জংলি সুন্দরী কন্যার খোঁজে বাংরিপোসি - 24 Ghanta Bangla News
Home

জংলি সুন্দরী কন্যার খোঁজে বাংরিপোসি

Spread the love

পার্থময় চট্টোপাধ্যায়

এ বারের গন্তব্য ওড়িশার বাংরিপোসি। বর্ষায় সদ্যস্নাত জঙ্গল, পাহাড় আর ঝরনার দেশ। পুজো আসতে প্রায় পঞ্চাশ দিন বাকি। আকাশে দুষ্টু-মিষ্টি বৃষ্টি ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই বৃষ্টির হাত ধরেই এক শুক্রবার সকালে বেরিয়ে পড়লাম।

শহরের ব্যস্ততা যত পিছনে পড়তে লাগল, ততই বদলে যেতে লাগল চারপাশ। ধোঁয়া কমে এল, কংক্রিটের দেওয়াল সরল, রাস্তার দুপাশে সবুজ ঘন হতে লাগল। কোথাও শালবন, কোথাও মহুয়ার গন্ধ, কোথাও ছোট্ট আদিবাসী গ্রাম। দূরে পাহাড়ের নীলচে রেখা। মনে হলো, বাংরিপোসি আমাদের কাছে আসছে না— আমরাই ধীরে ধীরে তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছি।

ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলার এই ছোট্ট শান্ত জায়গাটাকে স্থানীয় অর্থে বলা হয়—‘পাহাড়ের সুন্দরী কন্যা’। নামটা শুনেই মনে হয়েছিল, এ বুঝি শুধু পর্যটনের দেওয়া কোনও কাব্যিক নাম। কিন্তু সেখানে পৌঁছে বুঝলাম, নামটা মোটেই বাড়াবাড়ি নয়।

বাংরিপোসি সত্যিই যেন পাহাড়ের কোলে বসে থাকা এক জংলি সুন্দরী কন্যা। তার কোনও সাজগোজ নেই, শহুরে আড়ম্বর নেই। নেই পর্যটকদের ভিড়ে ভরা দোকানপাট, কোলাহল, আলো ঝলমলে বাজার।

আছে শুধু পাহাড়। জঙ্গল। নদী। জলাধার। আর মানুষের খুব সহজ, স্বাভাবিক জীবন।

কলকাতা থেকে সড়কপথে প্রায় ২১০–২৩০ কিলোমিটার। গাড়িতে রাস্তার অবস্থা ও যানজটের ওপর নির্ভর করে সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। কলকাতা থেকে NH16 ধরে খড়্গপুর, বেলদা, জলেশ্বর, বারিপদা হয়ে বাংরিপোসি।

ট্রেনেও যাওয়া যায়। হাওড়া থেকে চাকুলিয়া হয়ে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করা যায়। বালেশ্বর হয়েও যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে।

তবে সত্যি বলতে কী, বাংরিপোসির সৌন্দর্য ট্রেনের জানালা দিয়ে নয়— রাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে দেখতেই ভালো লাগে। কারণ পথটাই এখানে ভ্রমণের প্রথম অধ্যায়।

বাংরিপোসির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার নিস্তব্ধতা। এখানে প্রকৃতি কোনও প্রদর্শনী নয়। আপনি তাকে দেখতে যাবেন, সে আপনাকে তার মতো করে দেখাবে।

বাংরিপোসি
বাংরিপোসি

সকালে ঘুম ভেঙে বারান্দায় দাঁড়ালে সামনে সবুজ পাহাড়। বাতাসে পাখির ডাক। কোথাও দূরে মানুষের গলার আওয়াজ। আর তারও ওপরে এক অদ্ভুত শান্তি। সেই মুহূর্তে মনে হয়—শহর থেকে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্তটা মোটেই ভুল ছিল না।

থাকার জন্য রয়েছে বেশ কিছু রিসর্ট ও প্রকৃতিনির্ভর থাকার ব্যবস্থা। খৈরি রিসর্ট তার মধ্যে পরিচিত একটি নাম। স্থানীয় আরও কিছু হোটেল ও রিসর্ট রয়েছে। তবে বর্ষার মরশুমে আগে থেকে বুকিং করে যাওয়াই ভালো।

আমরা অবশ্য থাকার জায়গার বিলাসিতার চেয়ে চারপাশের প্রকৃতিকেই বেশি উপভোগ করেছি। কারণ বাংরিপোসিতে ঘরটা যত সুন্দরই হোক, জানলার বাইরে যে ঘরটা প্রকৃতি সাজিয়ে রেখেছে, তার সঙ্গে কোনও ঘরের তুলনা হয় না।

বাংরিপোসিকে শুধু একটা পাহাড়ি জায়গা ভাবলে ভুল হবে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে প্রকৃতির নানা রূপ। বালডিহা ড্যাম—পাহাড় আর সবুজের মধ্যে শান্ত জলরাশি। আকাশের মেঘ, পাহাড়ের ছায়া আর জলের আয়না একসঙ্গে মিশে গিয়ে তৈরি করে অন্যরকম দৃশ্য।

বাংরিপোসি
বাংরিপোসি

প্রায় ২৯ কিলোমিটার দূরে ব্রাহ্মণকুণ্ড। ঝরনা, জলের ধারা আর জঙ্গলের নির্জনতা তাকে আলাদা করে তোলে। এ ছাড়াও রয়েছে সুলেইপাট ড্যাম, ব্যাংকাবাল ড্যাম, অসংখ্য আদিবাসী গ্রাম এবং পাহাড়-জঙ্গলের ছোট ছোট অচেনা পথ।

আর খুব কাছেই সিমলিপাল। চাইলে বাংরিপোসির সঙ্গে সিমলিপাল মিলিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু আমরা তা করিনি। আমাদের তিন দিনের ভ্রমণে সিমলিপাল ছিল না। আমাদের চোখে তখন শুধু বাংরিপোসি।

আমরা খুঁজেছি ইশাকে, পিকুকে, আর প্রিয় ঋজুদার কলমে আঁকা সেইসব প্রকৃতির রূপ—যেগুলো এতদিন কেবল পড়েছি, কল্পনা করেছি। কখনও কখনও সাহিত্যও তো ভ্রমণের সঙ্গী হয়। কোনও জায়গায় গিয়ে আমরা শুধু জায়গাটাকে দেখি না—আমাদের পড়া কোনও গল্পের চরিত্রকে খুঁজি, কোনও কবিতার দৃশ্যকে খুঁজি, কোনও লেখকের কল্পনাকে বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখি। বাংরিপোসিতেও ঠিক সেটাই হয়েছিল।

মন অনেক কিছু দেয়। অনুভূতিতে, কল্পনায়, আবেগে। কিন্তু তার জন্য দরকার পরিবেশ। দরকার একটি বিশেষ মুহূর্ত। আর সেই মুহূর্তটা এসেছিল এক চাঁদনী রাতে। চারজন মিলে বেরিয়েছি বুধবলঙ্গ নদীর কাছে—স্থানীয় আরেক নাম বুড়িবালাম।

বর্ষার জল পেয়ে নদী তখন স্রোতস্বিনী। ছোট ছোট পাথরের গা ঘেঁষে জল ছুটে চলেছে খিলখিল করে। চারদিকে সবুজ জঙ্গলের অন্ধকার। উপরে পূর্ণিমার চাঁদ। নদীর জলে চাঁদের আলো ভেঙে ভেঙে পড়ছে। কখনও মনে হচ্ছে চাঁদটা জলের মধ্যে নেমে এসেছে, আবার স্রোতের টানে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।

বাংরিপোসি
বাংরিপোসি

চারপাশে সবুজ জঙ্গল, সামনে স্রোতস্বিনী নদী, মাথার ওপরে চাঁদ। সৌন্দর্যটা ছিল মুহূর্তটার। পরিবেশটার। আমাদের চারপাশের জঙ্গলটার। নদীর জলের। চাঁদের। তখন মনে হল—এটাই বাংরিপোসি। গাইডের বইয়ে লেখা বাংরিপোসি নয়। গুগল ম্যাপে চিহ্নিত বাংরিপোসি নয়। এটা আমার দেখা বাংরিপোসি। আমার অনুভব করা বাংরিপোসি।

আমি বাংরিপোসিতে শুধু ভ্রমণ করতে আসিনি। কয়েকটা জায়গার ছবি তুলে, কিছু সেলফি নিয়ে, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে ফিরে যাওয়ার জন্যও নয়। আমি এসেছিলাম একটু ধীরে চলতে। সকালে পাহাড় দেখতে। দুপুরে জঙ্গলের পথে হাঁটতে। বিকেলে কোনও জলাধারের ধারে চুপ করে বসে থাকতে। আর সন্ধ্যায় কোনও পাহাড়ি নদীর তীরে বসে চন্দ্রাহত হতে। শহর আমাদের খুব দ্রুত হাঁটতে শেখায়।

শহরের ব্যস্ততা থেকে কয়েকটা দিনের দূরত্বে এমন একটা জায়গা, যেখানে পাহাড় বন্ধু হয়, জঙ্গল গল্প শোনায়, নদী প্রেমিকার মতো কাছে আসে। বাংরিপোসি তেমনই এক জায়গা। পাহাড়ের কোলে, জঙ্গলের ছায়ায়, নদীর স্রোতের পাশে—নিঃশব্দে অপেক্ষা করে থাকা এক সুন্দরি জংলী কন্যা। আমরা গিয়েছিলাম তার খোঁজে।

তিনদিন পর ফিরে এলাম। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী— সেই জংলী সুন্দরী কন্যাকে বাংরিপোসির পাহাড়ে, জঙ্গলে, নদীর জলে খুঁজে পেয়েছিলাম কি না জানি না। তবে তার কিছুটা যে আমাদের মনের মধ্যে থেকে গেল— সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *