ত্রিকোণ প্রেম নাকি দাদাগিরি, কেন সংঘর্ষে জড়াল রামলাল?
সুমন ঘোষ
রণং দেহি রামলাল!
ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ল কথাটা। কেউ চমকে উঠলেন, কেউ আবার চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘সে কী!’ যে কিনা হেলেদুলে লোকালয়ে ঢুকে কলাগাছটা ভেঙে খায়। ছোট খেজুর গাছটা উপড়ে ফেলে। আবার কখনও কারও গুদামে ঢুকে চালের বস্তা টেনে সাবাড় করে। ইচ্ছে হলে সাধু রামচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয়েও ঢুকে পড়ে অনায়াসে। যাকে দেখে সাধারণ মানুষও ভয় পান না। মানুষ দেখে রামলালেরও কিছু যায় আসে না।
সেই শান্ত রামলাল আচমকা সংঘর্ষে জড়াল কেন? গত ৭ অগস্টে ঝাড়গ্রাম বনবিভাগের রামরামা বিটের অন্তর্গত কংসাবতীর তীরে রামলালের সঙ্গে অন্য এক দাঁতালের লড়াইয়ের কথা জানাজানি হওয়ার পর থেকেই এই প্রশ্নটা উঠতে শুরু করেছে। যা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ বলছেন, ‘রামলালের লড়াইয়ের পুরোনো ইতিহাস রয়েছে। বছর কয়েক আগে বাঁকুড়ার এক জঙ্গলেও সে লড়াই করেছিল। সে লড়াই জিতে শেষ হাসি হেসেছিল রামলালই।’ কারও মতে, ‘লোকালয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মানুষের কাছ থেকে খাবার কেড়ে খাচ্ছে, অথচ মানুষকে আক্রমণ করছে না মানেই যে রামলালের জীবন থেকে জংলি সত্তা উধাও, এমন ভাবারও কারণ নেই।’
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক বন দপ্তরের এক আধিকারিক জানাচ্ছেন, যে কোনও হাতি, তা সে দলছুট হোক বা দলের, প্রত্যেকেই নিজের মতো করে একটি ‘টেরিটরি’ তৈরির চেষ্টা করে। সেখানে অন্যের প্রবেশ নিষেধ। তা সত্ত্বেও যদি কেউ জোর করে ঢুকতে যায়, সে ক্ষেত্রে প্রথমে নিজস্ব কায়দায় বাধা দেয়। তারপরেও না-মানলে শুরু হয় লড়াই। যেহেতু ওই এলাকায় দিনের পর দিন ঘুরতে ঘুরতে নিজের এলাকা বলে ভেবে নিয়েছিল রামলাল, তাই সেখানে অন্য দাঁতালের রোয়াব দেখিয়ে চলাফেরা একেবারেই না-পসন্দ ছিল রামলালের। সে দিন দুই দাঁতালের লড়াই আসলে তারই ফল।
বন দপ্তরের এক আধিকারিক জানান, বিভিন্ন ভিডিয়ো থেকে যেটুকু দেখা গিয়েছে, তাতে প্রথমেই কিন্তু লড়াইয়েও নামতে চায়নি রামলাল। একটু ধাক্কা মেরে দলের দাঁতালকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল, এটা তার এলাকা। তারপরে সরেও যেতে চেয়েছিল। কিন্তু তখনই সেই দাঁতাল পাল্টা হুঙ্কার দেয়। তখন বিষয়টি রামলালের ‘ইগো’য় লাগে। শুরু হয় লড়াই। সে লড়াইও অবশ্য দীর্ঘক্ষণ চলেনি। এ ক্ষেত্রেও বিশেষজ্ঞদের মত, রামলালের মধ্যে লড়াকু মানসিকতা যেমন মরে যায়নি, তেমনই দখলদারির জন্য জান বাজি রেখে লড়াইয়ের ইচ্ছেও তার নেই।
কিন্তু কেন? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, দুই দাঁতালের সংঘর্ষের একাধিক ইতিহাস রয়েছে জঙ্গলমহলে। এলাকা দখল থেকে দলনেতা হওয়ার লড়াই হয়েছে। লড়াই হয়েছে ত্রিকোণ প্রেমের কারণেও। এই লড়াই কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। লড়াই থামার জন্য অলিখিত দু’টি শর্ত রয়েছে। প্রথমত, একজনকে বশ্যতা স্বীকার করে দল ছেড়ে চলে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, লড়াইয়ের ময়দানে মৃত্যুবরণ করতে হবে।
তেমন লড়াইয়ের কাহিনিও রয়েছে ঝাড়গ্রাম জেলায়। বেশ কয়েক বছর আগে ত্রিকোণ প্রেমের কারণে লালগড়ের ঝিটকার জঙ্গল কাঁপিয়ে টানা পাঁচ দিন লড়াই চলেছিল দুই দাঁতালের। অবশেষে একটি দাঁতালের মৃত্যুর পরে সে লড়াই থামে। আবার কে দলনেতা হবে, সে লড়াইয়েও ঝাড়গ্রামের মানিকপাড়ার কাছে বালিভাসা এলাকায় টানা ৩৬ ঘণ্টা লড়াই চলেছিল দুই দাঁতালের। সে লড়াইয়ের দাপটে বালিভাসা ক্যানেলের দু’পাড়ের সাত কিলোমিটার ভেঙে সমতল হয়ে গিয়েছিল! এখানেও লড়াই থামে এক দাঁতালের মৃত্যুর পরে। বাকি নানা ক্ষেত্রে লড়াই হলেও মৃত্যু অবশ্য ঘটেনি। তবে বশ্যতা স্বীকার করে দলছুট হয়েছে একাধিক দাঁতাল। দীর্ঘদিন ধরে হাতির চিকিৎসা করছেন চঞ্চল দত্ত। তাঁর কথায়, ‘যে কারণে দেখবেন হস্তিনীরা সাধারণত লোনার বা দলছুট হয় না। দাঁতালরাই লোনার হয়।’ তা হলে রামলালেরও কি এমন কোনও অতীত রয়েছে? (চলবে)