আলোর টানে সমুদ্রের বদলে রাস্তায়, ফ্লোরিডায় কৃত্রিম আলোয় প্রাণ গেল ৫৫টি সদ্যোজাত কচ্ছপের

সমুদ্রের দিকে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। কিন্তু তারা চলে গেল রাস্তায়। আর সেখানেই প্রাণ গেল ৫৫টি সদ্যোজাত সামুদ্রিক কচ্ছপের। ঘটনাটি ঘটেছে আমেরিকার ফ্লোরিডার আন্না মারিয়া আইল্যান্ডে। গবেষক ও সংরক্ষণকর্মীদের মতে, এই মর্মান্তিক ঘটনার পিছনে ছিল কৃত্রিম আলো।

প্রশ্ন হলো, সমুদ্রে যেতে গিয়ে কচ্ছপগুলি রাস্তার দিকে গেল কেন? আসলে সদ্য ডিম ফুটে বেরনো কচ্ছপের সামনে তখন একটাই কাজ — যত দ্রুত সম্ভব সমুদ্রে পৌঁছনো। রাতে বালির তলা থেকে বেরিয়ে তারা স্বাভাবিক ভাবে উজ্জ্বল দিক অনুসরণ করে। প্রাকৃতিক পরিবেশে সেই দিকটি সাধারণত সমুদ্রের দিকের খোলা আকাশ হয়ে থাকে।

কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন সৈকতের কাছাকাছি বাড়িঘর ও রাস্তার আলো থাকে। বারান্দার আলো, বাড়ির আলো কিংবা রাস্তার আলো তাদের কাছে খুব উজ্জ্বল মনে হতে পারে। ফলে ছোট কচ্ছপগুলি দিক ভুলে সমুদ্রের দিকে না গিয়ে রাস্তার দিকে হাঁটতে থাকে। এই ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছিল বলে মনে করছেন প্রাণী বিশেষজ্ঞরা। সমুদ্রের বদলে তারা স্থলভাগের দিকে এগিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত পৌঁছে যায় ব্যস্ত রাস্তায়।

ভাবুন তো, কয়েক ঘণ্টা আগেই ডিম ফুটে বেরিয়েছে তারা। শরীর ছোট। শক্তিও খুব কম। তার উপর যদি ভুল পথে অনেকটা দূর হাঁটতে হয়, বিপদ তখন বাড়ে। বিজ্ঞানীরা জানান, বেশি সময় ধরে বালিতে বা রাস্তায় পড়ে থাকলে ক্লান্তি ও জলশূন্যতায় তাদের মারা যাওয়াটাই স্বাভাবিক। এই ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।

আন্না মারিয়া আইল্যান্ডের সংরক্ষণকর্মী ক্রিস্টেন মাজ্জারেলা জানিয়েছেন, তাঁর ২৮ বছরের কাজের অভিজ্ঞতায় এক জায়গায় এতগুলি মৃত কচ্ছপ একসঙ্গে দেখেননি। খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে যান তিনি ও তাঁর দল। সেখান থেকে বেশ কয়েকটি মৃত কচ্ছপ উদ্ধার করা হয় বলেও জানান তিনি।

এটি অবশ্য এক দিনের সমস্যা নয়। ফ্লোরিডা ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ কনজ়ারভেশন কমিশন বা FWC-এর মতে, কৃত্রিম আলোর কারণে প্রতি বছর ফ্লোরিডায় হাজার হাজার সামুদ্রিক কচ্ছপের বাচ্ছা পথ হারায়।

তা হলে সমাধান কী? খুব সহজ কিছু পদক্ষেপেই অনেকটা বিপদ কমানো যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সৈকত থেকে দেখা যায় এমন অপ্রয়োজনীয় আলো রাতে বন্ধ রাখা যেতে পারে। বাড়ির জানলার পর্দা টেনে দেওয়া যায়। যে আলো নিরাপত্তার কারণে জ্বালাতেই হবে, সেটিকে নীচের দিকে মুখ করে এবং ঢেকে রাখা যায়।

আলোর রংও গুরুত্বপূর্ণ। FWC-এর পরামর্শ হলো, সৈকতের কাছে আলো প্রয়োজন হলে কম উজ্জ্বলতার কমলা বা লাল রঙের আলো ব্যবহার করা যেতে পারে। আলো যতটা সম্ভব নীচুতে রাখা এবং এমন ভাবে ঢেকে দেওয়া উচিত, যাতে সরাসরি সৈকত থেকে দেখা না যায়। এই তিনটি বিষয়কে FWC বলছে—Low, Long এবং Shielded।

আলো মানুষের কাছে হয়তো সামান্য ব্যাপার। কিন্তু সদ্য জন্মানো একটি কচ্ছপের কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে জীবন-মৃত্যুর পার্থক্য। সমুদ্রের দিকে যাওয়ার সহজ পথটুকু যেন তারা খুঁজে পায়, তার জন্য সৈকতকে অন্ধকার রাখাই সবচেয়ে জরুরি। কারণ কখনও কখনও আলো কমানোই বন্যপ্রাণকে বাঁচানোর সবচেয়ে বড় উপায় বলে মনে করেন সংরক্ষণকর্মীরা।