প্যাকেটজাত খাবারে লাল সতর্কবার্তা চেয়েছিল ভারত, খাদ্য সংস্থার আপত্তিতে বদল সিদ্ধান্ত
নয়াদিল্লি: প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ে অতিরিক্ত চিনি, নুন এবং ফ্যাটের (Food Safety) বিষয়ে ক্রেতাদের আরও স্পষ্টভাবে সতর্ক করতে চেয়েছিল ভারত। কিন্তু সেই উদ্যোগে আপত্তি তুলেছিল বড় বড় খাদ্য ও পানীয় সংস্থাগুলি। শিল্পমহলের চাপের পর শেষ পর্যন্ত সামনের দিকে রঙিন সতর্কবার্তা দেওয়ার প্রস্তাব থেকে সরে এসেছে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বিষয়টি এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরেও রয়েছে।
এরই মধ্যে একটি তুলনা সামনে এসেছে, যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। লন্ডনে বিক্রি হওয়া একটি ফ্যান্টা ক্যানের প্রতি পরিবেশনে প্রায় ৬৩ ক্যালোরি থাকলেও ভারতে একই ব্র্যান্ডের পানীয়তে প্রায় তিন গুণ বেশি চিনি রয়েছে। ভারতীয় সংস্করণে কৃত্রিম রংও ব্যবহার করা হয়। ইউরোপের কিছু দেশে এই ধরনের রং ব্যবহার করা হলে প্যাকেটের গায়ে স্পষ্ট স্বাস্থ্য সতর্কতা দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ভারতে অবশ্য কৃত্রিম রঙের উপস্থিতি সাধারণত প্যাকেটের পিছনের দিকে ছোট অক্ষরে উল্লেখ করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএসএসএআই চলতি বছরের আগস্টে জানায়, প্যাকেটের সামনে রঙিন সতর্কবার্তা দেওয়ার পরিকল্পনা তারা আর এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে না। সংস্থার যুক্তি ছিল, ভারতীয় খাবারে পশ্চিমি খাবারের তুলনায় স্বাদ ও মশলার ব্যবহার অনেক বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক মডেলের সতর্কবার্তা সরাসরি প্রয়োগ করা কঠিন। পরিবর্তে প্যাকেটের সামনে কালো-সাদা ছকে চিনি, ফ্যাট এবং নুনের পরিমাণ জানানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
Also Read | খড়গপুর থেকে অমরাবতী! সড়ক পরিবহনে ৭৫,৬২৯ কোটির গ্রিন ফিল্ড করিডোরের পরিকল্পনা চূড়ান্ত
তবে জনস্বাস্থ্যকর্মীদের করা একটি আবেদনের পর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখছে। এর পিছনে বড় উদ্বেগ হল ভারতে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার বাড়তে থাকা সমস্যা। সাম্প্রতিক ল্যানসেট পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে প্রায় ৪৫ কোটি মানুষ অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতার সমস্যায় ভুগতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যাকেটের সামনের দিকে সহজে বোঝা যায় এমন পুষ্টিগত সতর্কবার্তা থাকলে মানুষ খাবার বেছে নেওয়ার সময় আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বিশ্বের প্রায় ২০টি দেশে ইতিমধ্যেই এই ধরনের ব্যাখ্যামূলক লেবেল চালু হয়েছে। কোথাও অতিরিক্ত চিনি বা নুনের জন্য লাল রং, আবার কম ফ্যাটের মতো তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর উপাদানের জন্য সবুজ রং ব্যবহার করা হয়।
রয়টার্সের হাতে আসা বৈঠকের অডিয়ো রেকর্ডিং অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ মার্চ এফএসএসএআই এবং খাদ্য শিল্পের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে তীব্র মতবিরোধ হয়। শিল্পের প্রতিনিধিরা দাবি করেন, এই ধরনের সতর্কবার্তা বিভ্রান্তিকর এবং কার্যকর নয়। তাঁদের বক্তব্য ছিল, মানুষকে খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে আরও বেশি সচেতন করা উচিত।
Also Read |হুগলি নদীর ধরে ৬০০ কোটি বিনিয়োগ ইডেন রিয়েলিটির! তৈরী হবে ৩ লাক্সারি হোটেল
কোকা-কোলা ইন্ডিয়ার এক শীর্ষ আধিকারিক মিলি ভট্টাচার্য ওই বৈঠকে বলেন, যাঁরা ইতিমধ্যেই খাবারের উপাদানের তালিকা পড়েন না, তাঁরা প্যাকেটের সামনে কোনও প্রতীক বা চিহ্ন দেখেই তাঁদের খাদ্যাভ্যাস উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে ফেলবেন, এমনটা ধরে নেওয়া অত্যন্ত সরলীকৃত ধারণা। তাঁর দাবি ছিল, সতর্কবার্তা দিলেও মানুষ চিনি বা নুনযুক্ত খাবার খাওয়া বন্ধ করবেন না। পাশাপাশি ভারতীয় চিকিৎসকেরা ইতিমধ্যেই রোগীদের কোন খাবার এড়িয়ে চলতে হবে সে বিষয়ে যথেষ্ট পরামর্শ দেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে একই সময়ে কোকা-কোলা এবং তার বোতলজাতকরণ অংশীদাররা ইউরোপের প্রায় দুই ডজন বাজারে স্বেচ্ছায় ট্রাফিক-লাইট ধরনের পুষ্টিগত লেবেল ব্যবহার করছে। কোকা-কোলার সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সহযোগী সংস্থা কোকা-কোলা এইচবিসি-ও তাদের ওয়েবসাইটে এই ধরনের লেবেলকে স্পষ্ট ও স্বচ্ছ তথ্য দেওয়ার উপায় হিসেবে তুলে ধরেছে।
নেসলেকে নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটি ভারতে খাদ্যশিল্পের এমন কয়েকটি সংগঠনের সদস্য, যারা আগে সামনের দিকে পুষ্টিগত সতর্কবার্তা দেওয়ার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল। অথচ ব্রিটেনে নেসলে ২০১৩ সাল থেকেই স্বেচ্ছায় ব্যাখ্যামূলক পুষ্টিগত লেবেল ব্যবহার করছে।
রয়টার্স এই প্রতিবেদন তৈরির সময় অডিয়ো রেকর্ডিং, শতাধিক পৃষ্ঠা সরকারি ও কর্পোরেট নথি পর্যালোচনা করেছে এবং ১১ জন শিল্পকর্তা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সামনের দিকে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিলে সংস্থাগুলির লাভের উপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই খাদ্য সংস্থাগুলির কাছে এই ধরনের নিয়ম যতটা সম্ভব পিছিয়ে দেওয়ার আর্থিক প্রণোদনা রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার জর্জ ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথের খাদ্যনীতি বিভাগের প্রধান সিমোন পেট্রিগ্রু বলেন, শিল্পমহলের লবিং নিয়ন্ত্রকদের আরও কঠোর মানদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রায় অচল অবস্থায় ফেলেছে। এফএসএসএআই অবশ্য চলমান আদালতি প্রক্রিয়ার কারণ দেখিয়ে এই বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
ভারতের ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের বাজারে তৈরি হওয়া পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশেই বেশি মাত্রায় ফ্যাট, চিনি ও নুন থাকতে পারে বলে শিল্পমহলের হিসাব। ইন্ডিয়ান ফুড অ্যান্ড বেভারেজ অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি দীপক জলি মার্চের বৈঠকে বলেন, রঙিন সতর্কবার্তার ব্যবস্থা চালু হলে বাজারের প্যাকেটের একটা বড় অংশই লাল সতর্কচিহ্নে ভরে যাবে।
এই সংগঠনটি পেপসিকো-সহ একাধিক সংস্থার প্রতিনিধিত্ব করে। রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে সংগঠনটি জানিয়েছে, নিয়ন্ত্রকের কাছ থেকে আরও স্পষ্ট নির্দেশিকা প্রয়োজন। তাদের যুক্তি, বর্তমান প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রাকৃতিক চিনি থাকা নারকেলের জলকেও ‘বেশি চিনি’ ধরনের সতর্কবার্তা দিতে হতে পারে।
ভারতে ২০১৭ সাল থেকেই নিয়ন্ত্রকের তরফে প্যাকেটের সামনে রঙিন সতর্কবার্তা এবং পণ্যের পুষ্টিমান বোঝাতে স্টার রেটিংয়ের মতো বিভিন্ন প্রস্তাব সামনে এসেছে। কিন্তু বর্তমানে প্রস্তুতকারকদের মূলত প্যাকেটের পিছনে উপাদান এবং প্রাথমিক পুষ্টিগত তথ্য দেওয়াই বাধ্যতামূলক।
স্বাস্থ্যকর্মীরা আরও স্বচ্ছতার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শীর্ষ আদালত নিয়ন্ত্রককে প্যাকেটের সামনে সতর্কবার্তার বিষয়টি বিবেচনা করার নির্দেশ দেয় এবং ইজরায়েলের লাল-সবুজ সতর্কবার্তা ব্যবস্থার মতো আন্তর্জাতিক মডেল পরীক্ষা করার কথাও বলে।
কিন্তু মার্চের বৈঠকের পর এফএসএসএআই ব্যাখ্যামূলক লেবেলিংয়ের প্রস্তাব থেকে পিছিয়ে যায়। আগস্টে আদালতকে সংস্থাটি জানায়, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ব্যবস্থা ভারতের ক্ষেত্রে হুবহু প্রয়োগ করা কঠিন। এই অবস্থান শিল্পমহলের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় আদালতও অসন্তোষ প্রকাশ করে। বিচারপতিরা মন্তব্য করেন, বিশ্বের জানা উচিত যে ভারত তার নাগরিকদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত।
অন্যদিকে ভারতের মধ্যবিত্তের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়লেও অতিরিক্ত ওজন কমানোর ওষুধের চাহিদাও বেড়েছে। বাজার গবেষণা সংস্থা ফার্মার্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের গোড়ার তুলনায় ক্ষুধা কমিয়ে ওজন কমাতে সাহায্য করে এমন ওষুধের মাসিক বিক্রি প্রায় ৪০০ শতাংশ বেড়েছে।
সামাজিক মাধ্যমেও প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিরুদ্ধে প্রচার বাড়ছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম রেভান্ত হিমৎসিংকা। প্রাক্তন ম্যাকিনজি ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট এই ব্যক্তি ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রামে ‘ফুড ফার্মার’ নামে পরিচিত এবং তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ৫০ লক্ষেরও বেশি।
২০২৩ সালে পেপসিকোর স্টিং ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়তে চিনি ও কৃত্রিম মিষ্টিকারকের পরিমাণ নিয়ে সমালোচনা করে একটি ভিডিও তৈরি করেছিলেন তিনি। পানীয়টি ভারতে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়। পরে পেপসিকো দিল্লির একটি আদালত থেকে ভিডিওটি সরানোর নির্দেশ আদায় করে। সংস্থাটির দাবি ছিল, ভিডিওতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে এবং পানীয়টির বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর উদ্দেশ্য ছিল।
চলতি বছরের জুলাইয়ে ভারতীয় নিয়ন্ত্রক পেপসিকো-সহ কয়েকটি সংস্থাকে ৯০ দিনের মধ্যে তাদের পণ্যের গায়ে ‘এনার্জি ড্রিঙ্ক’ শব্দটি বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। পেপসিকো এই বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল একই বহুজাতিক সংস্থার একই পণ্যের বিভিন্ন দেশের সংস্করণে উপাদানের পার্থক্য। স্থানীয় নিয়ম, স্বাদ এবং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশে রেসিপি বদলানো হয়। প্রাক্তন মন্ডেলেজ আধিকারিক পারুল শর্মার মতে, দাম ও ক্রেতাদের সামর্থ্য বিভিন্ন দেশে পণ্যের রেসিপি আলাদা হওয়ার অন্যতম বড় কারণ।
তবে রেভান্ত হিমৎসিংকার মতো খাদ্য অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ভারতের ক্রেতারা অনেক সময় একই ব্র্যান্ডের তুলনামূলক নিম্নমানের সংস্করণ পাচ্ছেন। তিনি ভারতে বিক্রি হওয়া ফ্যান্টা এবং নেসলের কিটক্যাটের সঙ্গে ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ায় বিক্রি হওয়া সংস্করণের উপাদান তুলনা করে একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেছেন।
ভারতে বিক্রি হওয়া সাধারণ কিটক্যাটে কোকো সলিডের পরিমাণ প্রায় ৪.৫ শতাংশ, যেখানে অস্ট্রেলিয়ার সংস্করণের মিল্ক চকলেটে অন্তত ২২ শতাংশ কোকো থাকে। একইভাবে ভারতে বিক্রি হওয়া ম্যাগির সব ধরনের ইনস্ট্যান্ট নুডলসে পাম তেল ব্যবহার করা হয়। ব্রিটেনে বিক্রি হওয়া অনেক সংস্করণে তুলনামূলক বেশি দামি সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করা হয়। এমনকি ব্রিটেনে বিক্রি হওয়া কিছু ম্যাগির প্যাকেট ভারতেই তৈরি হলেও সেগুলির সামনে বেশি নুন থাকার বিষয়ে লাল সতর্কবার্তা দেওয়া থাকে। হিমৎসিংকার কথায়, এই পার্থক্যই অনেক ভারতীয় ক্রেতার মধ্যে ‘প্রতারণার শিকার হওয়ার’ অনুভূতি তৈরি করছে।
তবে ক্রেতাদের পরিবর্তিত পছন্দের কারণে কিছু সংস্থা ধীরে ধীরে পণ্যের ধরন বদলাচ্ছে। নেসলে ২০২৪ সালে ভারতে চিনি ছাড়া সেরেল্যাক বিক্রি শুরু করার কথা ঘোষণা করে। এর আগে স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মীরা অভিযোগ করেছিলেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে ভারতে শুধুমাত্র চিনি যুক্ত সেরেল্যাক বিক্রি করা হয়েছে, যদিও অন্যান্য দেশে সংস্থাটি অনেক আগে থেকেই চিনি ছাড়া সংস্করণ বিক্রি করে আসছে।