চিনির দাম বাড়ার নেপথ্যে ইথানল নয়, আখ কমা ও মজুতদারি
নয়াদিল্লি: দেশে চিনির দাম (Sugar Price) দ্রুত বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে ইথানল উৎপাদনে চিনি সরিয়ে নেওয়াকে দায়ী করা ঠিক হবে না। বরং আখের উৎপাদন কমে যাওয়া, চিনির সামগ্রিক উৎপাদন হ্রাস এবং ব্যবসায়ীদের বড় পরিমাণে চিনি মজুত করে রাখার মতো একাধিক কারণ একসঙ্গে বাজারে চাপ তৈরি করেছে।
চিনির দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। পেট্রোলে ইথানল মিশ্রণের মাত্রা বাড়ানোর নীতির কারণে চিনি ইথানল তৈরিতে চলে যাচ্ছে এবং তার ফলে সাধারণ মানুষের জন্য চিনির দাম বাড়ছে বলে অভিযোগ করেছে বিরোধী দলগুলি। তবে কেন্দ্র এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের বক্তব্য, দেশে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত চিনি রয়েছে। বাজারে দাম বাড়ানোর জন্য সরকার বরং শিল্পকেই দায়ী করেছে।
মহারাষ্ট্রে কেজি পিছু চিনি ৮০ টাকা
চিনির দাম বৃদ্ধির প্রভাব দেশের বিভিন্ন বাজারে দেখা যাচ্ছে। মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে রবিবার খোলা বাজারে চিনির দাম প্রতি কেজি ৭৫-৮০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে বলে জানিয়েছেন এক সুপারমার্কেট মালিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
কমছে আখের উৎপাদন
মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন চিনি কমিশনার শেখর গায়কোয়াড়ের মতে, ভারতে আখের উৎপাদন এবং ফলন দুটোই কমছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চিনির সামগ্রিক উৎপাদনে। তিনি আরও জানান, দেশের গুরুত্বপূর্ণ আখ উৎপাদনকারী রাজ্যের সংখ্যাও কমছে। গায়কোয়াড়ের মতে, সরকার এখন আখের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য নতুন নীতি তৈরি করলেও তার ফল বাজারে পেতে সময় লাগবে। নতুন নীতির প্রভাব উৎপাদনে দেখা দিতে প্রায় ৩০-৩৬ মাস সময় লাগতে পারে। তিনি আরও বলেন, সরকারের উচিত দেশে বর্তমানে কত পরিমাণ চিনি মজুত রয়েছে, তা আবার পরীক্ষা করে দেখা।
মহারাষ্ট্রে কমেছে আখ মাড়াইয়ের সময়
মহারাষ্ট্র দেশের অন্যতম প্রধান চিনি উৎপাদক রাজ্য। প্রাক্তন ন্যাশনাল ফেডারেশন অব কো-অপারেটিভ সুগার ফ্যাক্টরিজের সভাপতি জয়প্রকাশ দান্ডেগাঁওকর জানিয়েছেন, রাজ্যেও আখ মাড়াইয়ের মরশুমের সময়কাল কমেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগে যে কারখানাগুলি বছরে প্রায় ১৫০ দিন আখ মাড়াই করত, এখন ব্যবসা লাভজনক না হওয়ায় অনেক কারখানায় সেই সময় কমে প্রায় ১০০ দিন হয়েছে। এর সঙ্গে কৃষকদের দেওয়া আখের দাম এবং চিনির দামের মধ্যে ব্যবধানও সমস্যা তৈরি করছে।
দান্দেগাঁওকর জানান, কৃষকদের প্রতি টন আখের জন্য ৩,৬৫০ টাকা ফেয়ার অ্যান্ড রেমুনারেটিভ প্রাইস বা এফআরপি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে চিনির জন্য মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস বা এমএসপি রয়েছে ৩,১০০ টাকা। তাঁর মতে, কৃষকদের দেওয়া এফআরপি এবং চিনির এমএসপির এই ব্যবধান চিনি কলগুলির লোকসানের অন্যতম কারণ এবং বিষয়টি সমাধান করা প্রয়োজন।
ইথানল উৎপাদনকে দায়ী করছেন না বিশেষজ্ঞরা
ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান সুগার মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ভৈরবনাথ থোম্বরে স্পষ্টভাবে বলেছেন, বর্তমান চিনির দাম বৃদ্ধির জন্য ইথানল উৎপাদনকে দায়ী করা যায় না। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ইথানল উৎপাদনের ১০০ শতাংশই চিনি সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে করা হত। বর্তমানে সেই অংশ কমে প্রায় ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যশস্য থেকে ইথানল উৎপাদনের অংশ এখন অনেক বেশি। ফলে ইথানলের জন্য চিনি সরিয়ে নেওয়াই বর্তমান বাজারে চিনির ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ, এই যুক্তি তিনি মানছেন না।
উৎপাদনের অনুমান থেকে বড় ঘাটতি
থোম্বরে আরও জানান, সরকারের চিনির উৎপাদন সংক্রান্ত প্রাথমিক অনুমান এবং প্রকৃত উৎপাদনের মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। প্রথমে চিনির উৎপাদন ৩৯০ লক্ষ টন হবে বলে অনুমান করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৩১০ লক্ষ টন।
এর পরেও সরকার প্রায় ৮ লক্ষ টন চিনি রপ্তানির অনুমতি দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ এবং দামের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
এল নিনোর আশঙ্কায় চিনি মজুত
চিনির দাম বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীদের মজুতদারির কথাও উঠে এসেছে। থোম্বরের মতে, ব্যবসায়ীরা এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা মাথায় রেখে আখ এবং চিনির উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। সেই কারণে তাঁরা বড় পরিমাণে চিনি কিনে মজুত করেন। বাজারে সরবরাহের পরিবর্তে এই ধরনের মজুতদারি চিনির দাম আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এখন চিনির কেনাকাটা নিয়ে কিছু নতুন নিয়ম চালু করেছে।
প্রতি মাসে বাজারে আসতে পারে ১৫-২০ লক্ষ টন চিনি
থোম্বরে জানিয়েছেন, নতুন নিয়ম অনুযায়ী আখ মাড়াইয়ের মরশুম শুরু হলে চিনি কলগুলি প্রতি মাসে প্রায় ১৫-২০ লক্ষ টন চিনি বাজারে আনতে পারবে। এর ফলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি পরিসংখ্যানেও উৎপাদন কমার ছবি
কেন্দ্রীয় কৃষি ও কৃষক কল্যাণ মন্ত্রকের পরিসংখ্যানেও দেশে আখ চাষের এলাকা কমার বিষয়টি স্পষ্ট। ২০২২-২৩ সালে দেশে আখ চাষের এলাকা ছিল ৫৮৮৫.৩২ হাজার হেক্টর। তা কমে ২০২৪-২৫ সালে ৫৪৪৯.৯৩ হাজার হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে আখের মোট উৎপাদনও কমেছে। ২০২২-২৩ সালে ভারতে আখের উৎপাদন ছিল ৪৯০৫৩৩.৩৫ হাজার টন। পরে তা কমে ২০২৪-২৫ সালে ৪৫৩১৫৮.৪০ হাজার টনে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ সালে চিনির উৎপাদন ছিল ৪৫৪৬১০.৯৭ হাজার টন।
একাধিক কারণেই চাপে চিনির বাজার
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। আখ চাষের এলাকা এবং উৎপাদন কমে যাওয়া, মহারাষ্ট্রে আখ মাড়াইয়ের সময় কমে যাওয়া, প্রত্যাশার তুলনায় কম চিনি উৎপাদন, রপ্তানির অনুমতি এবং ব্যবসায়ীদের আগাম মজুত, সব মিলিয়েই বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
ফলে শুধু ইথানল উৎপাদনের জন্য চিনি সরিয়ে নেওয়াকেই বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখলে পরিস্থিতির পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মজুতদারি নিয়ন্ত্রণ করাই এখন চিনির দাম স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
Also Read | সন্ত্রাসবাদ অর্থায়নে ফের নজরে বাংলা! কালিকাপুরের মাদ্রাসা থেকে উদ্ধার ৪০লক্ষ নগদ-১৮০ গ্রামের সোনার মুদ্রা
Also Read | পরের স্টেশন মোহনবাগান! মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেট্রোর মানচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব
Also Read | কংগ্রেসের কারণে কলকাতা ছাড়েন তসলিমা! বিস্ফোরক তৎকালীন শরিক সিপিএম নেতা
Also Read | IRCTC-এর ৯ দিনের তীর্থযাত্রা ট্রেন: জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে দ্বারকা-অক্ষরধাম, ভাড়া ও রুট জানুন
Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের