জাপানি পড়ুয়ার সঙ্গে যোগীর সেলফি, লখনউয়ে নতুন কূটনীতির বার্তা - 24 Ghanta Bangla News
Home

জাপানি পড়ুয়ার সঙ্গে যোগীর সেলফি, লখনউয়ে নতুন কূটনীতির বার্তা

Spread the love

নয়াদিল্লি: রাজনীতিতে অনেক সময় একটি ছবি, বহু বক্তব্যের চেয়েও বেশি কিছু বলে দিতে পারে। মঞ্চ, মাইক্রোফোন, স্মারকলিপি বা চুক্তির নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত হাসি, কোনও পড়ুয়ার সেলফি এবং মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে কাটানো একটি মুহূর্ত সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দিতে পারে।

লখনউয়ে আজ এমনই একটি দৃশ্য দেখা গেল। জাপানের ইয়ামানাশি প্রিফেকচারের এক পড়ুয়া উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের (Yogi Adityanath) সঙ্গে সেলফি তুললেন। যোগীও হাসিমুখে সেই মুহূর্তে অংশ নিলেন। সেখানে আনুষ্ঠানিকতার চাপ ছিল না, ছিল না ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত দূরত্বের অনুভূতিও।

পিছনে ছিল ভারতের তেরঙ্গা। দেওয়ালে জাতীয় নেতাদের প্রতিকৃতি এবং কেন্দ্রে ছিল বিশ্বাসের প্রতীক ‘শ্রী রাম’। আর তার সামনে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক জাপানি পড়ুয়া। এটি শুধু একটি ছবি ছিল না। বরং নতুন ধরনের কূটনীতির একটি ছোট্ট প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠল সেই মুহূর্ত।

জাপানের ইয়ামানাশি থেকে লখনউয়ে প্রতিনিধি দল

জাপানের ইয়ামানাশি প্রিফেকচারের গভর্নর কোতারো নাগাসাকির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল লখনউয়ে পৌঁছেছে। প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ছিলেন জাপানি পড়ুয়ারাও। অন্যদিকে লখনউয়ের পড়ুয়ারাও এই পারস্পরিক আলোচনায় অংশ নেন। এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল না। পড়ুয়াদের মধ্যে যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করাও ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। জাপানের কথা উঠলে সাধারণত ঘড়ির কাঁটার মতো সময়নিষ্ঠা, শৃঙ্খলাবদ্ধ শিল্প এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার ছবি সামনে আসে।

অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশ মানেই অযোধ্যা, ভগবান রামের শহর; বুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত সারনাথ; সময়ের সাক্ষী কাশী এবং তাজমহলের সৌন্দর্য। দুই জায়গার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। কিন্তু ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও যেন লুকিয়ে রয়েছে সেই পার্থক্যের মধ্যেই। জাপান উত্তরপ্রদেশকে দিতে পারে শৃঙ্খলা ও প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা। আর উত্তরপ্রদেশ জাপানের সামনে তুলে ধরতে পারে ভারতের সভ্যতার উষ্ণতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য।

ইয়ামানাশি-উত্তরপ্রদেশ সম্পর্ক নতুন নয়

উত্তরপ্রদেশ ও ইয়ামানাশির সম্পর্ক কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। ইতিমধ্যেই শিল্প, পর্যটন, বৃত্তিমূলক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং গ্রিন হাইড্রোজেনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। জাপান সফরের সময় যোগী আদিত্যনাথের সঙ্গেও দক্ষতা উন্নয়ন এবং কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়াদের প্রশিক্ষণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।  অর্থাৎ, লখনউয়ের এই সেলফির পিছনে ইতিমধ্যেই তৈরি হওয়া একটি প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের ভিত্তি রয়েছে।

কূটনীতির নতুন মাপকাঠি কি সেলফি?

একসময় দুই দেশের ঘনিষ্ঠতা বোঝার মাপকাঠি ছিল কূটনীতিকদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক। আজ সেই তালিকায় একটি সেলফিও জায়গা করে নিয়েছে। আগে নথিতে স্বাক্ষর হত, তারপর ছবি তোলা হত। এখন অনেক সময় ছবিই প্রথমে মানুষের কৌতূহল তৈরি করে। কে তাঁরা? কোথা থেকে এসেছেন? কেন দেখা করলেন? কী নিয়ে আলোচনা হল? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি ছবি মুহূর্তের মধ্যেই এই প্রশ্নগুলি সামনে নিয়ে আসে। কূটনীতির পুরনো সংজ্ঞায় মন্ত্রী, সরকারি আধিকারিক এবং দোভাষীরা ছিলেন মুখ্য চরিত্র। নতুন সংজ্ঞায় সেখানে পড়ুয়ারাও রয়েছেন। রয়েছে ক্যামেরা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অবশ্যই একটি ছবি।

যোগীর জনপরিচয়ের অন্য দিক

যোগী আদিত্যনাথের জনপরিচয়ের সঙ্গে সাধারণত শৃঙ্খলা, প্রশাসন এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভাবমূর্তি যুক্ত। গেরুয়া পোশাক, দৃঢ় কণ্ঠস্বর এবং সক্রিয় প্রশাসনিক ভূমিকা তাঁর পরিচিত রাজনৈতিক ভাবমূর্তি। কিন্তু এই ছবিতে তাঁর অন্য একটি দিকও দেখা গেল। পড়ুয়াদের উৎসাহের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করা এবং একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠককে স্বতঃস্ফূর্ত মানবিক মুহূর্তে পরিণত করার সুযোগ দেওয়া।

জনজীবনে মানুষের কাছে পৌঁছনোর এই অনুভূতিও রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশেষ করে এমন একটি প্রজন্মের ক্ষেত্রে, যারা বক্তৃতার আগে ছবি দেখে, খবর পড়ার আগে ভিডিও শেয়ার করে এবং দূরত্বের বদলে কথোপকথনের মাধ্যমে নেতৃত্বকে বুঝতে চায়। সেলফি তাই আধুনিক সময়ে অভিবাদনেরও একটি নতুন রূপ হয়ে উঠেছে।

জাপানি পড়ুয়াদের কাছে উত্তরপ্রদেশের নতুন অভিজ্ঞতা

এই ছবি জাপানি পড়ুয়াদের জন্যও একটি স্মৃতি হয়ে থাকবে। উত্তরপ্রদেশের জন্যও এটি একটি বার্তা বহন করে যে, রাজ্যটি শুধু প্রাচীন গৌরবের জায়গা নয়, বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগেরও একটি অংশ। হয়তো এই পড়ুয়ারা এতদিন বইয়ের পাতায় তাজমহল সম্পর্কে পড়েছেন। এবার তাঁরা সেই মার্বেলের স্মৃতিসৌধের সামনে দাঁড়াচ্ছেন।

অযোধ্যা তাঁদের কাছে হয়তো এতদিন রামায়ণের একটি নাম ছিল। এখন সেটি তাঁদের কাছে বাস্তব ভূগোল। তারপর রয়েছে কাশী, যেখানে সময় থেমে নেই, বরং হাজার হাজার বছর ধরে প্রবাহিত হচ্ছে। রয়েছে সারনাথ, যেখানে বুদ্ধ প্রথমবার করুণার বাণী প্রচার করেছিলেন। সম্ভবত কূটনীতির প্রকৃত শ্রেণিকক্ষ তখনই শুরু হয়, যখন মানচিত্রে দেখা একটি দেশ মানুষের চোখের সামনে বাস্তব হয়ে ওঠে।

শুধু সেলফিতে সম্পর্ক তৈরি হয় না

তবে শুধুমাত্র ছবি দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক তৈরি করা যায় না। একটি হাসি স্বাগত জানাতে পারে, কিন্তু সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে প্রতিষ্ঠান। পড়ুয়া বিনিময় তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সঙ্গে থাকবে ভাষা শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, বৃত্তি, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, গবেষণা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগ। উত্তরপ্রদেশের তরুণদের সামনে দক্ষতা, উচ্চশিক্ষা এবং কর্মসংস্থান নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অন্যদিকে জাপানের রয়েছে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, শিল্পক্ষেত্রে শৃঙ্খলা এবং প্রশিক্ষণের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।

ইয়ামানাশি ও উত্তরপ্রদেশের সম্পর্ক যদি এই ক্ষেত্রগুলিতে বাস্তব ফলাফল তৈরি করতে পারে, তাহলে লখনউয়ে তোলা এই সেলফি আর শুধুমাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি মুহূর্ত হয়ে থাকবে না। ভবিষ্যতে এটি হয়তো আরও বড় একটি অংশীদারিত্বের প্রথম ছবি হিসেবে দেখা হতে পারে।

আর সেই কারণেই লখনউয়ের এই ছবিটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রোটোকল আছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকতার ভার নেই। ক্ষমতা আছে, কিন্তু দূরত্ব নেই। রয়েছে ভারত, জাপান এবং সবচেয়ে বড় কথা, ভবিষ্যৎ।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *