সাধের নীল গ্রহটি নির্জলা হওয়ার পথে ধাবমান?
জল-সংক্রান্ত এই ভারসাম্যহীনতা গ্রামীণ দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণও বটে। যখন কৃষকরা তাদের জমিতে পর্যাপ্ত জল পায় না, চাষবাস অলাভজনক হয়ে পড়ে এবং তারা বাধ্য হয় ঋণের জালে জড়িয়ে পড়তে। এই ঋণের বোঝা আর চাষের জমিতে জলের হাহাকার শেষ পর্যন্ত তাদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করে, যাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘ডিসট্রেস মাইগ্রেশন’ বা ‘অভাবজনিত অভিবাসন’। সমগ্র ভারতেই এই অভিবাসনের এক ভয়াবহ ছবি। মহারাষ্ট্রের বিদর্ভ ও মারাঠওয়াড়া অঞ্চলে জলের অভাবে চাষ করতে না পেরে প্রতি বছর হাজার হাজার কৃষক পরিবার আখ কাটার শ্রমিক হিসেবে যাযাবরের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হয়। একই ভাবে, ওডিশার কালাহান্ডি-বোলাঙ্গির-কোরাপুট অঞ্চলের আদিবাসী কৃষকরা চরম জলকষ্টে
চাষবাস ছেড়ে ভিনরাজ্যের ইটভাটায় ‘দাদন’ খাটতে চলে যায়। একই করুণ ছবি মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলেও। রাজস্থানের চিত্রটি আরও ভয়াবহ, মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৪.৭ শতাংশ মানুষ আজ এই ধরনের অভিবাসনের শিকার।
অভাবজনিত অভিবাসনের এই ক্ষত গ্রামীণ সমাজে এক গভীর সামাজিক ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য তৈরি করেছে। জীবিকার টানে পুরুষরা যখন ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে পাড়ি দেয়, সংসারের পুরো বোঝা এসে পড়ে ঘরের মহিলাদের ওপর। কিন্তু পানীয় জলের খোঁজে প্রতি দিন মাইলের পর মাইল হাঁটতে গিয়েই মহিলাদের দিনের বেশির ভাগ সময় চলে যায়। এতে যেমন তাদের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে, বাচ্চাদের লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এই জলসঙ্কট শুধু পরিবেশগত সমস্যায় আটকে থাকে না, পুরো গ্রামের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তোলে। রাজস্থানের উদয়পুর জেলার বার্কি গ্রামের মানুষ এক সময় তীব্র গরমে গবাদি পশু নিয়ে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হতেন, কারণ সেখানে এক ফোঁটাও পানীয় জল অবশিষ্ট থাকত না। জলের জন্য নিজ ভূমে ‘শরণার্থী’ হওয়ার এই বিপর্যয় রুখতে হলে প্রথাগত কাঠামোর বাইরে গিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের উপযোগী এক নতুন জল-মডেল গড়ে তোলা ভীষণ জরুরি।