মিশরীয় সিগারেট
মূল গল্প: অ্যান ইজিপশিয়ান সিগারেট | লেখক: কেট শপ্যাঁ | ভাষান্তর: হিন্দোল ভট্টাচার্য
আমার এক বন্ধু— পেশায় স্থপতি, আর নেশায় ভ্রমণপিপাসু—একদিন প্রাচ্যদেশ সফরে সংগ্রহ করা নানা রকম কৌতূহলোদ্দীপক বস্তু আমাদের দেখাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি ছোট বাক্স হাতে তুলে নিয়ে তিনি বললেন— এটা তোমার জন্য। তুমি তো সিগারেট খাও। বাড়ি নিয়ে যেও। কায়রোতে এক ধরনের ফকির আমাকে এটা দিয়েছিল। তার বিশ্বাস হয়েছিল, আমি নাকি তার একটা উপকার করেছি।
বাক্সটি চকচকে হলুদ কাগজে এমন নিপুণ ভাবে মোড়া ছিল যে, প্রথম দর্শনে মনে হচ্ছিল, যেন গোটা বাক্সটাই একখণ্ড কাগজ দিয়ে গড়া। কোথাও সামান্যতম জোড়ের দাগ নেই, ভাঁজের রেখা নেই, আঠার কোনও চিহ্নও চোখে পড়ে না। কাগজটির উপর আলো পড়তেই এক ধরনের মসৃণ, রেশমি দীপ্তি ফুটে উঠছিল, যেন বহু দিনের যত্নে সংরক্ষিত কোনও মূল্যবান বস্তু। তার গায়ে কোনও লেবেল নেই, ডাকটিকিট নেই, প্রেরকের নাম নেই, এমনকী ভেতরে কী রয়েছে, তার সামান্যতম ইঙ্গিতও নেই।
এই নীরবতা যেন ইচ্ছাকৃত— বাক্সটি নিজের পরিচয় গোপন করে কৌতূহলকে আরও উসকে দিতে চাইছে। মনে হচ্ছিল, এটি কেবল একটি প্যাকেট নয়, অজানা কোনও রহস্যের দরজা, যার আবরণ যত সরল, তার অন্তরাল ততই দুর্বোধ্য। অকারণেই সেটিকে হাতে নিয়ে বারবার উল্টেপাল্টে দেখতে ইচ্ছে করছিল। মনে হচ্ছিল, চোখে যা ধরা পড়ছে না, হয়তো আঙুলের স্পর্শে তার কোনও গোপন সঙ্কেত ধরা পড়বে।
আমি বাক্সটি হাতে নিয়ে এ-দিক ও-দিক ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে তাকে বললাম, তুমি জানলে কী করে যে, এর মধ্যে সিগারেট আছে?
সিল করা চিঠি খোলার আগে যেমন মানুষ সেটিকে উল্টেপাল্টে দেখে আর ভেতরে কী থাকতে পারে, তা কল্পনা করে, আমিও ঠিক তেমন ভাবেই বাক্সটি পরীক্ষা করছিলাম।
স্থপতি হেসে বললেন, আমি শুধু জানি, লোকটা আমাকে তা-ই বলেছিল। তবে সে সত্যি বলেছে কি না, তা যাচাই করা তো খুবই সহজ।
তিনি আমাকে একটি ধারালো কাগজ কাটার ছুরি দিলেন। আমি যতটা সম্ভব সাবধানে বাক্সটির ঢাকনা খুললাম।
ভেতরে ছ’টি হাতে বানানো সিগারেট। হালকা হলুদ কাগজে মোড়া, আর তামাকও প্রায় সেই একই রঙের। সাধারণ তুর্কি কিংবা মিশরীয় তামাকের তুলনায় অনেকটাই সূক্ষ্ম ভাবে কুচোনো, আর দুই প্রান্ত থেকেই খানিক সূক্ষ্ম আঁশ বেরিয়ে আছে।
স্থপতি দেশলাই জ্বালাতে জ্বালাতে বললেন, এখনই একটা চেষ্টা করে দেখবেন, ম্যাডাম?
আমি বললাম, এখন নয়, এখানেও নয়। কফি খাওয়ার পর, যদি অনুমতি দেন, আপনার ধূমপানের ঘরে গিয়ে খাব। এখানে উপস্থিত কয়েকজন ভদ্রমহিলা সিগারেটের গন্ধ একেবারেই সহ্য করতে পারেন না।
ধূমপানের ঘরটি ছিল একটি ছোট বাঁকানো করিডরের শেষে। ঘরের সমস্ত সাজসজ্জাই ছিল প্রাচ্য রীতির। একটি প্রশস্ত, নিচু জানালা খুলে গেছে, এমন এক বারান্দায়, যা বাগানের উপর ঝুলে আছে। আমি যে ডিভানে আধশোয়া ছিলাম, সেখান থেকে শুধু গাছের দুলতে থাকা শীর্ষ ভাগ দেখা যাচ্ছিল। বিকেলের রোদে মেপল পাতাগুলো ঝিকমিক করছিল। ডিভানের পাশে একটি নিচু টেবিলে ধূমপায়ীর প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম সুন্দর করে সাজানো ছিল। আমি বেশ আরামেই ছিলাম এবং মনে মনে নিজেকেই অভিনন্দন জানালাম— অন্তত কিছু ক্ষণের জন্য সেই অবিরাম বকবক করা মহিলাদের আড্ডা থেকে মুক্তি পেয়েছি, যাদের কণ্ঠস্বর এখন কেবল দূরাগত অস্পষ্ট গুঞ্জনের মতো আমার কানে আসছে।
আমি একটি সিগারেট বার করে ধরালাম। বাক্সটি টেবিলের উপর রেখে দিতেই পাশে রাখা ছোট্ট ঘড়িটি রূপালি ধ্বনিতে পাঁচটা বাজার ঘোষণা করল।
মিশরীয় সিগারেটটির প্রথম দীর্ঘ টান নিলাম। ধূসর-সবুজ ধোঁয়া একটি ছোট্ট তুলোর মতো স্তম্ভ হয়ে উপরে উঠল, তার পর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে যেন পুরো ঘর ভরে দিল। মেপল পাতাগুলোকে কেমন ঝাপসা লাগছিল— যেন চাঁদের আবছা আলোয় ঢাকা পড়েছে। শরীরের ভেতর দিয়ে এক অদ্ভুত, অস্থির করা স্রোত বয়ে গেল। মাথায় উঠল যেন কোনও তীব্র মদের নেশা। আমি আরও একবার গভীর করে ধোঁয়া টেনে নিলাম।
আহ্! বালির উত্তাপে আমার গাল ঝলসে যাচ্ছে! সারাটা দিন আমি এই বালির ওপর মুখ গুঁজে পড়ে আছি। আজ রাতে, যখন অনন্ত আকাশে তারারা জ্বলে উঠবে, তখন নিজেকে টেনে-হিঁচড়ে নদীর ধারে পৌঁছে দেব। সে আর কখনও ফিরে আসবে না। এত দূর পর্যন্ত আমি তার পিছু নিয়েছি— কখনও দৌড়ে, কখনও হোঁচট খেতে খেতে, কখনও হাত-পায়ের ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে, কখনও দু’হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসে। তার পর এখানেই এই বালির ওপর লুটিয়ে পড়েছি। বালির উত্তাপে আমার গাল ঝলসে যাচ্ছে, সারা শরীর দগ্ধ হয়ে উঠেছে। সূর্য তার অগ্নিদীপ্ত যন্ত্রণায় আমাকে পিষে মারছে। ওই তালগাছগুলোর ঝোপের নীচে ছায়া আছে। কিন্তু আমি এখানেই পড়ে থাকব, এই বালির ওপর, যত ক্ষণ না রাত নেমে আসে। ওরাকলের ভবিষ্যদ্বাণীকে আমি উপহাস করেছিলাম, নক্ষত্রদের কথাকে বিদ্রুপ করেছিলাম, যখন তারা বলেছিল, জীবনের উন্মত্ত আনন্দের পর একদিন আমি নিজেই মৃত্যুকে আহ্বান জানিয়ে দু’হাত বাড়িয়ে দেব, আর নদীর জল আমাকে আপন বুকে টেনে নেবে। আহ্, কী দগ্ধ করছে এই বালি! অথচ আগুন নেভানোর মতো একফোঁটা অশ্রুও আমার নেই। নদীর জল শীতল, আর রাতও খুব দূরে নয়।
আমি দেবতাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলেছিলাম, একজনই আমার দেবতা— বার্জা। সে দিন আমি নিজেকে লিলি ফুলে সাজিয়েছিলাম। ফুলের মালা গেঁথে তাকে পরিয়েছিলাম, প্রেমের কোমল অথচ মধুর বন্ধনে তাকে বেঁধে রাখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে আর কখনও ফিরে আসবে না। উটের পিঠে চড়ে চলে যাওয়ার সময়ে একবার ফিরে তাকিয়েছিল। আমি তখন এই ভাবে কুঁকড়ে বসে ছিলাম। সে হেসেছিল, তার নিষ্ঠুর ঝকঝকে সাদা দাঁত দেখিয়ে। যখনই সে আমাকে চুম্বন করে চলে যেত, আবার ফিরে আসত। যখনই প্রবল রাগে তীক্ষ্ণ কথায় আমাকে বিদ্ধ করে চলে যেত, তখনও ফিরে আসত। কিন্তু আজ সে আমাকে চুম্বনও করেনি, রাগও করেনি। শুধু বলেছিল— আমি ক্লান্ত। এই বন্ধন, এই চুম্বন, এমনকী তোমাকেও আর সহ্য করতে পারছি না। আমি চলে যাচ্ছি। তুমি আর কোনও দিন আমাকে দেখতে পাবে না। আমি সেই বিরাট নগরে যাচ্ছি, যেখানে মানুষ মৌমাছির ঝাঁকের মতো ভিড় করে। আমি তারও পরে যাব, যেখানে আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সেই দৈত্যাকার পাথরগুলো— অনাগত যুগের স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে। আমি ক্লান্ত। তুমি আর আমাকে দেখতে পাবে না।
তার পর সে উটে চড়ে চলে গেল। যাওয়ার সময়ে একবার ফিরে তাকিয়ে হাসল, সেই নিষ্ঠুর সাদা দাঁতগুলো ঝলসে উঠল। কী ধীরে সময় কাটছে! মনে হচ্ছে, দিনের পর দিন আমি এই বালির ওপর পড়ে আছি, হতাশাকেই খাদ্য করে বেঁচে আছি। হতাশার স্বাদ তিক্ত, কিন্তু সেই তিক্ততাই সঙ্কল্পকে আরও দৃঢ় করে তোলে। মাথার ওপর দিয়ে একটা পাখি নিচু হয়ে চক্কর কাটছে, তার ডানার শব্দ শুনতে পাচ্ছি। সূর্য অস্ত গেছে।
বালি আমার ঠোঁটের ফাঁকে, দাঁতের মধ্যে, শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া জিভের তলায় ঢুকে পড়েছে। যদি একবার মাথাটা তুলতে পারতাম, হয়তো সন্ধ্যাতারাটাকে দেখতে পেতাম। আহ্, হাত-পায়ে কী অসহ্য যন্ত্রণা! মনে হচ্ছে শরীরের প্রতিটি অস্থি ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। আজ সকালের মতো কেন আর দৌড়ে যেতে পারছি না? কেন আমাকে আহত সাপের মতো মোচড়াতে মোচড়াতে শরীরটাকে টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে? নদী খুব কাছে। আমি তার শব্দ শুনতে পাচ্ছি, তাকে দেখতে পাচ্ছি।
আহ্, এই বালি! আহ্, ওই ঝলমলে জল! কী শীতল! কী ঠান্ডা! জল! জল! আমার চোখে, আমার কানে, আমার গলায়! সে যেন আমাকে শ্বাসরোধ করে মারছে। বাঁচাও! দেবতারা কি আমাকে আর সাহায্য করবেন না? আহ্! কী মধুর এই বিশ্রামের উল্লাস! মন্দিরে সঙ্গীত বাজছে। এখানে ফল রয়েছে, তার স্বাদ নেওয়ার জন্য।
বার্জা সেই সঙ্গীতের সঙ্গে এসেছে। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে, বাতাস কোমল। ফুলের মালা… চলো, বার্জা, রাজার বাগানে যাই। সেখানে নীল শাপলাটা দেখে আসি।
হঠাৎ আবার মেপল পাতাগুলোকে দেখতে পেলাম। সেগুলো যেন রূপালি আলোয় মোড়া। ধূসর-সবুজ ধোঁয়াও আর ঘর ভরিয়ে নেই। চোখের পাতা তুলতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, শত শত বছরের ভার আমার আত্মাকে চেপে ধরেছে। সে মুক্ত হতে চাইছে, শ্বাস নিতে চাইছে, অথচ পারছে না।
আমি মানুষের হতাশার অতল গভীরতার স্বাদ পেয়েছি। পাশের ছোট্ট ঘড়িটিতে তখন পাঁচটা পনেরো। হলুদ বাক্সের মধ্যে বাকি সিগারেটগুলো এখনও অক্ষত অবস্থায় পড়ে আছে। শুধু যে একটি আমি খেয়েছি, তার অবশিষ্টাংশ অ্যাশট্রেতে পড়ে রয়েছে।
হালকা হলুদ কাগজে মোড়া সিগারেটগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার মনে হলো, এদের ভেতরে আর কত অদ্ভুত দর্শন লুকিয়ে আছে! এই রহস্যময় ধোঁয়ার মধ্যে আর কী কী দেখা যেতে পারে? হয়তো স্বর্গীয় শান্তির কোনও দৃশ্য, হয়তো সমস্ত আশা পূরণের কোনও স্বপ্ন, হয়তো এমন এক পরমানন্দের স্বাদ, যার অস্তিত্ব কল্পনা করার শক্তিও এত দিন আমার ছিল না।
আমি সিগারেটগুলো হাতে তুলে নিয়ে মুঠোর মধ্যে চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেললাম। তার পর জানালার কাছে গিয়ে দুই হাত মেলে ধরলাম। হালকা বাতাস সেই সোনালি তামাককুচিগুলোকে তুলে নিয়ে পাক খাওয়াতে খাওয়াতে বহু দূরে মেপল পাতার ভিড়ে ছড়িয়ে দিলো।
ঠিক তখনই আমার বন্ধু, স্থপতি, পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে আমার জন্য দ্বিতীয় কাপ কফি।
আমাকে দেখে তিনি উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন, আপনাকে এত ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে না কি?
আমি মৃদু হেসে উত্তর দিলাম, একটা স্বপ্নের কারণে আমি একটু বেশিই ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।