AI-এর মাধ্যমে যদি আমরা ভালোবাসার বিষয়ে শিখি, তা হলে…?
এই সময় অনলাইন: ‘The Conversation’-এর প্রতিবেদনে শুধুমাত্র university student-দের কথা বলা হলেও ‘social chatbot’-দের সঙ্গে টিনএজার, ইয়ং অ্যাডাল্টদের যে সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, তা কি কৈশোর আর তারুণ্যের কাছে ভালোবাসার সংজ্ঞাটা বদলে দিচ্ছে?
জয়রঞ্জন: এআই সরাসরি ভালোবাসার সংজ্ঞা পাল্টে দিচ্ছে — এমন কথা এখনই বলা হয়তো উচিত হবে না। ভালোবাসা, রোম্যান্স মানুষের খুব পুরোনো, অতি প্রাচীন অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি। একটি চ্যাটবট, যেটা আমরা গত দু’-তিন বছর ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়েছি, এত তাড়াতাড়ি সেই সংজ্ঞা বদলে দিতে পারে না।
কিন্তু সম্ভবত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হচ্ছে, যে বিষয়ে আমাদের সবার অবগত থাকা প্রয়োজন। এআই কম্প্যানিয়ন হয়তো তরুণদের কাছে একটি সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, সেই প্রত্যাশাটাই পাল্টে দিতে পারে। দু’টি মানুষের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হওয়ার যে পদ্ধতি — ভালোবাসার যে গাঁথুনি ও অভিজ্ঞতা — সেটা যদি AI কম্প্যানিয়নের মাধ্যমে শুরু হয়, তা হলে একটি সম্পর্ক কী হতে পারে এবং একটি সম্পর্ক থেকে আমরা কী প্রত্যাশা করতে পারি, সেই ধারণাটাই বদলে যেতে পারে।
কৈশোর, তারুণ্য বা ইয়ং অ্যাডাল্টহুড এমন একটা সময়, যখন আমরা বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সম্পর্কের ব্যাপারে শিখি। ঘনিষ্ঠতা কী, বন্ধুত্ব কী, আকর্ষণ কী, রিজেকশন কী, সম্পর্কের মধ্যে অশান্তি কী — এবং সেই অশান্তিগুলো কী ভাবে মিটিয়ে নিয়ে, সম্পর্ককে মেরামত করে এগিয়ে যাওয়া যায় — এ সব আমরা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই শিখি। কোনও চ্যাটবট আমাদের শুধু অ্যাডভাইস দিয়ে বা গুগল সার্চ সেই অভিজ্ঞতা দিতে পারে না।
আমরা, অর্থাৎ মানুষরা প্রত্যেকে স্বভাবতই জটিল। মেশিন হয়তো অনেক বেশি সহজ-সরল এবং আমরা যে ধরনের উত্তর তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করি, তারা অনেক সময় সেই ধরনের উত্তরই আমাদের দিতে থাকবে। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের নিজের পছন্দ-অপছন্দ রয়েছে, নিজস্ব মানসিক পরিকাঠামো রয়েছে, নিজেদের বাউন্ডারি রয়েছে। আমি যদি কারও সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চাই, তা হলে সেই মানুষটির সঙ্গে আমার পছন্দ, মানসিকতা বা প্রত্যাশা হয়তো একেবারে ১০০ শতাংশ মিলে যাবে না।
কিন্তু এআই কম্প্যানিয়ন একেবারে আলাদা। আমি যখনই চাইব, সেই কম্প্যানিয়ন তখনই অ্যাভেলেবল। সে আমার কথা শুনতে ক্লান্ত হবে না। আমি কী পছন্দ করি, কী পছন্দ করি না — সেটা তার মেমোরিতে সবসময় থাকে। আমি কী ধরনের ইমোশনাল রেসপন্স চাই, অনেক সময় সেটাও সে বুঝে নিয়ে আমার মন জোগানোর মতো উত্তর দেয়। আমার এআই কম্প্যানিয়ন কখনও (আমার) বান্ধবীর মতো বলবে না, ‘আমার এখন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না’ বা ‘তুমি বড্ড বোর করছ।’
এই তফাতগুলো আমাদের ভালোবাসা এবং সম্পর্কের প্রত্যাশাকে পাল্টে দিতে পারে। আমি যদি শুধু এআই-এর মাধ্যমেই সম্পর্কের সংজ্ঞাগুলো শিখি, তা হলে একটি সম্পর্কের অন্য মানুষটি আমাকে কী দিতে পারে বা কী দিতে পারে না — সেই প্রত্যাশা বাস্তবতার সঙ্গে একেবারেই মিল নাও থাকতে পারে।
আমার নিজের কাজের মাধ্যমে দেখেছি, যাঁরা অত্যন্ত একাকিত্বে ভোগেন বা সোশ্যাল অ্যানজ়াইটিতে ভোগেন, সেই ধরনের তরুণ-তরুণীদের কাছে এআই কম্প্যানিয়নশিপ খুব কমফর্টিং হয়ে ওঠে। ফলে তাঁরা এর উপর অত্যন্ত নির্ভরশীলও হয়ে পড়তে পারেন। এটা একদিক থেকে চিন্তার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
আরেকটি চিন্তার বিষয় হলো, তরুণরা সম্পর্কের পরিকাঠামো বা সম্পর্কের যে ‘নাটস অ্যান্ড বোল্টস’, সেগুলো সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যেতে যেতেই শেখে। অন্য একজনের অনুভূতিকে মর্যাদা দেওয়ার মধ্য থেকেই আমরা এমপ্যাথি বা সহমর্মিতা কী, সেটা শিখি। সবসময় নিজের ইচ্ছেমতো কাউকে পাওয়া যায় না — এটা বুঝতে গিয়ে আমরা কমপ্রোমাইজ় করতে শিখি। কখনও সম্পর্কের মধ্যে রিজেকশন আসতে পারে, সেটা সামলাতে গিয়ে আমাদের রেজ়িলিয়েন্স তৈরি হয়। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে কোনও সম্পর্কের মধ্যেই অন্যের দিকটা মাথায় রেখে আমাদের নিজেদের আচরণ ও আচার-ব্যবহার পাল্টাতে হবে — সেটাও আমরা শিখি।
আমি যদি চাই, অন্যজন আমাকে বুঝে নিক, তা হলে আমাকেও অন্যজনকে বুঝতে হবে। কিন্তু এআই-এর সঙ্গে এই বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের মধ্যে আসে না। এআই বা এআই কম্প্যানিয়ন আমার সঙ্গে যে সম্পর্কটা তৈরি করছে, সেটা মূলত আমাকে সন্তুষ্ট করার জন্যই তৈরি। অথচ ভালোবাসা সবসময় আমাদের মধ্যে সন্তুষ্টি আনে না।
এআই-এর মাধ্যমে যদি আমরা ভালোবাসার বিষয়ে শিখি, তা হলে অসুবিধাবিহীন ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে একটি প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। আমার নিজের অভিজ্ঞতায়, যখন দেখি কোনও তরুণ বা তরুণী এআই চ্যাটবট বা এআই রিলেশনশিপের উপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, তখন আমি প্রশ্ন করি — এই এআই রিলেশনশিপটি আসলে কীসের পরিবর্তে এসেছে? ওই তরুণ বা তরুণীর জীবনে কীসের অভাব রয়েছে, যার জন্য সে এই সম্পর্কটির উপর এতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে?
অনেক ক্ষেত্রে এআই ধীরে ধীরে বন্ধু, পরিবার, প্রেমের সম্পর্ক এবং বাস্তব সোশ্যাল ইন্টারঅ্যাকশন থেকে মানুষকে দূরে নিয়ে যেতে পারে। তখন আমাদের ক্লিনিক্যাল ইন্টারভেনশনের প্রয়োজন হয়।