সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যু, হাতে তবু স্মার্টফোন, কী ঘটতে থাকে মনের মধ্যে? - 24 Ghanta Bangla News
Home

সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যু, হাতে তবু স্মার্টফোন, কী ঘটতে থাকে মনের মধ্যে?

Spread the love

নেপালের হড়পা বানের একাধিক ভিডিয়ো ফুটেজ সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে বুধবার অনেকেরই প্রথমে মনে হয়েছিল, AI generated। দুঃস্বপ্নসম সে সব ভিস্যুয়াল যে প্রম্পট-নির্ভর নয়, তা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি অডিয়েন্সের। স্মার্টফোন সহজেই ক্যাপচার করে ফেলতে পারে কল্পনার অতীত মুহূর্তদের। ‘প্রশান্ত_রাজ_শ্রেষ্ঠা’র প্রোফাইল থেকে শেয়ার হওয়া এই ভিডিয়োও তেমনই এক ভয়াবহ মুহূর্তের সাক্ষী। শুরুতে চারপাশ একেবারে স্বাভাবিক। রাস্তার লোকজন, গাড়ি, মোটরবাইক — চেনা ব্যস্ততার ছবি। স্মার্টফোনের ক্যামেরা সেই নর্মালকে ফ্রেমবন্দি করতে যখন ব্যস্ত, তখন এক লহমায় বদলে গিয়েছিল চারপাশের সবকিছু — যেন হলিউডের ডিজ়াস্টার মুভির মিনিয়েচার সেট, যা তছনছ করে দেওয়া স্রেফ পরিচালকের ‘অ্যাকশন’ কমান্ড-এর অপেক্ষায় থাকে। বুধবারের ভয়াবহ হড়পা বান যদিও অপেক্ষা করেনি কোনও নির্দেশের। প্রকৃতির তাণ্ডব যে এমনই…

প্রথমে অনেক দূরে ধুলোর ঝড়। বোঝা দায় কী ঘটছে… কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠল যে, আশপাশের লোকজন প্রাণের ভয়ে যে যে দিকে পারছেন, ছুটে চলেছেন। ধুলো, পাথর, মাটি আর আতঙ্ক যেন একসঙ্গে ধেয়ে আসছে। ক্যামেরাধারীও তখন সেই ভয়াবহতার মুখোমুখি। যে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায় কিছুক্ষণ আগেও সাধারণ এক দৃশ্য রেকর্ড হচ্ছিল, তা-ই মুহূর্তের মধ্যে হয়ে ওঠে মৃত্যুর সাক্ষী। নদীর যে সেতুর উপরে কিছুক্ষণ আগে দাঁড়িয়েছিলেন লোকজন, চোখের পলকে সেই সেতু ভাসিয়ে নিয়ে গেল জল-কাদার তোড়। ভেসে যেতে শুরু করল রাস্তাঘাট, দোকানপাট। তা দেখে কোনও রকমে প্রাণ হাতে দৌড়। বাঁচার মরিয়া চেষ্টা। আর ঠিক এখানেই উঠছে প্রশ্নটা। যা অনেক সোশ্যাল মিডিয়া ইউজ়ারই করা শুরু করেছেন।

এমন পরিস্থিতিতে মানুষ সাধারণত কী করে? ক্যামেরা অফ করে নিরাপদ জায়গায় ছুটে যায়। কিন্তু এই ভিডিয়ো এবং ইতিমধ্যে ভাইরাল হওয়া এ ধরনের আরও ভিডিয়োর সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিক হলো — মৃত্যুর এত সামনে এসেও টানা কয়েক সেকেন্ড ধরে ক্যামেরা চলতে থাকে। সেই কয়েক সেকেন্ডের ফুটেজ দেখলেই বোঝা যায়, বিপদ কত দ্রুত চলে আসে। নদীর জল বাড়ছে দেখেও, ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে, তাকে ক্যামেরাবন্দি করে রাখার মরিয়া চেষ্টা। সাধারণ একা রোদ ঝলমলে দিনে কী ভয়ানক ঘটনা! কোনও পূর্বাভাস নেই, প্রস্তুতির সময় নেই। শুধু এক মুহূর্তে বুঝতে পারা— আর একটু এগোলেই হয়তো সবকিছু শেষ হয়ে যেতে পারতো।

