কেদারনাথ, কখনও তপোবন। কই…’
বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি টাউনশিপের অমরনাথ পালের একতলার ফ্ল্যাটে কলিংবেল বাজাতেই বেরিয়ে এলেন মেয়ে রূপমা। দরজা আগলে বললেন — ‘একই কথা বলতে বলতে ক্লান্ত লাগছে। লাভ তো কিছু হচ্ছে না। এত দিনেও কোনও খোঁজ পেলাম না বাবার। ডিএনএ টেস্টের জন্য অপেক্ষা করছি। কাউকে কিছু আর বলার নেই।’ পর্ণশ্রীর রঞ্জিত কুমার হাওলাদারের মেয়ে সুনন্দাও ডিএনএ স্যাম্পলিং এর জন্য অপেক্ষা করছেন। হতাশ শোনায় তাঁকে, ‘বুঝতে পারছি, এত দিন এ ভাবে জীবিত থাকা কার্যত অসম্ভব। কিন্তু, মন বলছে যদি কোনও মিরাক্ল হয়!’ সুনন্দা কর্মসূত্রে মুম্বই থাকেন। বাবার নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে চলে এসেছেন শহরে। বললেন, ‘মা কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। হার্টের সমস্যা আছে। বাড়িতে কাউকে আসতে মানা করেছি।’
মিরাকল–এর আশায় রয়েছেন শুভ্রজিৎ সিনহা রায়। তাঁর স্ত্রী, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার লোপামুদ্রা কুণ্ডু–রও খোঁজ নেই কোনও। বুধবার শুভ্রজিৎ বলছিলেন, ‘২১ অগস্ট গিয়েছিল। ২৬ তারিখ জানিয়েছিল চিন সীমান্তে রয়েছেন। নেটওয়ার্কের সমস্যা হতে পারে।’ তিনিও নেপাল যেতে পারেন, জানালেন শুভ্রজিৎ। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের শিক্ষক দম্পতি স্বপন ও মৌ মণ্ডলের খোঁজে অস্ট্রেলিয়া থেকে কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছেন তাঁদের একমাত্র ছেলে উষ্ণীষ। বাবা–মায়ের খোঁজে হেলিকপ্টারে দুর্গত এলাকায় যেতে চান উষ্ণীষ — এমনটাই জানালেন প্রতিবেশী কমল মুখোপাধ্যায়। ফেসবুকে উষ্ণীষের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে তাঁর। পাহাড়ের কোলে হারিয়ে গিয়েছেন তৃণমূলের প্রয়াত নেতা মুকুল রায়ের পুত্রবধূ শর্মিষ্ঠা ভৌমিক রায়। মুকুল–পুত্র শুভ্রাংশু ভরসা রাখছেন রাজ্য সরকারের উপরে। এখনই নেপালে যাচ্ছেন না।
এদিকে অস্থির হয়ে বুধবারেই নেপালে ছুটেছেন নিলয় ও অনীক। তাঁদের বিশ্বাস, বেঁচে আছেন মা। হয়তো কোনও হাসপাতালে ভর্তি আছেন। হুগলির সিঙ্গুরের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা শিপ্রা রায় পাটারি একাই গিয়েছিলেন বেড়াতে। স্বামী রবীন পাটারি অসুস্থতার কারণে যাননি। নিলয় আমেরিকায় থাকেন। মায়ের খবর পেয়ে সোমবার চন্দননগরের বাড়িতে ফেরেন। বেঙ্গালুরু থেকে এসেছে ছোট ছেলে অনীকও। ওদের বন্ধু আছে নেপালে।
এ তো গেল পর্যটকদের কথা। বাঁকুড়ার ইন্দপুরের অশোক পাল নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সুপারভাইজ়ার ছিলেন। বর্ধমান শহর সংলগ্ন লাকুর্ডিতে তাঁর বোন কবিতা দাসের বাড়ি। এখন সেখানেই রয়েছেন অশোকের বাবা মুক্তারাম ও মা লক্ষ্মীরানি। দু’বছরের পুত্রকে নিয়ে বীরভূমের মল্লারপুরে বাপের বাড়ি থেকে চলে এসেছেন অশোকের স্ত্রী জবা পালও। আত্মীয় সানি দাস জানালেন, কবিতা ঘন ঘন অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন। কখনও বিড়বিড় করে বলছেন — ‘তোকে যেতে বারণ করেছিলাম। কেন গেলি?’
বর্ধমানের দেওয়ানদিঘির বাসিন্দা সন্দীপ গড়াই (৪৩)–ও নেপালের হাইড্রোপাওয়ার প্রজেক্টে স্টোরকিপার ছিলেন। নেপালের রাসুয়ায় হড়পা বানের পর থেকে কোনও খোঁজ নেই তাঁর। পরিবারে দু’ভাই-তিন দিদির মধ্যে সন্দীপ ছোট। স্ত্রী তিথির মুখের দিকে তাকাতে পারছেন না কেউই। তাঁর কাছে যেতে বললেন, ‘জানি না মানুষটা বেঁচে আছে না মারা গিয়েছে। পুলিশ-প্রশাসন কিছুই জানাচ্ছে না। ছোট ছেলেটাকে নিয়ে কী করব জানি না। ও ছাড়া আমার তো কেউ নেই।’
হারিয়ে যাওয়া পর্যটকদের তালিকায় রয়েছেন দুর্গাপুরের অম্বুজানগরীর বাসিন্দা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের মেয়ে–জামাই মঙ্গলবার কাঠমান্ডুতে পৌঁছেছেন। আগেই নেপালে গিয়েছেন দেবাশিসের ভাই ও শ্যালক। সেখানকার হাসপাতালগুলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তাঁরা। একই অবস্থা বামুনাড়া এলাকার বাসিন্দা মৌসুমি গঙ্গোপাধ্যায় ও তাঁর স্বামী অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়ের। তাঁদেরও কোনও খোঁজ নেই। নিখোঁজ শ্রীনগরপল্লির বাসিন্দা সুভাষচন্দ্র ঘোষ।
হুগলির উত্তরপাড়ার দম্পতি ক্ষিতীশ ও মমতা বিশ্বাসেরও খোঁজ নেই। বাড়িতে তালা ঝুলছে। তাঁদের একমাত্র মেয়ে ১৮ বছর বয়সে পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। তারপর থেকে পুজো–আচ্চা নিয়েই থাকতেন তাঁরা। সারা বছর ঘুরে বেড়াতেন।