ভূমিকম্প নয়, নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের কারণ কী? যা বলল মার্কিন সংস্থা, মৃত বেড়ে ১৬২
বুধবার সাড়ে আটটার কিছু পরে তিব্বতের দিক থেকে নেমে আসে কাদামাটি মিশ্রিত জলস্রোত। তার পরবর্তী প্রকৃতির তাণ্ডবলীলার কাছে অসহায় নেপালের ছবি দেখে শিউরে উঠছে গোটা বিশ্ব। মুহূর্তের মধ্যে খেলনার মতো দুমড়েমুচড়ে ভেসে গিয়েছে ব্রিজ, বাড়ি, গাড়ি, রাস্তা, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প–সহ অনেক কিছু। কিন্তু কী কারণে আচমকা এই বিপর্যয়? ভূতত্ত্ববিদরা প্রাথমিক ভাবে একাধিক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করলেও মার্কিন ভূতাত্ত্বিক সংস্থা USGS-এর দাবি, ভূমিকম্প নয়, তুষারধসের কারণেই ভয়াবহ হড়পা বান নামে নেপালের ভোটেকোশি নদীতে।
আমেরিকার ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা পর্যবেক্ষণ
নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের নেপথ্যে ভূমিকম্প নয়, রয়েছে হিমবাহ ও পাথরের ভয়াবহ ধস। প্রথমে মনে করা হয়েছিল, বুধবার সকালে নেপাল-চিন সীমান্তে অনুভূত ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের জেরেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। কিন্তু পরে নিজেদের তথ্য সংশোধন করে আমেরিকার ভূতত্ত্ব পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইউনাইটেড স্টেটস জিয়োলজিক্যাল সার্ভে জানাল, সেখানে কোনও ভূমিকম্পই হয়নি। বরং বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নেমে এসে নদীতে ‘ডেব্রিস ফ্লো’ তৈরি করে। তার জেরেই আচমকা ভয়াবহ হড়পা বান নেমে আসে। এই ধস থেকে তৈরি শক্তিশালী ভূকম্পন পরবর্তীতে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য হিসেবে রেকর্ড হয়েছে।
কী ঘটেছিল নেপালে?
বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট নাগাদ নেপাল-চিন সীমান্তের কাছে ভূকম্পন অনুভূত হয়। প্রথম পর্যায়ে USGS ঘটনাটিকে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু পরে উপগ্রহের ছবি এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানায়, সেটি আদতে কোনও ভূমিকম্প ছিল না।
Planet Labs-এর উপগ্রহ-চিত্রের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরফ ও পাথর নিয়ে পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়েছিল। সেই ধসের ফলে বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা, বরফ ও জল নেমে আসে লেহেন্দে নদীতে। নদীটি চিন থেকে নেপালে প্রবাহিত ভোটেকোশি নদীর একটি উপনদী।
এর পরেই নদীর জল ভয়াবহ গতিতে ফুলে ওঠে। স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ৯টা নাগাদ তিব্বতের দিক থেকে ভোটেকোশি নদী দিয়ে জলের প্রবল স্রোত নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে কাদা, পাথর ও জলে ভেসে যায় বহু বাড়ি, গাড়ি ও অন্যান্য পরিকাঠামো।
তা হলে ৫.২ মাত্রার ঘটনা কী?
এখানেই রয়েছে পুরো ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রথমে যে কম্পনকে ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্প বলা হয়েছিল, পরে USGS জানায় সেটি আসলে হিমবাহ ধস ও কাদামাটির বিপুল স্রোতের কারণে তৈরি হয়েছিল। ওই অত্যন্ত শক্তিশালী ধস থেকে যে সেসমিক এনার্জি তৈরি হয়, তা পরবর্তীতে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য হিসেবে রেকর্ড করা হয়। অর্থাৎ, ৫.২ মাত্রার ঘটনাটি কোনও স্বাভাবিক টেটোনিক ভূমিকম্প ছিল না।
USGS-এর ভাষায়, প্রাথমিক ভাবে ভূমিকম্প হিসেবে চিহ্নিত সেসমিক অ্যাটমিক আসলে ছিল ‘হিমবাহ ধস’। অর্থাৎ, পাহাড়ি অঞ্চলে বরফ ও পাথরের ধসই পুরো বিপর্যয়ের সূত্রপাত করে।
মৃত অন্তত ১৬২, নিখোঁজ বহু মানুষ
এই ভয়াবহ হড়পা বানের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নেপালের রসুয়া এলাকায়। পাশাপাশি ধাদিং এবং নুওয়াকোট জেলাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নেপাল পুলিশের হিসাবে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। বহু মানুষ এখনও নিখোঁজ। সংখ্যাটা আনুমানিক ১০০০-এরও বেশি।
নিখোঁজ অন্তত ১৩৩ জন ভারতীয়
নেপালের পর্যটন মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, বিপর্যয়ের পর অন্তত ৪০৩ জন পর্যটকের কোনও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি। নিখোঁজ বিদেশিদের তালিকায় ১৪২ জন ভারতীয়ও রয়েছেন। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আমেরিকার নাগরিকদের নাম রয়েছে।
চিনের তিব্বতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
নেপালের পাশাপাশি চিনের তিব্বত অংশেও এই বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে। চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, গিরং এলাকায় অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ। তবে মৃত্যুর সংখ্যা এখনও যাচাই করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। সীমান্তের দুই প্রান্তেই উদ্ধারকাজ চলছে।
সীমান্তবর্তী এলাকায় ধস ও হড়পা বানের ভয়াবহতা ক্যামেরাতেও ধরা পড়েছে। নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, বিপুল পরিমাণ পাথর, কাদা ও জল আচমকা নেমে এসে বাড়িঘর ও গাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বহু মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালাচ্ছেন।
বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও বিপর্যস্ত
বন্যার জেরে বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। নিখোঁজ আত্মীয়দের খোঁজে বহু মানুষ নেপাল সেনার একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বাইরে জড়ো হন। ওই জায়গাটি হেলিকপ্টারে উদ্ধার অভিযানের অন্যতম ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের অন্ধকারে মোবাইলের আলো ব্যবহার করে নিখোঁজদের নাম নথিভুক্ত করছিল পুলিশ। অন্যদিকে, হেলিকপ্টারে করে দুর্গত এলাকা থেকে জীবিতদের সরিয়ে আনার কাজ চলছে। কাদার নীচে চাপা পড়া মানুষ ও মৃতদেহ উদ্ধারে জোরকদমে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
ভূমিকম্প নয়, হিমবাহ ধস—কেন গুরুত্বপূর্ণ এই তথ্য?
প্রাথমিক ভাবে ভূমিকম্পকে এই বিপর্যয়ের কারণ মনে করা হলেও USGS-এর সংশোধিত ব্যাখ্যা ঘটনাটির প্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। এটি সাধারণ ভূমিকম্পজনিত বিপর্যয় নয়। বরং হিমালয়ের অত্যন্ত দুর্গম ও অস্থির পাহাড়ি এলাকায় বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নদীতে নেমে গিয়ে আচমকা বিপুল জলস্রোত তৈরি হওয়ায়, তার ফলেই ভয়াবহ হড়পা বান তৈরি হয়েছে। আর সেই ধসের শক্তি এতটাই বেশি ছিল যে তা ভূমিকম্পের মতো সেসমিক সিগন্যাল তৈরি করে—যার মাত্রা ৫.২ হিসেবে রেকর্ড করা হয়। ফলে ‘৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পে নেপালে হড়পা বান’ বলা পুরো ঘটনাটিকে সঠিক ভাবে ব্যাখ্যা করে না। বরং ‘হিমবাহ ধস থেকে তৈরি ভয়াবহ হড়পা বান, যার সেসমিক শক্তি ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য’—এই ব্যাখ্যাই তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।