ট্রাম্পের নতুন H-1B Visa নীতিতে ভারতীয়দের বাড়ছে খরচ, ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা
ওয়াশিংটন: ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একের পর এক নীতি পরিবর্তনের ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাজের জন্য ভারতীয় পেশাজীবীদের অন্যতম প্রধান পথ এইচ-১বি ভিসা (H-1B Visa) আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। আবেদন ফি বৃদ্ধি, উচ্চ বেতনের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার, গ্রিন কার্ডের দীর্ঘ অপেক্ষা এবং চাকরি হারালে ভিসা ধরে রাখার ঝুঁকি, সব মিলিয়ে ভারতীয় আবেদনকারীদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ভারতীয়দের জন্য এইচ-১বি ভিসার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্থিক পরিষেবা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং গবেষণার মতো ক্ষেত্রে ভারতীয় পেশাজীবীদের চাহিদা এখনও যথেষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশেষ দক্ষতা, নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপ এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন পরিকল্পনা।
এইচ-১বি ভিসায় কী কী বদলেছে?
গত এক বছরে এইচ-১বি ব্যবস্থায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ আবেদন ফি, নতুন ধরনের বাছাই ব্যবস্থা এবং চাকরি হারানোর পর ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড নিয়ে পরিবর্তনের সম্ভাবনা। ইমিগ্রেশন সংস্থা বাউন্ডলেস ইমিগ্রেশনের সিইও জিয়াও ওয়াং-এর মতে, এই পরিবর্তনগুলি একসঙ্গে ভারতীয় পেশাজীবীদের জন্য অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
১. ১ লক্ষ ডলারের অতিরিক্ত ফি
এইচ-১বি ভিসার ক্ষেত্রে ১ লক্ষ ডলারের অতিরিক্ত ফি নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একটি মার্কিন আদালত সম্প্রতি এই ফি বাতিল করলেও ট্রাম্প প্রশাসন সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারে। বাউন্ডলেসের মতে, এই ফি ভারত থেকে সরাসরি কর্মী পাঠানো সংস্থাগুলির ওপর বিশেষ চাপ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যেসব ভারতীয় আইটি সংস্থার ব্যবসায়িক মডেলের বড় অংশই ভারতে কর্মী নিয়োগ করে তাঁদের আমেরিকায় পাঠানোর ওপর নির্ভরশীল, তারা বেশি প্রভাবিত হতে পারে।
ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর আমেরিকান পলিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবর্ষে নতুন এইচ-১বি অনুমোদনের ক্ষেত্রে শীর্ষ চার নিয়োগকর্তা ছিল অ্যামাজন, মেটা, মাইক্রোসফট এবং গুগল। ঐতিহ্যগতভাবে শীর্ষে থাকা ভারতীয় আইটি সংস্থাগুলির অবস্থান পিছিয়েছে।
২. বেতনের ভিত্তিতে বাছাই
আরও একটি বড় পরিবর্তন হল এইচ-১বি লটারিতে উচ্চ বেতনের চাকরিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। ২০২৬ সালের মার্চের ক্যাপ সিজনে নতুন নিয়ম অনুযায়ী উচ্চ বেতন ও বেশি দক্ষতার পদগুলির প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে সুবিধা পেয়েছেন। বাউন্ডলেসের ক্লায়েন্ট তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় স্তরের অর্থাৎ সিনিয়র কর্মীদের নির্বাচনের হার ছিল ৬৮ শতাংশ। বিপরীতে প্রথম স্তরের অর্থাৎ এন্ট্রি-লেভেল প্রার্থীদের নির্বাচনের হার ছিল ৪০ শতাংশ।
এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করে প্রথম চাকরিতে ঢুকতে চাওয়া ভারতীয় তরুণ পেশাজীবীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন। ইমিগ্রেশন আইন সংস্থা ফ্র্যাগোমেনের পার্টনার কে এডওয়ার্ড র্যালির মতে, নতুন ব্যবস্থা উচ্চ বেতন ও উচ্চ দক্ষতার পদকে বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে অত্যন্ত দক্ষ পেশাজীবীদের সুবিধা হলেও অন্যদের জন্য প্রক্রিয়াটি কঠিন হতে পারে।
৩. গ্রিন কার্ড পাওয়ার পথও কঠিন
এইচ-১বি ভিসা পাওয়ার পরও ভারতীয়দের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা থেকে যাচ্ছে গ্রিন কার্ডের অপেক্ষা। ২০২৬ অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক পর্যন্ত মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়দের জন্য ইবি-২ বিভাগে প্রায় ৩.৫১ লক্ষ এবং ইবি-৩ বিভাগে প্রায় ১.০৫ লক্ষ আবেদন অপেক্ষমাণ ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান হারে নতুন করে আবেদন করলে ভারতীয়দের ইবি-২ গ্রিন কার্ডের অপেক্ষা কয়েক দশক পর্যন্ত গড়াতে পারে। এই কারণে অনেক ভারতীয় পেশাজীবী বহু বছর এইচ-১বি অবস্থায় থেকে যান। ফলে চাকরি হারানোর মতো ঘটনা তাঁদের জন্য শুধু কর্মসংস্থানের সমস্যা নয়, অভিবাসন-সংক্রান্ত বড় ঝুঁকিও তৈরি করে।
চাকরি হারালে ৬০ দিনের সময়ও অনিশ্চিত
বর্তমানে এইচ-১বি ভিসাধারী কোনও কর্মী চাকরি হারালে সাধারণত নতুন স্পনসর খোঁজা, স্ট্যাটাস পরিবর্তন বা দেশ ছাড়ার প্রস্তুতির জন্য ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড পান। তবে এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি। প্রস্তাবটি এখনও আইনে পরিণত হয়নি।
যদি এটি কার্যকর হয়, তাহলে চাকরি হারানোর পর নতুন নিয়োগকর্তা খুঁজে পাওয়ার জন্য ভারতীয় পেশাজীবীদের হাতে আরও কম সময় থাকতে পারে। ফ্র্যাগোমেনের কে এডওয়ার্ড র্যালি বলেছেন, বর্তমান শ্রমবাজারে ছাঁটাই এবং এআই-নির্ভর পুনর্গঠন চলছে। ফলে এইচ-১বি কর্মীর চাকরি চলে গেলে তিনি একই সঙ্গে চাকরি হারানো এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হন।
এইচ-১বি নবীকরণ এখনও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল
তবে সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি খারাপ নয়। বাউন্ডলেসের উদ্ধৃত এনএফএপি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবর্ষে একই নিয়োগকর্তার অধীনে এইচ-১বি কর্মসংস্থান চালিয়ে যাওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যানের হার ছিল মাত্র ১.৯ শতাংশ। ২০২৪ অর্থবর্ষে এই হার ছিল ১.৮ শতাংশ। অর্থাৎ ইতিমধ্যেই এইচ-১বি ভিসায় থাকা এবং একই সংস্থায় কাজ চালিয়ে যাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি এখনও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। তবে চাকরি পরিবর্তন বা ছাঁটাই হলে ঝুঁকি অনেক বেশি।
ভারতীয়দের জন্য চাহিদা এখনও রয়েছে
এইচ-১বি ভিসার নিয়ম কঠিন হলেও আমেরিকায় দক্ষ কর্মীর চাহিদা কমেনি। গত এইচ-১বি রেজিস্ট্রেশন চক্রে প্রায় ৪.৪২ লক্ষ অনন্য আবেদনকারী ৮৫,০০০টি নির্ধারিত স্লটের জন্য প্রতিযোগিতা করেছিলেন। অর্থাৎ চাহিদা এখনও অনুমোদিত সংখ্যার তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ। তবে ভারতীয় প্রযুক্তিবিদদের গন্তব্যের ক্ষেত্রে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কানাডা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া এবং জার্মানি এখন অনেক ভারতীয় পেশাজীবীর কাছে বিকল্প হিসেবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। বাউন্ডলেসের মতে, মার্কিন সংস্থাগুলি এইচ-১বি কর্মী নেওয়ার সুযোগ না পেলে বিদেশে নিজেদের শাখা তৈরি করে সেখানে কর্মী নিয়োগ করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
কোন পেশাজীবীরা তুলনামূলকভাবে সুবিধায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ চাহিদার ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতা থাকা পেশাজীবীদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং এবং অন্যান্য উচ্চ দক্ষতার প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের আগ্রহ এখনও রয়েছে। গ্র্যান্ট থর্নটন ভারতের আখিল চন্দনার মতে, এইচ-১বি পাওয়া এবং চাকরি ধরে রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ দক্ষতা, ক্যারিয়ারের অগ্রগতি, নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপ কৌশল এবং আগেভাগে অভিবাসন পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। তিনি পেশাজীবীদের নিয়মিত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের বিশেষজ্ঞতার প্রমাণ এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সঠিকভাবে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
ভারতীয়দের জন্য বাস্তব চিত্র কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এইচ-১বি এখনও ভারতীয় পেশাজীবীদের জন্য আমেরিকায় কাজ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। কিন্তু এখন এটিকে দ্রুত গ্রিন কার্ড পাওয়ার রাস্তা হিসেবে দেখা ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমান পরিস্থিতিতে একজন ভারতীয় পেশাজীবীকে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে:
- উচ্চ চাহিদার বিশেষ দক্ষতা তৈরি করা
- উচ্চ বেতনের পদে পৌঁছনোর জন্য ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করা
- নিয়োগকর্তার স্পনসরশিপের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি বোঝা
- চাকরি হারালে বিকল্প পরিকল্পনা রাখা
- ও-১, ইবি-১এ বা ইবি-২ এনআইডব্লিউ-এর মতো বিকল্প পথ সম্পর্কে আগেভাগে জানা
- গ্রিন কার্ডের দীর্ঘ অপেক্ষাকে ক্যারিয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা
- প্রয়োজনে কানাডা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া বা জার্মানির মতো বিকল্প গন্তব্য বিবেচনা করা
সুতরাং, এইচ-১বি ভিসার স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়নি, কিন্তু আগের মতো সরলও নেই। ভারতীয়দের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ভিসা পাওয়া নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে চাকরি, স্পনসরশিপ এবং স্থায়ী বসবাসের পরিকল্পনাকে একসঙ্গে সামলানো।
Also Read | পরের স্টেশন মোহনবাগান! মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেট্রোর মানচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব
Also Read | কংগ্রেসের কারণে কলকাতা ছাড়েন তসলিমা! বিস্ফোরক তৎকালীন শরিক সিপিএম নেতা
Also Read | IRCTC-এর ৯ দিনের তীর্থযাত্রা ট্রেন: জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে দ্বারকা-অক্ষরধাম, ভাড়া ও রুট জানুন
Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের