মৃত্যু মিছিল কি এড়ানো যেত? নেপালের মহাপ্রলয়ের ৫ মাস আগেই মিলেছিল সতর্কবার্তা!
কাঠমাণ্ডু: চোখের সামনে ধুয়েমুছে গিয়েছে আস্ত জনপদ। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হড়পা বানের (Flash Flood) জেরে মৃত্যুসংখ্যা ইতিমধ্যেই ৪৬৯ ছুঁয়েছে। নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু এই মহাপ্রলয়…
কাঠমাণ্ডু: চোখের সামনে ধুয়েমুছে গিয়েছে আস্ত জনপদ। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হড়পা বানের (Flash Flood) জেরে মৃত্যুসংখ্যা ইতিমধ্যেই ৪৬৯ ছুঁয়েছে। নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ। কিন্তু এই মহাপ্রলয় কি একেবারেই আচমকা? নাকি প্রকৃতি আগেই অশনি সংকেত দিয়েছিল? কাঠমান্ডু ভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘ইসিমোড’ (ICIMOD)-এর রিপোর্ট বলছে, এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের সতর্কতা অন্তত পাঁচ মাস আগেই দেওয়া হয়েছিল! আর এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতেই নেপাল প্রশাসনের ভূমিকা এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল।
হিন্দু কুশ হিমালয় (HKH) অঞ্চলের দেশগুলিকে (যার মধ্যে ভারত, নেপাল, চিন ও ভুটান রয়েছে) নিয়ে কাজ করে ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ বা ICIMOD। পাঁচ মাস আগে তারা দু’টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিল, ‘চেঞ্জিং ডায়নামিক্স অফ গ্লেসিয়ার্স ইন দ্য হিন্দু কুশ হিমালয় রিজিয়ন ফ্রম ১৯৯০ টু ২০২০’ এবং ‘এইচকেএইচ গ্লেসিয়ার আউটলুক ২০২৬’।
এই দুই রিপোর্টেই অত্যন্ত কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলা হয়েছিল, হিমালয়ের উচ্চভাগে হিমবাহ গলার হার বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০০ সালের পর থেকে বরফ গলার হার কার্যত দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৭৫ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত হিমবাহের প্রায় ২৭ মিটার পুরু বরফের স্তর সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ বরফ গলার কারণে ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট’ (Glacial lake outburst) বা হিমবাহ সৃষ্ট হ্রদ বিস্ফোরণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন বিজ্ঞানীরা।
বিপদের মুখে ২০০ কোটি মানুষ
ইসিমোড-এর রিমোট সেন্সিং অ্যানালিস্ট সুদান বিকাশ মাহারজান স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে উচ্চ হিমালয়ের হিমবাহগুলি তাদের মোট আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ এবং সঞ্চিত বরফের ৯ শতাংশ হারিয়েছে। এই বিপদের মাত্রা এতটাই বেশি যে, এশিয়ার ‘ওয়াটার টাওয়ার’ নামে পরিচিত এই হিমবাহগুলির ওপর নির্ভরশীল ভাটি অঞ্চলের প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে। রিপোর্ট আরও সতর্ক করেছিল যে, সিকিম, কারাকোরাম, জান্সকার এবং ভুটানের মতো বিস্তীর্ণ অঞ্চলে হিমবাহ পর্যবেক্ষণে বড়সড় ঘাটতি রয়েছে, যা ভবিষ্যতের বিপদের ইঙ্গিত।
নেপালের বিপর্যয়ের আসল কারণ
ইসিমোডের বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে নেপালের বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করছেন। তাঁদের প্রাথমিক অনুমান, বুধবার নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে লেন্দে নদীর কাছে একটি বিশাল ‘আইস-রক অ্যাভাল্যাঞ্চ’ বা বরফ ও পাথরের ধস নামে। এর জেরে ভোতে কোশী এবং ত্রিশূলী নদীর অববাহিকায় বিপুল পরিমাণ জল, কাদা ও বড় বড় পাথর প্রবল জলোচ্ছ্বাসের আকারে আছড়ে পড়ে, যা হড়পা বানের রূপ নেয়। এই জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কাতেই রাসুয়া, ধাদিং, নুয়াকোট ও চিতওয়ানের মতো জেলাগুলি কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।
ইসিমোড জোর দিয়ে জানিয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের ‘ক্রায়োস্ফিয়ার’ (বরফাবৃত অঞ্চল) এখন এক বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ভবিষ্যতে এমন আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে আসা প্রাকৃতিক বিপর্যয় রুখতে সংশ্লিষ্ট সব দেশকে আরও উন্নত ‘আর্লি-ওয়ার্নিং সিস্টেম’ বা আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। নয়তো আগামী দিনে আরও বড় মূল্য চোকাতে হতে পারে।
চিনের জোরালো ভূমিকম্পে তিব্বতে ফাটল বাঁধ, নেপালে ফের হড়পা বানের সতর্কতা
নেপালে হড়পা বানে মৃত বেড়ে ৪৬৯, নিখোঁজ ২৯০ ভারতীয়, নয়া আতঙ্ক জলবোমা