বালিশ বদলানোর সময় হয়েছে? ঘাড়ের সাপোর্ট কমার ৬ লক্ষণ জানুন
কলকাতা: বালিশ (Pillow) দেখতে ঠিকঠাক থাকলেও বছরের পর বছর ব্যবহারের ফলে তার ভিতরের উপাদানের গঠন বদলে যেতে পারে। ফলে আগের মতো ঘাড় ও মেরুদণ্ডকে সঠিকভাবে সাপোর্ট নাও দিতে পারে বালিশ। বালিশ চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া, অসমান হয়ে যাওয়া বা চাপ দেওয়ার পর আগের আকারে ফিরে না আসা, এগুলি হতে পারে বালিশ বদলানোর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের বালিশে ত্বকের মৃত কোষ, আর্দ্রতা, ধুলোর মাইট এবং বিভিন্ন অ্যালার্জেন জমতে পারে। এর প্রভাব ঘুমের মানের উপরও পড়তে পারে। তবে প্রত্যেক বালিশ এক বা দুই বছর পরেই বদলাতে হবে, এমন কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসাবিধি নেই। বালিশের অবস্থা এবং তার উপাদানের উপরেই মূলত নির্ভর করে কখন সেটি বদলানো প্রয়োজন।
বালিশ চ্যাপ্টা হলে ঘাড়ের অবস্থান বদলে যেতে পারে
নিয়মিত ব্যবহারে বালিশের ভিতরের উপাদান ধীরে ধীরে তার স্থিতিস্থাপকতা হারাতে পারে। চিকিৎসক ডা. মিহির থানভির মতে, এক থেকে দুই বছর নিয়মিত ব্যবহারের পর বালিশের মূল উপাদানে কাঠামোগত ক্লান্তি এবং স্থিতিস্থাপকতার পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এর ফলে বালিশ স্থায়ীভাবে আগের উচ্চতা ও নমনীয়তা হারাতে পারে।
Also Read | একই পটলের তরকারিতে বিরক্ত? বাড়িতেই সহজে বানান সুস্বাদু পনিরের দোলমা
চ্যাপ্টা বা অসমান বালিশ ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁককে ঠিকভাবে ধরে রাখতে না পারলে ঘাড়ের মেরুদণ্ড স্বাভাবিক অবস্থান থেকে কিছুটা সরে যেতে পারে। এর ফলে ঘাড়ের জোড়, মেরুদণ্ডের মাঝের ডিস্ক এবং আশপাশের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে।
রাতে দীর্ঘ সময় একই অবস্থানে এই ধরনের চাপ থাকলে টিস্যুতে জ্বালা, ক্ষুদ্র আঘাত এবং ঘুমের সময় মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক অবস্থান থেকে বিচ্যুতি তৈরি হতে পারে বলে চিকিৎসক জানিয়েছেন।
সকালে ঘাড়ে ব্যথা বা শক্তভাব হলে নজর দিন
ভুল ধরনের বা ক্ষয়ে যাওয়া বালিশের কারণে যান্ত্রিক ঘাড়ের ব্যথা, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং মাথাব্যথা দেখা দিতে পারে। কয়েক ঘণ্টা একই অবস্থানে ঘুমানোর পর সকালে এই সমস্যা বেশি বোঝা যেতে পারে।
ডা. থানভির মতে, নষ্ট হয়ে যাওয়া বা অনুপযুক্ত বালিশ যান্ত্রিক ঘাড়ের ব্যথা, সকালে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং ঘাড় থেকে উৎপন্ন মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হতে পারে।
ঘাড় স্বাভাবিক অবস্থান থেকে দীর্ঘ সময় সরে থাকলে মাথার পিছনের এবং ঘাড়ের উপরের পেশিতে টান তৈরি হতে পারে। এর ফলে পেশিতে নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যথা এবং মাথার পিছনের দিকে ছড়িয়ে পড়া মাথাব্যথা হতে পারে।
এই অস্বস্তি ঘুমকেও ব্যাহত করতে পারে। বারবার সামান্য ঘুম ভেঙে গেলে গভীর ঘুমের স্বাভাবিক ধাপ এবং শরীরের রাতের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। তবে পুরনো বালিশের সঙ্গে চুল পড়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, এমন কোনও চিকিৎসাগত প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।
Also Read | ঘড়ির বিজ্ঞাপনে প্রায় সবসময়ই ১০:১০ কেন দেখানো হয়? কারণ জানলে অবাক হবেন
পুরনো বালিশে জমতে পারে ধুলো ও অ্যালার্জেন
বালিশের বাইরের অংশ পরিষ্কার দেখালেও ভিতরে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পদার্থ জমতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে ত্বকের মৃত কোষ, ত্বকের তেল, আর্দ্রতা, ধুলোর মাইট এবং জীবাণু বা অ্যালার্জেন।
দীর্ঘদিন ব্যবহারে বালিশের ভিতরে এই উপাদানগুলির পরিমাণ অনেকটা বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব মূলত ত্বক এবং শ্বাসযন্ত্রের উপর পড়তে পারে।
অ্যালার্জেনের অতিরিক্ত সংস্পর্শে অ্যালার্জিজনিত নাকের সমস্যা এবং শ্বাসনালির উপরের অংশে বায়ু চলাচলের বাধা বাড়তে পারে। এর ফলে ঘুমের মধ্যে বারবার জেগে ওঠার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে শরীরের রাতের স্বাভাবিক টিস্যু পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াতেও প্রভাব পড়তে পারে এবং ব্যথার প্রতি শরীরের সংবেদনশীলতা বাড়তে পারে।
এক বা দুই বছর পরেই বালিশ বদলানো বাধ্যতামূলক নয়
বালিশ ১২ থেকে ২৪ মাস ব্যবহারের পর বদলানো উচিত, এমন কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু প্রত্যেক ধরনের বালিশের জন্য এমন কোনও নির্দিষ্ট চিকিৎসাগত সময়সীমা নেই।
বালিশের আয়ু অনেকটাই নির্ভর করে তার উপাদানের উপর। উচ্চ ঘনত্বের ল্যাটেক্স এবং মেমোরি ফোম সাধারণত পলিয়েস্টার ফাইবার বা ডাউন ফিলিংয়ের তুলনায় দীর্ঘদিন চাপ সহ্য করতে পারে।
তাই শুধু বালিশটি কত বছরের পুরনো, সেটি না দেখে তার বর্তমান অবস্থার দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কোন লক্ষণ দেখলে বালিশ বদলাবেন?
বালিশ বদলানোর কথা ভাবতে পারেন যদি সেটি চাপ দেওয়ার পর আর আগের উচ্চতায় ফিরে না আসে। স্থায়ীভাবে দলা তৈরি হওয়া, বারবার ফ্লাফ বা ঝাড়া দেওয়ার প্রয়োজন হওয়াও বালিশের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার লক্ষণ হতে পারে।
এছাড়া সকালে নিয়মিত ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, ঘাড়ের পেশিতে ব্যথা অথবা ব্যথা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার মতো উপসর্গ থাকলেও বালিশটি আপনার জন্য উপযুক্ত কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
ঘুমের ধরন অনুযায়ী বালিশের উচ্চতা বেছে নিন
সবার জন্য একই উচ্চতার বালিশ উপযুক্ত নয়। শরীরের গঠন এবং ঘুমের অবস্থান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাপোর্টের পরিমাণ বদলে যায়।
ডা. থানভির মতে, বালিশের উচ্চতা ব্যক্তির শারীরিক গঠন এবং প্রধান ঘুমের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।
কাত হয়ে ঘুমালে: সাধারণত তুলনামূলক উঁচু বালিশ প্রয়োজন হয়। এতে কাঁধ ও ঘাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা পূরণ হয় এবং মেরুদণ্ড পাশের দিকে বেশি বেঁকে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।
চিৎ হয়ে ঘুমালে: মাঝারি সাপোর্টের বালিশ প্রয়োজন, যাতে ঘাড়ের স্বাভাবিক বাঁক বজায় থাকে কিন্তু মাথা অতিরিক্ত সামনে ঠেলে না যায়।
উপুড় হয়ে ঘুমালে: খুব পাতলা বালিশ বেশি উপযুক্ত হতে পারে। এতে ঘাড় অতিরিক্ত ঘোরানোর প্রয়োজন কমে।
যাঁদের আগে থেকেই ঘাড়ের মেরুদণ্ডের সমস্যা, ক্ষয়জনিত ডিস্কের সমস্যা, স্নায়ুতে চাপ বা দীর্ঘস্থায়ী পেশির ব্যথা রয়েছে, তাঁদের ঘুমের অবস্থানের বিষয়ে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
আর যদি ঘাড় থেকে শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়া ব্যথা বা অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী উপসর্গ থাকে, শুধু বালিশ পরিবর্তন করে সমস্যা সামলানোর চেষ্টা না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।