চিনের নতুন হাইপারসনিক অস্ত্র নিয়ে উদ্বেগ, দূরের মার্কিন বিমানও নিশানায়
বেইজিং: চিন এমন একটি নতুন ধরনের হাইপারসনিক অস্ত্র (Hypersonic Weapons) তৈরি করেছে বলে দাবি উঠেছে, যা হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমানকে লক্ষ্য করে আকাশ থেকে আকাশে হামলা চালাতে সক্ষম। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে সরাসরি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক ব্যক্তির বক্তব্য উদ্ধৃত করে এই দাবি করা হয়েছে। এই প্রযুক্তি চিনের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিন হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল বা এইচজিভি তৈরি করেছে, যেগুলি উচ্চমূল্যের সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে আকাশ থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে থাকা এয়ারিয়াল রিফুয়েলিং ট্যাঙ্কার, এয়ারবোর্ন আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল বিমান এবং উড়ন্ত কমান্ড পোস্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম নতুন ধরনের হুমকির মুখে পড়তে পারে। এর মধ্যে মার্কিন বায়ুসেনার ই-৪বি নাইটওয়াচ-এর মতো বিমানও রয়েছে।
চিনের সামরিক বাহিনী কিছু হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রেও আকাশ থেকে আকাশে হামলার সক্ষমতা যুক্ত করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি একাধিক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রে জাহাজবিধ্বংসী সক্ষমতাও যুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
Also Read | মক্কা চুক্তিতে এবার ইরান? পশ্চিম এশিয়ায় তৈরি হচ্ছে নতুন ‘ইসলামিক ন্যাটো’!
হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল হল এমন একটি অস্ত্র, যা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে উৎক্ষেপণের পর বায়ুমণ্ডলের মধ্যে হাইপারসনিক গতিতে চলতে পারে এবং নিজের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। এই চালচলনের ক্ষমতা অস্ত্রটির পাল্লা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সেটিকে শনাক্ত ও আটকানো আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
চিনের ডিএফ-১৭ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে উৎক্ষেপণ করা এইচজিভির পাল্লা প্রায় ২,৪১৪ কিলোমিটার হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। এই দূরত্ব চিন থেকে মার্কিন নিয়ন্ত্রিত গুয়াম পর্যন্ত দূরত্বের তুলনায় কিছুটা কম। গুয়াম পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি।
আরও উন্নত ডিএফ-২৭ ক্ষেপণাস্ত্রের আনুমানিক সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৮,০০০ কিলোমিটার। এই ক্ষমতা থাকলে প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক দূরের লক্ষ্য, এমনকি হাওয়াইয়ের কাছাকাছি এলাকাও এর সম্ভাব্য পাল্লার মধ্যে চলে আসতে পারে।
Also Read | ভারত-চিন সীমান্ত আলোচনায় সোমবারেই চিন সফরে অজিত দোভাল
তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে দূরে থাকা চলমান বিমানকে আক্রমণ করা অত্যন্ত জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সর্বোচ্চ পাল্লায় একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যে পৌঁছতে ২০ মিনিট বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। সেই সময়ে লক্ষ্যবস্তু বিমান তার অবস্থান বদলে ফেলতে পারে। ফলে ক্ষেপণাস্ত্রকে নির্ভুলভাবে পরিচালনা করতে অত্যন্ত উন্নত এবং ক্রমাগত আপডেট হওয়া গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন হবে।
এই ধরনের ব্যবস্থায় দীর্ঘ কিল চেইন বা শনাক্তকরণ থেকে আঘাত হানা পর্যন্ত গোটা প্রক্রিয়াটি একটি বড় দুর্বলতা হতে পারে। দূরের সেন্সর থেকে পাওয়া তথ্য ক্ষেপণাস্ত্রে পৌঁছে দেওয়ার এই ব্যবস্থার কোনও অংশে সমস্যা তৈরি করা গেলে হামলা ব্যর্থ হতে পারে।
এছাড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে কোনও দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হলে সেটিকে পরমাণু হামলা হিসেবেও ভুল বোঝার ঝুঁকি রয়েছে। এই ডিসক্রিমিনেশন সমস্যা বিশেষ করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সময় পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে পরমাণু পাল্টা হামলার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তা সত্ত্বেও চিন তার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়ন দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের একটি মার্কিন বায়ুসেনা-সমর্থিত গবেষণায় চিনের ক্ষেপণাস্ত্র আধুনিকীকরণের লক্ষ্য হিসেবে প্রতিপক্ষের সামরিক ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশকে সমন্বিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার সক্ষমতার উপর বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পেন্টাগনের অনুমান অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত চিনের হাতে অন্তত ৩,১৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৩০০টি স্থল থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। ২০১৫ সালের তুলনায় এই সংখ্যা যথাক্রমে ১৪৭ শতাংশ এবং ৫০ শতাংশ বেশি।
চিনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনও দ্রুত বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে হামলার নতুন সক্ষমতা তৈরি হলে তা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভবিষ্যতের সংঘাতের কৌশলকে প্রভাবিত করতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রও দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে হামলার অস্ত্র তৈরিতে জোর দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এআইএম-১৭৪বি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যা আরটিএক্স কর্পোরেশনের এসএম-৬ বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র থেকে তৈরি। এর সঠিক পাল্লা গোপন রাখা হলেও স্থল থেকে উৎক্ষেপিত এসএম-৬-এর পাল্লা ২৫০ মাইল বা তার বেশি বলে জানা যায়।
মার্কিন নৌবাহিনী সম্প্রতি এআইএম-৪২৪ ম্যালিস নামে একটি নতুন আকাশ থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষার কথাও জানিয়েছে। রেথিয়নের তৈরি এই অস্ত্রের পাল্লা ৩০০ মাইলের বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া লকহিড মার্টিনের এআইএম-২৬০ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে রয়েছে, যদিও এখনও সেটি সক্রিয় পরিষেবায় প্রবেশ করেনি। ইউরোপে ব্যবহৃত এমবিডিএ মেটিয়রও একটি র্যামজেট-চালিত দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র, যার পাল্লা ১০০ মাইলের বেশি।
ফলে চিনের নতুন হাইপারসনিক সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন, দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতের আকাশযুদ্ধের চরিত্র বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে আকাশে থাকা ট্যাঙ্কার, নজরদারি বিমান এবং কমান্ড বিমানগুলিকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা আগামী দিনের সামরিক পরিকল্পনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।