পরে যখন এই ধরনের ভিডিয়ো খুঁটিয়ে দেখা হয়, তখন তা আরও ভয় ধরায়। কারণ আমরা জানি, ক্যামেরার নেপথ্যে থাকা মানুষটি ঠিক সেই মুহূর্তে কী দেখছিলেন, তা তিনি নিজেই জানেন না। সামনে অনিশ্চয়তা — পাহাড় থেকে নেমে আসা ধস বা গড়িয়ে আসা বোল্ডার কতটা দূরে, নিরাপদে স্থানে যাওয়ার জন্য হাতে কতটা সময় আছে, তার কোনও হিসাব নেই।

এই ধরনের ভিডিয়ো তাই নিছক ‘ভাইরাল ফুটেজ’ নয়। প্রকৃতির রুদ্ররূপের সামনে মানুষের অসহায়তার দলিল। কয়েক সেকেন্ডের এক রেকর্ডিং মনে করিয়ে দেয়, বিপদ কখনও দরজায় কড়া নেড়ে আসে না। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা, গাড়ি চালানো কিংবা কোনও দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করা — সবকিছুই এক মুহূর্তে বদলে যেতে পারে।

মৃত্যুকে সামনে দেখেও কেন ভিডিয়ো করার এই প্রবণতা?

নেপথ্যের কারণ খুঁজতে এই সময় অনলাইন যোগাযোগ করেছিল ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডাঃ প্রশান্তকুমার রায়ের সঙ্গে। তিনি জানান, এই মানসিকতার নেপথ্যে রয়েছে বেশ কয়েকটি কারণ।

প্রথমত, এখন ছবি তোলা, ভিডিয়ো করাটা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। খারাপ-ভালো পরিস্থিতি যা-ই হোক, সেটা ক্যামেরাবন্দি করে রাখার স্বাভাবিক অভ্যাসই এই সাঙ্ঘাতিক মুহূর্তেও কাজ করে। তাই জীবন বাজি রেখে হলেও ওই মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করে রাখতে চান কেউ কেউ।

দ্বিতীয়ত, রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব। প্রশান্ত বলছেন, ‘আজকাল মানুষের সব পরিস্থিতিতে কন্টেন্ট তৈরি করার একটা প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষত যাঁরা এটা থেকে আয় করেন, তাঁদের মধ্যে সেই তাগিদ আরও বেশি।’

এই বিষয়ে এই সময় অনলাইনকে নিজের মত জানিয়েছেন বাইকার তথা ট্রাভেল ইনফ্লুয়েন্সার বৈদিক চট্টোপাধ্যায়ও। তিনি বলছেন, ‘আমি একজন ইনফ্লুয়েন্সার, তবে এমন পরিস্থিতিতে ভিডিয়ো করার কথা আমার মাথায় আসবে না। বরং আগে নিজের এবং সম্ভব হলে অন্যদের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করবো। তবে এখন এমন অনেক গ্যাজেটস এসে গিয়েছে, যার মাধ্যমে রেকর্ড নিজের মতো হতে থাকে। সেটা আপনি একগলা জলে বাঁচার চেষ্টা করলেও। বা দুর্গম পথে বাইক চালানোর সময়ে হেলমেটের ক্যামেরা অন থাকলেও, ওই মুহূর্তগুলো রেকর্ড হয়ে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে যে সোশ্যাল মিডিয়ার একটা প্রভাব রয়েছে, সেটা অস্বীকার করা যায় না।’

তৃতীয়ত, এই রকম পরিস্থিতিতে অনেক সময় কী ভাবে রিয়্যাক্ট করতে হবে, সেটাই অনেকে বুঝতে পারেন না। ডাঃ রায় বলেন, ‘একটা Emotional Numbness চলে আসে। ফলে ওই পরিস্থিতিতে কী করা উচিত, অনেকেই ঠিক করে উঠতে পারেন না। যা কিছু ক্ষেত্রে ভুল পদক্ষেপ করার দিকে পরিচালিতও করে।’

চতুর্থত, একটা সাধারণ ভাবনা মানুষের মধ্যে কাজ করে, তা হলো আমি আমার নিজের লোককে বা অন্যদের দেখাব কী সাঙ্ঘাতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই ভাবনা থেকেই এমন মারাত্মক পরিস্থিতিতেও ছবি বা ভিডিয়ো তোলার প্রবণতা দেখা যায়।

তবু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায় — সেই মুহূর্তে মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা মানুষটির মনে কী চলছিল? ভিডিয়ো শেষ হয়ে যায়, মানুষ ছোটে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে, কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডের আতঙ্ক সম্ভবত ক্যামেরার পিছনে মানুষটির মনে গেঁথে থাকে চিরতরে। ওই যে… স্ক্রোলের সাইকোলজিটাই তো আসলে ‘ইনফাইনাট’ — অনন্ত।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *