M777 থেকে K9, ভারতের আর্টিলারিতেও কেন বাড়ছে চাকা-চালিত কামানের গুরুত্ব - 24 Ghanta Bangla News
Home

M777 থেকে K9, ভারতের আর্টিলারিতেও কেন বাড়ছে চাকা-চালিত কামানের গুরুত্ব

Spread the love

কলকাতা: মার্কিন সেনাবাহিনী তাদের আর্টিলারি (Indian Artillery) আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের এম৭৭৭ টোড হাউইৎজার-এর বিকল্প হিসেবে আরও দ্রুত মোতায়েনযোগ্য ও দীর্ঘপাল্লার চাকা-চালিত কামান ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে দক্ষিণ কোরিয়ার হানওয়া ডিফেন্স ইউএসএ-কে মোবাইল ট্যাকটিক্যাল ক্যানন বা এমটিসি কর্মসূচির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে।

এই কর্মসূচির আওতায় হানওয়া সর্বোচ্চ ১৮টি প্রোটোটাইপ সরবরাহ করবে। আগামী চার বছর ধরে সেগুলির পরীক্ষা ও সেনা-পর্যায়ের ট্রায়াল চালানো হবে। এর লক্ষ্য হল, ভবিষ্যতে মার্কিন সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের ব্যবহৃত এম৭৭৭-এর জায়গায় আরও মোবাইল ও দীর্ঘপাল্লার কামান আনা সম্ভব কি না, তা যাচাই করা।

এই খবর ভারতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারতীয় সেনাবাহিনীও এম৭৭৭ ব্যবহার করে এবং একই সঙ্গে নিজস্ব আর্টিলারি ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে আরও মোবাইল, দীর্ঘপাল্লার ও নির্ভুল করার দিকে এগোচ্ছে।

এম৭৭৭ থেকে K9: কেন বদলের কথা ভাবছে আমেরিকা?

এম৭৭৭ একটি আল্ট্রা-লাইট টোড হাউইৎজার। এর বড় সুবিধা হল কম ওজন এবং তুলনামূলক সহজে বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন করার ক্ষমতা। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে আর্টিলারি ইউনিটকে শুধু গুলি চালাতে পারলেই হচ্ছে না। শত্রুর ড্রোন, কাউন্টার-ব্যাটারি রাডার এবং দীর্ঘপাল্লার অস্ত্রের হাত থেকে বাঁচতে দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই জায়গাতেই চাকা-চালিত স্বয়ংচালিত কামান বা হুইলড সেলফ-প্রপেলড হাউইৎজার আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

হানওয়ার K9 মোবাইল হাউইৎজার মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার বহুল ব্যবহৃত ট্র্যাকড K9-এর প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি। ট্র্যাকড K9 ইতিমধ্যেই দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, পোল্যান্ডসহ একাধিক দেশের সেনাবাহিনীতে ব্যবহৃত হচ্ছে। K9 পরিবারের কামানে রয়েছে ৫২-ক্যালিবার ১৫৫ মিমি কামান। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট গোলাবারুদের ক্ষেত্রে এর পাল্লা প্রায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে, যা এম৭৭৭-এর তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

তবে ট্র্যাকড এবং হুইলড সিস্টেমের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে। চাকা-চালিত কামান সাধারণত সড়কপথে দ্রুত চলাচল এবং দ্রুত মোতায়েনের ক্ষেত্রে সুবিধা দেয়। অন্যদিকে, অত্যন্ত দুর্গম ও অফ-রোড এলাকায় ট্র্যাকড প্ল্যাটফর্ম বেশি কার্যকর এবং তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষা দিতে পারে।

kargil-to-operation-sindoor-indian-artillery-firepower-future-war

ভারতের জন্য এই পরিবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। ভারতের ফিল্ড আর্টিলারি র‍্যাশনালাইজেশন প্ল্যান-এর লক্ষ্য পুরনো ১০৫ মিমি ফিল্ড গানগুলির জায়গায় ধীরে ধীরে আধুনিক ১৫৫ মিমি কামান আনা।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে দেশীয় অ্যাডভান্সড টোড আর্টিলারি গান সিস্টেম বা এটিএজিএস, ধনুষ এবং পিনাকা-র মতো ব্যবস্থা। অর্থাৎ ভারত শুধু পুরনো কামানের জায়গায় নতুন কামান বসাচ্ছে না। আর্টিলারির পুরো কাঠামোকেই দীর্ঘপাল্লা, নির্ভুলতা, গতিশীলতা এবং দ্রুত মোতায়েনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।

K9 বজ্র: ভারতের জন্য ইতিমধ্যেই প্রমাণিত প্ল্যাটফর্ম

এই ক্ষেত্রে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হল K9 বজ্র-টি। এটি হানওয়ার K9-এর ভারতীয় সংস্করণ। ভারতে উৎপাদনের সময় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। লাদাখের মতো উচ্চ উচ্চতার অঞ্চলেও K9 বজ্র-টির ব্যবহারিক সক্ষমতা পরীক্ষিত হয়েছে।

এখানেই ভারতের সঙ্গে মার্কিন সেনাবাহিনীর বর্তমান পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে। মার্কিন সেনা এখন K9-এর চাকা-চালিত সংস্করণ পরীক্ষা করতে চলেছে। ভারত ইতিমধ্যেই K9-এর ট্র্যাকড সংস্করণ ব্যবহার করছে এবং একই সঙ্গে আরও মোবাইল আর্টিলারি ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে।

এটিএজিএস-এর চাকা-চালিত সংস্করণও আসছে

ভারতের আর্টিলারি আধুনিকীকরণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এটিএজিএস-এর মোবাইল বা চাকা-চালিত সংস্করণ নিয়ে কাজ। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সব পরিস্থিতির জন্য একই ধরনের কামান প্রয়োজন নয়।

কোথাও টোড আর্টিলারি কার্যকর হতে পারে। কোথাও ট্র্যাকড সেলফ-প্রপেলড কামান বেশি উপযোগী। আবার দীর্ঘ সড়ক যোগাযোগ এবং দ্রুত অবস্থান পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে চাকা-চালিত সেলফ-প্রপেলড কামান বেশি কার্যকর হতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের ভারতীয় আর্টিলারিতে একটি মিশ্র কাঠামো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বেসরকারি সংস্থাও এগিয়ে এসেছে

ভারতের আর্টিলারি আধুনিকীকরণ এখন শুধু সরকারি সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কাল্যাণী গোষ্ঠীর ভারত-৫২ এবং মার্গ-৩৯-এর মতো কামান প্রকল্পের পাশাপাশি টাটা এবং এলঅ্যান্ডটির মতো সংস্থাও এই ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে।

এর ফলে ভারতীয় আর্টিলারি ইকোসিস্টেমে সরকারি ও বেসরকারি শিল্পের মধ্যে একটি নতুন সমন্বয় তৈরি হচ্ছে।এর দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব রয়েছে। কারণ আধুনিক যুদ্ধের জন্য শুধু কামান তৈরি করলেই হবে না। গোলাবারুদ, ফায়ার কন্ট্রোল, সেন্সর, যোগাযোগ ব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতাও একই সঙ্গে তৈরি করতে হয়।

কেন চাকা-চালিত কামানের গুরুত্ব বাড়ছে?

আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে একটি আর্টিলারি ইউনিটের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার ফায়ারপাওয়ার নয়, বেঁচে থাকার ক্ষমতা। একটি কামান কোনও অবস্থান থেকে গোলাবর্ষণ করার পর যদি শত্রুর ড্রোন বা কাউন্টার-ব্যাটারি রাডার তার অবস্থান শনাক্ত করে ফেলে, তাহলে দ্রুত জায়গা পরিবর্তন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চাকা-চালিত সেলফ-প্রপেলড কামান এই জায়গায় সুবিধা দিতে পারে। একই সঙ্গে এগুলি টোড কামানের তুলনায় দ্রুত ফায়ারিং পজিশনে পৌঁছতে এবং সেখান থেকে সরে যেতে পারে। ফলে শুট-অ্যান্ড-স্কুট ধরনের অপারেশন আরও কার্যকর করা সম্ভব হয়।

তবে ট্র্যাকড কামানকে বাদ দেওয়া যাবে না

এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে সব আর্টিলারি চাকা-চালিত হয়ে যাবে। ভারতের মতো দেশের জন্য ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। মরুভূমি, সমতল এলাকা থেকে শুরু করে হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় সেনাকে কাজ করতে হয়। কঠিন অফ-রোড ভূখণ্ডে ট্র্যাকড প্ল্যাটফর্মের সুবিধা রয়েছে। K9 বজ্রের মতো সিস্টেম সেই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, তুলনামূলক ভালো সড়ক যোগাযোগ থাকা থিয়েটারে চাকা-চালিত কামান দ্রুত মোতায়েনের ক্ষেত্রে বড় সুবিধা দিতে পারে। তাই ভারতের জন্য ভবিষ্যতের পথ সম্ভবত টোড, ট্র্যাকড এবং হুইলড আর্টিলারির সমন্বিত ব্যবহার

আমেরিকার সিদ্ধান্ত ভারতের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনীও এখন আর্টিলারির ক্ষেত্রে মোবিলিটি, রেঞ্জ এবং সার্ভাইভেবিলিটি-কে একসঙ্গে দেখছে।  ভারতও একই দিকে এগোচ্ছে।

একদিকে রয়েছে এম৭৭৭-এর মতো হালকা টোড কামান, অন্যদিকে K9 বজ্রের মতো ট্র্যাকড সেলফ-প্রপেলড কামান। এর সঙ্গে এটিএজিএস, ধনুষ এবং পিনাকার মতো দেশীয় ব্যবস্থা যুক্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে চাকা-চালিত ১৫৫ মিমি কামানের সংখ্যা বাড়লে ভারতীয় আর্টিলারির দ্রুত মোতায়েন এবং গভীর ফায়ারপাওয়ার আরও শক্তিশালী হতে পারে।

কার্গিলের পাহাড়ি যুদ্ধ থেকে লাদাখের উচ্চভূমি, এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে আধুনিক ড্রোন-নির্ভর যুদ্ধক্ষেত্র, সব জায়গাতেই একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে: আর্টিলারিকে শুধু শক্তিশালী হলেই হবে না, তাকে দ্রুত চলতে, দ্রুত আঘাত করতে এবং দ্রুত অবস্থান বদলাতে হবে।

মার্কিন সেনাবাহিনীর K9 মোবাইল হাউইৎজার পরীক্ষা তাই শুধু আমেরিকার আর্টিলারি আধুনিকীকরণের ঘটনা নয়। ভারতের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত যে ভবিষ্যতের ১৫৫ মিমি আর্টিলারি যুদ্ধ ক্রমশ আরও মোবাইল, দীর্ঘপাল্লার এবং নেটওয়ার্ক-নির্ভর হয়ে উঠবে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *