ইরান যুদ্ধে অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ, চিন-রাশিয়াকে সামলাতে দুই-মুখী প্রতিরক্ষা সংকটে আমেরিকা
ওয়াশিংটন: ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধ (Iran War) পশ্চিম এশিয়া সীমানা পেরিয়ে ওয়াশিংটনের জন্য আরও বড় সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ইরানের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করায় আমেরিকার অস্ত্রভাণ্ডারে চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে চিন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমেরিকার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
আমেরিকার সামরিক পরিকল্পনাকারীরা ক্রমশ আশঙ্কা করছেন, পশ্চিম এশিয়াে ব্যবহৃত অথবা সেখানে সরিয়ে নেওয়া অস্ত্রের কারণে বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ফাঁক তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ঘাটতিগুলির মধ্যে রয়েছে ইউরোপে পিএসি-৩ প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স ইন্টারসেপ্টর এবং এটিএসিএমএস সারফেস-টু-সারফেস মিসাইল। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই অস্ত্রগুলির মজুত “ক্রিটিক্যাল”-এরও নিচে নেমে গিয়েছে।
এছাড়াও প্রিসিশন-স্ট্রাইক মিসাইল, গাইডেড রকেট এবং থাড ইন্টারসেপ্টর-এর মতো অস্ত্র ইউরোপ থেকে সরিয়ে পশ্চিম এশিয়াে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে আমেরিকার ইউরোপীয় কমান্ডকে নিজেদের সামরিক পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হচ্ছে।
পশ্চিম এশিয়াে বিপুল অস্ত্র খরচ আমেরিকার
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আমেরিকা প্রায় ১,৭০০ প্যাট্রিয়ট এয়ার ডিফেন্স ইন্টারসেপ্টর এবং ২০০-র বেশি থাড অ্যান্টি-মিসাইল ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে। এছাড়াও মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে আরও প্রায় ১৫০টি স্ট্যান্ডার্ড মিসাইল ইন্টারসেপ্টর ছুড়েছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধ চলাকালীন ইরান ১,৫০০-র বেশি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং প্রায় ৬,০০০ বড় ড্রোন ব্যবহার করেছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু ব্যবহৃত অস্ত্রের মজুতই কমেনি, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রভাণ্ডার নিয়েও আমেরিকার সামনে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগর থেকেও সরানো হয়েছে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
ঘাটতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইরানের হামলা থেকে মার্কিন সেনা এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে সুরক্ষিত রাখতে আমেরিকা ইউরোপ ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকেও আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট পশ্চিম এশিয়াে সরিয়ে নিয়েছে। এই মোতায়েনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্য কোনও অঞ্চলে হঠাৎ সামরিক সংকট তৈরি হলে সেখানে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষেত্রে পেন্টাগনের উপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
চিনের বিরুদ্ধে তাইওয়ান নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় কৌশলগত প্রভাব পড়তে পারে তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার কারণে আমেরিকার প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা এখন আশঙ্কা করছেন, অদূর ভবিষ্যতে চিন তাইওয়ানে হামলা চালালে ওয়াশিংটন নিজেদের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ণ মাত্রায় তাইওয়ানকে রক্ষা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তাইওয়ানকে ঘিরে চিন ও আমেরিকার সম্ভাব্য সংঘাত ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘপাল্লার মিসাইল এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের পর্যাপ্ত মজুত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যুদ্ধে এই অস্ত্রগুলির ব্যাপক ব্যবহার তাই আমেরিকার ভবিষ্যৎ ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহেও সমস্যা
ইরান যুদ্ধের প্রভাব ইউক্রেনের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। রাশিয়ার লাগাতার মিসাইল হামলার কারণে পশ্চিমা দেশগুলির আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের মজুত ইতিমধ্যেই চাপের মুখে। ফলে ইউক্রেনকে অতিরিক্ত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে আমেরিকার কাছ থেকে অস্ত্র কেনা মিত্র দেশগুলিও নিজেদের অর্ডার করা গোলাবারুদ পেতে দেরির মুখে পড়ছে। এর ফলে শুধু আমেরিকার অস্ত্রভাণ্ডার নয়, গোটা পশ্চিমা প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
অস্ত্রের মজুত ফের পূরণ করতে সময় লাগবে
আরও বড় সমস্যা হল, অত্যাধুনিক অস্ত্র ব্যবহার করার পর দ্রুত সেগুলির জায়গা পূরণ করা সহজ নয়। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জার্মানি থেকে সরানো অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফের আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে বছরের পর বছর সময় লাগতে পারে। এর অর্থ হল, ইরান যুদ্ধ শেষ হলেও তার সামরিক প্রভাব দীর্ঘদিন আমেরিকার প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিতে থেকে যেতে পারে।
চিন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে একসঙ্গে প্রস্তুতির চ্যালেঞ্জ
আমেরিকার জন্য পরিস্থিতিটি তাই ক্রমশ জটিল হচ্ছে। একদিকে ইউরোপে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের সম্ভাবনা এবং ইউক্রেনকে সহায়তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চিনের সামরিক শক্তি এবং তাইওয়ানকে ঘিরে সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পশ্চিম এশিয়াে ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান।
ফলে একই সময়ে একাধিক সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য পর্যাপ্ত মিসাইল, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দ্রুত মোতায়েনযোগ্য সামরিক ইউনিট ধরে রাখা আমেরিকার জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান যুদ্ধ তাই শুধু পশ্চিম এশিয়াের সামরিক ভারসাম্যই বদলাচ্ছে না। এটি আমেরিকার গ্লোবাল ডিফেন্স রেডিনেস, অস্ত্র উৎপাদন ক্ষমতা এবং একই সময়ে চিন ও রাশিয়ার মতো শক্তির মোকাবিলা করার সক্ষমতার উপরও নতুন করে চাপ তৈরি করছে।
আরও পড়ুন: ৮,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি নিয়ে ভারতে Realme P4S 5G, দাম ৩৪,৯৯৯
আরও পড়ুন: মেড ইন ইন্ডিয়ায় ফের ইতিহাস! দেশের সফল মহাকাশ অভিযানে ব্যবহার হচ্ছে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ
আরও পড়ুন: DRDO র বড় সিদ্ধান্ত! এবার দেশেই তৈরী হতে চলেছে টর্পেডো সাবমেরিন