সোশ্যাল মিডিয়ার মায়াজাল, মনস্তাত্ত্বিক বন্দী দশা ও আধুনিক সামাজিক বাস্তবতায় কণিষ্ক ভট্টাচার্যের ছোটগল্প ‘কোমরিয়া গোলে গোলে ঘুমে’
কোমরিয়া গোলে গোলে ঘুমে – কণিষ্ক ভট্টাচার্য
আদি
কালো মেয়ের বিয়ে হয়… অপুত্রের পুত্র হয়… সতীনকাঁটা দূর হয়… পুরুষমানুষ বশ হয়… সংসার সুখের হয়। আপনিও মিলিয়ে দেখে নিন আপনার শরীরে এই চিহ্নগুলো আছে কিনা! পলি থামে, শরীরের আনাচেকানাচে ওর চোখ চলতে থাকে। কিশোরীকালের শরীর জানার থেকে দর্পণের সব প্রতিবিম্বিত অনুপুঙ্খ স্মৃতির পাতা পালটাতে থাকে। ঠোঁটের তিল… প্রেমিকের স্পর্শ… বিবাহসাজে ভিজে চোখ… সুকুমারের ঠোঁটের দাগ… উজানের জন্মের আগের স্ফীতোদর… শরীরের চিহ্নগুলো পঁয়তিরিশে এসে পলির মাথায় ঝাড়ুর আগার শুকনো ধুলোর মতো ওড়ে। ছবি পালটায়… আলো পালটায়… শব্দ পালটায় পলির হাতে।
হাই ফ্রেনস… আমি আজকে আবার চলে এসেছি তোমাদের জন্য পাপিয়াজ কালেকশনের নতুন নতুন আইটেম নিয়ে… এই যে যে পিঙ্ক কুর্তাটা এটা আজকের জন্য পেয়ে যাচ্ছ সিক্স ফিফটিতে… অনলি সিক্স ফিফটি… চিকেনকারির কাজ… অজ্জিনাল লখনোর চিকেনকারি…। চিকেনের এই আইটেমটা বানিয়ে দেখবেন… একদম হোটেলের মতো হবে… বাড়ির ছোটোরা তো চেটেপুটে খাবেই, কর্তাও দেখবেন খুশি হয়ে গেছে… তাহলে আসুন জেনে নিই কী কী লাগবে…। চারটে লবঙ্গ একটা তেজপাতায় গেঁথে একটা কাগজে মন্ত্রটা লিখে আপনি যদি একসাথে রুমালে গিঁট মেরে শনিমঙ্গলবারে বাড়ির উত্তর পূর্ব কোণে রেখে দেন তাহলে শনিদেব তুষ্ট হন… শনিদেব তুষ্ট হলে জ্ঞাতিশত্রুরা যতই চেষ্টা করুক আপনার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না…। আলো বদলায়… দৃশ্য বদলায়… ধ্বনি বদলায়…
আলো যে কখন বদলায় টের পায় না পলি। জ্যোতিষ্কলোকের অনন্ত আলো একটু একটু করে পার হয় পথ, আর তার আবছা ক্ষীণ আভা সারাদিনমানে দুবার সাড়া দিয়ে যায় অন্ধগলির ছায়ামাখা জানলায়— তাতে ঘর আলো হয় না বরং ঘরের অন্ধকারকে যেন আরও ঘন করে তোলে লোহার ফ্রেমে বসানো সাবুদানা কাচের সাদাভাব। বদ্ধঘরের দেয়ালের ক্ষীণপ্রাণ এলইডি বাতির কাছে দিনমানেও ম্লানতর হয়ে থাকে জ্বলন্ত নক্ষত্র। টালি-দরমার কলোনির অতীত জীবনযুদ্ধকে মাটিচাপা দিয়ে উঠেছে খুপরি ঘুপচি ফ্ল্যাট; সেখানে সাবুদানা কাচের ওপারে কখনও যে দিনের আলো এসে অপেক্ষা করে করে অস্ত যায়, তার খবর রাখে না আর পলি। ইস্কুলে পড়া আহ্নিক আর বার্ষিক গতি রুদ্ধ অপরিসর ফ্ল্যাটে। অন্ধ। বদ্ধ। নিরালোক। গতিহীন।
বহির্জগৎ কেবল বদলাতে থাকে পলির হাতে। কোথাও না থেকেও আছে, এমন এক বাহির।
‘কোমরিয়া গোলে গোলে গোলে গোলে ঘুমে রাজাজী…’ মেয়েটার মুখটা দেখে বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে পলির। এ তো বুকি! মাথায় লাল ফিতে, হাঁটুর ওপর শাড়ি, ওপরের দুটো বোতাম খোলা আঁটো লো-কাট ব্লাউজের থেকে উঠলে উঠেছে বুকির বুক… বুকির তর্জনী ঘুরছে নাভির নিচে দেখিয়ে …গোলে গোলে ঘুমে রাজাজী। ফ্ল্যাটের জানলার মুখোমুখি বুকিদের জানলা; খোলা থাকলে ওদের ঘর দেখা যায় আর বন্ধ থাকলে কাচের ভিতর মানুষের অবয়ব। প্রথম যখন এসেছে, জানলার পাশে বারো-ক্লাসের বুকি জামা ছাড়ছিল। সুকুমার খেয়াল করেনি কিন্তু পাঁচ বছরের উজান হাঁ করে তাকিয়ে ছিল ওদিকে। পলি এসে তাড়াতাড়ি নিজের জানলা বন্ধ করে পর্দা টেনে দেয়। তারপরে গত পাঁচ বছরে আর খোলা হয়নি ওই জানলা। বুকি পালিয়ে বিয়ে করেছিল কলেজে ভর্তি হয়েই। সে নিয়ে অশান্তি। আবার তা মিটেও যায়— যেমন মেটে এই কলোনিতে। বুকি আসে মাঝে মাঝে। সেই বুকির কোমরিয়ার পিছনে প্লাস্টারহীন দেয়ালে মহালক্ষ্মী ভাণ্ডারের ক্যালেন্ডারে সোনালি ফসলের গোলার সামনে সুবর্ণ মালক্ষ্মীর হাতে সোনার গাছকৌটো। বুকির মাথার ওপর অ্যাসবেসটর শেড, তাতে লোহার পাইপে ঝোলা সিলিং ফ্যান– গোলে গোলে ঘুমে।
বুকির অন্য ভিডিওগুলো খোলে পলি। ‘আজ কি রাত মজা হুসন কা আঁখো সে লিজিয়ে…’ বুকির চেহারা একটু ভারী, জামাকাপড় দামি, ওয়্যাক্সিং করা মাখনের মতো থাইয়ের সন্ধি অবধি কাটা চেরিরঙের গাউন, চুলে স্টেপকাট। চোখে মাদকতায় স্ট্যান্ডলাইটের বৃত্ত। কমেন্ট বক্সে লেখা— ‘জিনিস তো ভালোই…’ ‘পুরোটা কবে দেখাবে…’ ‘দাদার হাতে জাদু আছে…’ আরও নোংরা নোংরা কমেন্ট করেছে লোকে। কেমন অস্থির লাগে পলির। ঘরের দেয়ালে প্লাস্টার। মালক্ষ্মীর ক্যালেন্ডারের বদলে মিলনোদ্যত নীলাভ কপোতকপোতীর ফ্রেম। ‘টিপটিপ বরষা পানি, পানিনে আগ লাগাই…’ স্নান করছে বুকি… নীল বালতি লাল মগ… শুধু একটা ভিজে অর্ধস্বচ্ছ নাইটি পরা, টিনের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কেউ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছবি তুলছে ওর। জল নামছে বুকির মাথার থেকে গলা-বুক-পেট-জঙ্ঘা-জানু বেয়ে। বুকি বলছে, ‘বন্ধুরা লাইক করলেই আমি আমার নাম্বার দেব… ডিএম প্লিজ…।’
শরীর কেমন অস্থির লাগে পলির, যেন একটা পাপবোধের অন্ধকার পাক খাচ্ছে পলির মাথায়। ওই বন্ধ জানলার নিচের বিছানায় শোয়ার আগে যেমন পাকখায় সিমবা। তেমনই একটা কালো সাপ একেবেঁকে ঘুরছে পলির মাথায়। একটা অন্ধকার পলির হাতে ধরা সাদা আলোর ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে সবুজ চোখে পলির দিকে পলকহীন স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে— চোখ সরাতে পারে না, নড়তে পারে না পলি। সেই অন্ধকারের বিরাট হাঁ-মুখের মধ্যে যেন ধীরে ধীরে…
মধ্য
বছরের এই সময়ে শোবার ঘরের জানলার সাবুদানা কাচে আলোর আভা পড়ে না আর বরং উজানের ঘরে জানলার দিকে রাস্তার ওপারের বুড়োনিমের নতুন পাতায় চকচক করে এবেলার রোদ। আশ্চর্য সব উজ্জ্বল আলো উজানের নিষ্পলক চোখে রং বদলায়… বেলা পড়ে আসে। পলি যখন শুতে আসে তখন ফোন দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছে উজান। সিলিংফ্যান ঘুরছে ঘসঘস করে। মাথার বালিশের পাশে উজানের হাত থেকে এলিয়ে পড়া ফোন একা একাই কথা বলে— ‘ঘটি বেঁকিয়ে দেব মনা জানিস! তোদের মরণ হয় না কেন! ভগবান দেখে না!…’ ফোন তুলে নেয় মলি। উজানের মিস আসবে বেলা পড়লে।
নামেই টু-বিএইচকে, শোবার ঘরে খাট আলমারি ড্রেসিং টেবিলের পরে জানলার নিচের জায়গাটুকু সিমবার বিছানার। শাড়িটা ভালো করে পরার জায়গা নেই। ওদিকে উজানের ঘরে একটা সোফা আর ছোটো টি-টেবিল ছাড়া আর কিছুর জায়গা নেই। মিস এসে ওঘরে পড়ায়। উজানের ঘর বলা হলেও উজান শোয় পলি সুকুমারের মাঝেই। কখনও সুকুমারের আবদারে ওঘরে যায় মলি। রাতে। উজান ঘুমলে। সে টানও যেন ছেড়ে গেছে পলিকে। টোটো-বড়োট্রেন-মেট্রো-অটো আবার তার বিপরীত ভিড় ঠেলে ফিরে সুকুমার মড়ার মতো ঘুমোয়।
মিসের চা করতে করতেই বুকি এলো। মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে কিন্তু দাদার বঊ ছাড়া কেউ নেই, তাই পলি। বুকিকে দেখে একটু সচেতন হয়ে যায় পলি। যেন বুকি নয়, পলিই বানিয়েছে ওসব ভিডিও। আর এখন যেন সকলে ওকে দেখছে বুকির পাশে। অথচ আজ আর পাঁচটা মেয়ের মতো সালোয়ার কামিজ ওড়নায় বুকিকে ওর ভিডিওর মতো লাগে লাগে না।
কথায় সবই উড়িয়ে দেয় বুকি…
‘শোনো বৌদি, পুরুষমানুষ হল গাধা। তুমি ওদের যা দেখাবে ওরা তাই দেখবে। বাকিটা নিজেরা ভেবে নেবে। তুমি চার আনা দিলে বাকি বারো আনা ওরা মনে মনে ভরে নেবে। সেই বারো আনা যদি তোমাকে দেয় তুমি চার আনা দেবে না কেন!’
‘এতজন তোকে ওই ভাবে দেখছে তোর খারাপ লাগে না!’
‘মাই বডি, মাই চয়েস। আমার শরীর আমি কাকে দেখাবো সেটা আমি ঠিক করব। কী করবে… এই যে এত লাখ লাখ ব্যাটাছেলে… লেখাপড়া নেই, কাজকাম নেই, মেয়ে জোটে না… তো সারাদিন ফোনে ওটা গুঁজে বসে আছে। আমাকে দেখার জন্য টাকা দিচ্ছে। দেখাবো না কেন!’
কথাটার মধ্যে কোথায় যেন একটা বড়ো রকমের ফাঁকি আছে বলে মনে হয় পলির, কিন্তু ফাঁকিটা কোথায় সেটা বুঝতে পারে না।
‘তোর বর কিছু বলে না? ও তো চাকরি করে…’
চুপ করে যায় বুকি।
‘কীরে? কী করবি এত টাকা দিয়ে?’
