নৌবাহিনীতে দেশীয় স্যাটকম টার্মিনাল, জিএসএটি-৭আর-এ শক্তিশালী হবে যোগাযোগ
কলকাতা: ভারতীয় নৌবাহিনী (Indian Navy) নিজেদের নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করতে চলেছে। আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে নৌবাহিনী দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি জাহাজভিত্তিক স্যাটেলাইট…
কলকাতা: ভারতীয় নৌবাহিনী (Indian Navy) নিজেদের নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করতে চলেছে। আধুনিকীকরণের অংশ হিসেবে নৌবাহিনী দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি জাহাজভিত্তিক স্যাটেলাইট যোগাযোগ বা স্যাটকম টার্মিনাল তৈরির জন্য আগ্রহপত্র বা এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট জারি করেছে।
নতুন এই টার্মিনালগুলি নৌবাহিনীর সর্বশেষ যোগাযোগ উপগ্রহ জিএসএটি-৭আর-এর সঙ্গে কাজ করবে। লক্ষ্য হল এমন একটি দেশীয় এবং শিল্প সংস্থার অর্থায়নে তৈরি স্যাটকম ব্যবস্থা তৈরি করা, যার মাধ্যমে সমুদ্রের হাজার হাজার কিলোমিটার দূরেও যুদ্ধজাহাজগুলি নিরাপদ ভয়েস, ডেটা এবং ভিডিও যোগাযোগ বজায় রাখতে পারে।
জিএসএটি-৭আর-এর সঙ্গে কাজ করবে নতুন টার্মিনাল
ভারতীয় নৌবাহিনী ২০১৩ সাল থেকেই উপগ্রহ যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করছে। সেই সময় জিএসএটি-৭ বা রুক্মিণী পরিষেবায় আসার পর নৌবহর একটি নিরাপদ যোগাযোগ নেটওয়ার্ক পেয়েছিল। গত বছরের নভেম্বরে জিএসএটি-৭আর উৎক্ষেপণের মাধ্যমে সেই ক্ষমতা আরও বাড়ে। এই উপগ্রহ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত নিরাপদ যোগাযোগ কভারেজ বাড়িয়েছে বলে নৌবাহিনীর পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে। এবার সেই উপগ্রহের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করবে এমন জাহাজভিত্তিক টার্মিনাল তৈরির দিকে নজর দিয়েছে নৌবাহিনী।
আরও পড়ুন: ভারতের ১১ টাকা ইউনিট বিদ্যুতে না তারেকের! চিনের ২৫ টাকা ইউনিটের বিদ্যুতেই ভরসা বাংলাদেশের
এক নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে যুদ্ধজাহাজ ও বিমান
নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা নৌবাহিনীর নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধক্ষমতাকে আরও উন্নত করতে পারে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হল বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানকে একটি অভিন্ন নেটওয়ার্কের মধ্যে যুক্ত করা। এর ফলে বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট একই সময়ে শত্রুর অবস্থান, নিজেদের বাহিনীর অবস্থান এবং সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে প্রায় রিয়েল-টাইম তথ্য দেখতে পারবে।
অর্থাৎ কোনও একটি যুদ্ধজাহাজ বা বিমান যদি শত্রুর কোনও লক্ষ্য শনাক্ত করে, সেই তথ্য শুধু সেই প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দ্রুত অন্য ইউনিটগুলির কাছেও পৌঁছে যাবে। ফলে যে ইউনিট লক্ষ্যটি শনাক্ত করেছে, তার পরিবর্তে অন্য কোনও ইউনিটও প্রয়োজন অনুযায়ী সেই লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারবে।
২০১৪ সালেই হয়েছিল প্রথম বড় প্রদর্শন
ভারতীয় নৌবাহিনী ২০১৪ সালে ট্রোপেক্স মহড়ার সময় এই ধরনের নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধক্ষমতার বড় প্রদর্শন করেছিল। সেই সময় প্রায় ৬০টি যুদ্ধজাহাজ এবং ৭৫টি বিমান জিএসএটি-৭ রুক্মিণী উপগ্রহের মাধ্যমে একটি অভিন্ন নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছিল। এর ফলে দূরে ছড়িয়ে থাকা নৌবহরের মধ্যে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সমন্বয় বাড়ানো সম্ভব হয়েছিল। এই ব্যবস্থার অন্যতম বড় সুবিধা ছিল, একটি যুদ্ধজাহাজ সেন্সর হিসেবে কোনও লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারে এবং অন্য একটি প্ল্যাটফর্ম সেই তথ্য ব্যবহার করে আক্রমণ চালাতে পারে।
আরও পড়ুন: আগামী ১০ বছরে দেশে তৈরী হবে ১০০ বিমানবন্দর! ঘোষণা বিমান পরিবহন মন্ত্রীর
কঠিন সমুদ্র পরিস্থিতির জন্য তৈরি হবে নতুন ব্যবস্থা
নৌবাহিনীর বর্তমান রুক্মিণী টার্মিনাল ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন প্রজন্মের টার্মিনালগুলিতে যান্ত্রিক অংশের ব্যবহার যতটা সম্ভব কমানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে। সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজকে ক্রমাগত দুলুনি, ওঠানামা এবং বিভিন্ন দিকে ঘোরার মতো পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হয়। তার সঙ্গে রয়েছে লবণাক্ত বাতাস, প্রবল হাওয়া এবং কম্পন। এই কঠিন পরিবেশেও স্যাটেলাইটের সঙ্গে স্থিতিশীল যোগাযোগ বজায় রাখাই নতুন টার্মিনাল তৈরির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। যান্ত্রিক অংশ কমানোর ফলে নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনও কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথমে তৈরি হবে তিনটি প্রোটোটাইপ
প্রকল্পের শুরুতে তিন ধরনের প্রোটোটাইপ তৈরি করা হবে।
- বড় সি-ব্যান্ড টার্মিনাল
- বড় কু-ব্যান্ড টার্মিনাল
- ছোট কু-ব্যান্ড টার্মিনাল
প্রোটোটাইপের পরীক্ষা সফল হলে পরবর্তী পর্যায়ে প্রায় ৩০টি টার্মিনাল সিরিজ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি মেক-২ প্রকল্প হওয়ায় নির্বাচিত সংস্থাগুলিকেই উন্নয়নের সম্পূর্ণ খরচ বহন করতে হবে। একই সঙ্গে হার্ডওয়্যার এবং এমবেডেড সফটওয়্যার মিলিয়ে অন্তত ৫০ শতাংশ দেশীয় উপাদান রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
সমুদ্রের মতো পরিস্থিতিতে হবে কঠোর পরীক্ষা
নতুন টার্মিনালের পরীক্ষার প্রক্রিয়াও বেশ কঠোর হবে। তিন অক্ষের মোশন টেবিল পরীক্ষার মাধ্যমে সমুদ্রে জাহাজের প্রকৃত নড়াচড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে টার্মিনাল ক্রমাগত দুলতে থাকা যুদ্ধজাহাজেও উপগ্রহের সঙ্গে স্থিতিশীল যোগাযোগ ধরে রাখতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করা হবে। এছাড়াও আহমেদাবাদের স্পেস অ্যাপ্লিকেশনস সেন্টারে মূল্যায়ন করতে হবে। নৌবাহিনীর নেটওয়ার্কে যুক্ত করার আগে বাধ্যতামূলক ভালনারেবিলিটি অ্যাসেসমেন্ট ক্লিয়ারেন্স-ও প্রয়োজন হবে।
এমএসএমই ও স্টার্টআপের জন্য সুযোগ
এই প্রকল্পটি আপাতত ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প সংস্থাগুলির জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। স্টার্টআপ এবং সর্বোচ্চ পাঁচটি সংস্থার কনসোর্টিয়ামও এতে অংশ নিতে পারবে। আগ্রহী সংস্থাগুলি ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকল্প সংক্রান্ত প্রশ্ন জমা দিতে পারবে। আগ্রহপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৪ অক্টোবর। এর পর কার্যকর প্রোটোটাইপ তৈরি করার জন্য সংস্থাগুলিকে ১০৪ সপ্তাহের সময়সীমা দেওয়া হবে।
দেশীয় সংস্থার তৈরি এই নতুন স্যাটকম টার্মিনাল সফলভাবে নৌবাহিনীর নেটওয়ার্কে যুক্ত হলে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজগুলির দীর্ঘ দূরত্বের নিরাপদ যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে জিএসএটি-৭আর-এর ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নৌবাহিনীর নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধব্যবস্থাকেও আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।