‘প্রথম প্রথম বলত। চাকরি কোথায়! ওদের তো ডেলি-কে-ডেলি টাকা। পার্মানেন্ট নয়।’ ম্লান হাসে বুকি। ‘টাকা সব মুখ বন্ধ করে দেয়। এখন ও-ই ক্যামেরা করে। টাকা জমলে দামি ফোন কিনে এনেছে। ঘর প্লাস্টার করালাম। যদি ধরো অনেক কামাতো তাহলেও না বলতে পারত না…’
আবার চুপ করে যায় বুকি। বুকির মধ্যে যেন একটা পুরনো হ্যাঁ-না-এর দ্বন্দ্বের ছায়া পড়ে দামি স্ট্যান্ড লাইটের আলো পেরিয়ে। সিমবা এসে একবার বুকির পায়ের কাছে গন্ধ শুঁকে যায়। বুকি ওর মাথায় হাত বোলায়।
‘ছোটবেলায় শুনতাম না, দুনিয়াটা কার বশ? দুনিয়া টাকার বশ। মানুষ শালা কুত্তার থেকেও খারাপ। তোমাকে কেউ কিছু করতে এলে সিমবা ঝাঁপিয়ে পড়বে। মানুষ শালা তোমাকে চোখ দিয়ে চাটবে। দল বেঁধে চাটবে। দল বেঁধে পয়সা দেবে তার জন্য। তোমার বরও কিছু বলবে না তাহলে। তোমার টাকা থাকলে তুমি মানুষ, নইলে কুত্তা।’
মাঝে একবার উজান উঠে এসে ফোনে কী অঙ্ক করে। সুকুমারের আসার সময় হল। পলি মনে মনে চাইছিল সুকুমার আসার আগে যেন বুকি চলে যায়।
বুকি যেন বুঝতে পারে, একটা বদমায়েশি হাসি হেসে বলে, ‘সুকুমারদা ভালো লোক। আর তুমি এখনও যা আছো…’ বলে পলির বুকের দিকে তাকিয়ে চোখ মারে।
অন্ত্য
দম বন্ধ লাগে পলির।
রাতে উজান ঘুমনোর পরে যখন সুকুমার পলিকে নিয়ে ওঘরে গেল, তখন সুকুমারের নিচে শুয়ে কিছুতেই যেন কোনও সিক্ততার অনুভব হল না পলির। সুকুমার একটু বিরক্ত হয়ে বলে, ‘কী যে হয়েছে তোমার আজকাল!’ পলির দম বন্ধ লাগে। পলির মাথায় আলোর ধোঁয়া রঙের ধোঁয়া শব্দের ধোঁয়া… পলির মাথায় অস্থির ছবির সারি… পলির মাথায় অন্ধকারের মুখব্যাদান… পলি বলতে যায়, ‘জানো একটা ভিডিও দেখে…’ সুকুমার উঠে যেতে যেতে একবার বিরক্ত মুখে তাকায় কেবল। দরজা খুলে দেয়। দরজার সামনে বুড়ো সিমবার জিভ দিয়ে লালা গড়ায়…
পলির দমবন্ধ লাগে যেন কেবল সুকুমারের শরীরের ভারে নয়, যেন আরও কোনও ভার চেপে আছে পলির বুকের ওপর। নিজের একটা ঘর চেয়েছিল পলি, তবু সারাদিন এই বদ্ধ ফ্ল্যাটে যেন দমবন্ধ হয়ে আসে ওর। ঘর আছে, সংসার আছে, স্বামী আছে, ছেলে আছে তবু যেন কী একটা নেই, যেন কিছুই নেই পলির। পলিকে যেন কেউ সংসার নামের একটা খাঁচায় বন্দী করে রেখেছে। পলি যেন সেই মিঠুদের বাড়ির সেই টিয়া পাখিটা। মিঠুকে মিঠু-মিঠু করে ডাকত। মিঠুর ঠাকুমার পাশে বসে ভাত খেত। ঠাকুমাকে ডাকত মা বলে। পলিরা খুব অবাক হত, ছেড়ে রাখা পাখিটা উড়ে যায় না কেন! তারপর একদিন জানল পাখিটার শুধু ডানার পালক ছাঁটা আছে তাই নয়, পাখিটাকে রোজ আফিমের জল খাওয়াতো মিঠুর ঠাকুমা! পলির কেন যেন আজ মনে হয় এই নিজের ঘর যেন ওর ঘরটা যেন ওর পালক-ছাঁটা ডানা… উজান সুকুমার সব আফিমের জল…
পরের দিন উজান আর সুকুমার বেরিয়ে গেলে রোজকার মতো ফোন ঘাঁটতে থাকে পলি।
একটা বৃদ্ধ অথর্ব সিংহ একা একা নিঃসঙ্গ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে মরে যাচ্ছে এক শুকনো ঘাসজমিতে… তার বীরত্বের কাহিনি বলছে পিছনের গলা। …আপনি কি জানেন, কোন কোন প্রাণী কেবল একটিই সঙ্গীর সঙ্গে জীবন কাটিয়ে দেয়। পর পর ছবি আসে পলির হাতে… বিভার, রাজহাঁস, টেকো ঈগল, ধূসর নেকড়ে, ম্যাকারনি পেঙ্গুইন… সঙ্গীর মৃত্যু হলে এরা একাই…। গিলামনস্টার, সিসিমাছি, বুমসল্যাং সাপ, স্লো লরিস, পাফার ফিস, পয়জন ফ্রগ, কোন শেল, সী র্যাপ আর মশা— পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দশটি প্রাণী হল এইগুলো…। ক্ল্যাপ্টোসাইনোফেগা ব্যাকটেরিয়া থাকে কুকুরের লালায়। যাদের বাড়িতে কুকুর আছে…। দাড়িওয়ালা সাধু বলে, বাঁ নাক দিয়ে কোনও গর্ভবতী নারী প্রত্যহ এই বটপাতার রস টানতে থাকে তাহলে তার পুত্রসন্তান…। ছেলে বউমা দেখে না! আমি বলি কি আমার সঙ্গে… একটা বাচ্চা মেয়ে নাকে রসকলি কাটা, বড়োদের ঢঙে কথা বলে… নাতিটা আবার আমাকে ছাড়া থাকতে পারে নাআআআ… আপনি যদি বাড়ির দরজায় পঞ্চমুখী হনুমানের ছবি লাগিয়ে রাখেন তাহলে আর কোনও বাধাবিঘ্ন সেই দরজা পেরিয়ে…। এখানে মা খুব জাগ্রত… কৌশিকী অমাবস্যায় যদি পুজো দেন… একটা কাটা ছাগলের গলা থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে রক্ত।
ছবির পর ছবি আসতে থাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। ছবির পর ছবি ভাঙে। ফেনা ফেনা জলের মতো ছবির রং যেন ভেঙে যায় পলির মাথার ভিতরে… ঝাড়ুর আগার ধুলোর মতো শব্দের গুঁড়ো যেন পাক খায় পলির মাথার ভিতরে। কোমরিয়া গোলে গোলে গোলে গোলে ঘুমে— একজন নাচছে নাইটি পরে। পাতলা নাইটির ভিতরে তার বুক দুলছে… পলি যেন দেখতে পায় প্লাস্টার বিহীন দেয়াল প্লাস্টার হয়ে যাচ্ছে ওই গানের সাথেসাথে… মালক্ষ্মী ভাণ্ডারের ক্যালেন্ডার বদলে যাচ্ছে ফ্রেমে বাঁধানো নীলাভ প্রণয়োদ্যত কপোতকপোতীতে। পলির ফ্ল্যাটের রাস্তার দিকের দেয়ালে একটা দরজা আঁকা হয়, সেই দরজা খুলে দিলে একটা ব্যালকনি বেরিয়ে আসে। ব্যালকনিতে বেলিফুলের গাছ ছেয়ে আছে ফুলে। ঘর ভরে যায় গন্ধে। খুলে যায় বুকিদের দিকের জানলা। জানলায় বুকির মা আর বৌদি দাঁড়িয়ে। ওদের জানলার গ্রিল যেন মিঠুদের বারান্দায় ঝোলানো খাঁচার শিক। ওই প্রবীণা আর যুবতী দুজনের গায়েই যেন সবুজ পালক চকচক করে… দুজনের মুখেই লাল শক্ত ঠোঁট… দুজনে মিলে টিয়াপাখির গলায় দুলে দুলে বলছে, ‘কালো মেয়ের বিয়ে হয়… অপুত্রের পুত্র হয়… সতীনকাঁটা দূর হয়… পুরুষমানুষ বশ হয়… সংসার সুখের হয়…’ ‘কালো মেয়ের বিয়ে হয়…’ বারবার, সুর করে, দুলে দুলে, একই কথা বলে যায়। কান যেন ঝালাপালা করছে পলির। ব্যালকনির খোলা দরজা দিয়ে একটা ধুলোর ঘূর্ণি ঢুকে আসে ঘরে, ঘরের মেঝেতে একটা ধুলোর স্তম্ভ, সেখানে ধুলোর সঙ্গে পাক খাচ্ছে শুকনো বেলিফুল, পাক খেয়ে উঠছে সিলিং ফ্যান অবধি। ধুলোর স্তম্ভ থেকে ছড়িয়ে পড়ে মন্ত্র-লেখা কাগজে-মোড়া তেজপাতায় গাঁথা লবঙ্গ। খোলা জানলা দেখে বুড়ো সিমবা যতবার সামনের পা দুটো তুলে দিতে চায় জানলায়, ততবার পিছলে যায় সিমবার পা। নখের আঁচড় পরে জানলার নিচের দেয়ালে। বুকির মা আর বৌদি বলে যাচ্ছে, ‘আপনিও মিলিয়ে দেখে নিন… আপনিও মিলিয়ে দেখে নিন… আপনিও মিলিয়ে দেখে নিন…’
পলি নিজের শরীরের আনাচেকানাচে দেখতে চায়। মিলিয়ে নিতে চায় জীবনের চিহ্ন। ঠোঁটের তিল… প্রেমিকের স্পর্শ… বিবাহসাজে ভিজে চোখ… সুকুমারের ঠোঁটের দাগ… উজানের জন্মের আগের স্ফীতোদর… শরীরের চিহ্নগুলো। সিমবা এবার লাফ দিয়ে উঠতে যায় জানলার দিকে। টিয়াপাখিদের দিকে তাকিয়ে সিমবা চিৎকার করে, ‘ঘটি বেঁকিয়ে দেব মনা জানিস! তোদের মরণ হয় না কেন! মর মর! ভগবান দেখে না!…’ পা পিছলে যায় সিমবার। বুকি বলছে, ‘তোমাকে কেউ কিছু করতে এলে সিমবা ঝাঁপিয়ে পড়বে।’ খোলা জানলা থেকে পা পিছলে পড়ে বৃদ্ধ অথর্ব সিমবা একা নিঃসঙ্গ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বমি করে মরে যাচ্ছে ওর জানলার নিচে ওর নিজের বিছানায়… আর সিমবার বীরত্বের কাহিনি বলছে উজানের গলা। বুকি হাসছে, ‘সুকুমারদা ভালো লোক…’ জোড়া টিয়া বলছে, ‘আপনার শরীরে এই চিহ্নগুলো আছে কিনা… আছে কিনা… আছে কিনা…’ পলি আঁতিপাঁতি করে খোঁজে শরীরে চিহ্নগুলো। পলি নাইটি খুলে ছুঁড়ে দেয় বিছানায়… বুকি চোখ মারছে পলির বুকের দিকে তাকিয়ে, ‘তুমি এখনও যা আছো…’
জগত যেন পুনর্নির্মিত হচ্ছে আবার। আলোয় আলোকময় ঈশ্বরের বাগান উন্মুক্ত পলির হাতে। জ্ঞানবৃক্ষের গাছ উঠেছে পলির মাথা ছাড়িয়ে। পলির আঙুলই ঈশ্বর। পলি চাইলে অন্ধকার। পলি চাইলে আলো। পলির হাতে আদিপাপের সর্পিল গতি। লাল টুকটুকে মোমপালিশ করা ফল দুটি ঘিরে পাক খায় পলির আঙুল। পলি ক্যামেরার ভিডিও অন করে…
কোমরিয়া গোলে গোলে গোলে গোলে ঘুমে…