দেশপ্রিয় পার্কের দুর্গাপুজো নিয়ে তুমুল সংঘাত, ভাঙা হল নির্মীয়মাণ প্যান্ডেল
কলকাতা: শহরের (Kolkata) অন্যতম পরিচিত দুর্গাপুজো দেশপ্রিয় পার্কের পুজো ঘিরে এ বার তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। পুজোর পরিচালনা নিয়ে দুই গোষ্ঠীর সংঘাতের জেরে দক্ষিণ কলকাতার…
কলকাতা: শহরের (Kolkata) অন্যতম পরিচিত দুর্গাপুজো দেশপ্রিয় পার্কের পুজো ঘিরে এ বার তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। পুজোর পরিচালনা নিয়ে দুই গোষ্ঠীর সংঘাতের জেরে দক্ষিণ কলকাতার এই পুজোর ৮৯তম বর্ষের প্রস্তুতি আপাতত বন্ধ হয়ে গিয়েছে। নির্মীয়মাণ প্যান্ডেলের বাঁশের কাঠামো ভাঙা এবং পুজো কমিটির সদস্যদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে বর্তমান আয়োজক কমিটি। পাল্টা দাবি করেছে বিরোধী গোষ্ঠীও। তাদের বক্তব্য, মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া একটি কমিটি পুজোর দায়িত্ব ধরে রেখেছিল এবং বিতর্কের মধ্যেই প্যান্ডেল তৈরির কাজ শুরু করায় স্থানীয় বাসিন্দারাই কাঠামো সরিয়ে দেন।
প্যান্ডেল ভাঙার অভিযোগ
দেশপ্রিয় পার্কে দুর্গাপুজোর আয়োজন করে আসছে বালিগঞ্জ সর্বজনীন দুর্গোৎসব সমিতি। ১৯৩৮ সাল থেকে এই পুজো হয়ে আসছে এবং কলকাতার বড় ও নজরকাড়া পুজোগুলির মধ্যে এটি অন্যতম। বর্তমান কমিটির অভিযোগ, গত ৯ অগস্ট রাত ৮টা থেকে রাত ৯টা ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল দেশপ্রিয় পার্কে ঢুকে নির্মীয়মাণ প্যান্ডেলের বিভিন্ন অংশ ভাঙচুর করে। বাঁশের কাঠামো, কাঠের সাপোর্ট এবং সাজসজ্জার কাঠের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় ১১ অগস্ট রবীন্দ্র সরোবর থানায় অভিযোগ দায়ের করে কমিটি। তাদের দাবি, ঘটনাটি কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ।
কমিটির আরও অভিযোগ, ঘটনাস্থলে থাকা সদস্য এবং শিল্পীদের গালিগালাজ ও ভয় দেখানো হয়। এমনকি কমিটির এক পদাধিকারীকে ধাক্কাধাক্কি করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক যোগের অভিযোগ
বর্তমান কমিটির সঙ্গে যুক্ত সদস্যদের দাবি, কয়েকজন বিজেপি সদস্য তাঁদের হুমকি দিচ্ছেন এবং পুজোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপও চেয়েছে তারা। কমিটির এক প্রবীণ সদস্য হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে দেশপ্রিয় পার্ক এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ সংলগ্ন এলাকার ক্যামেরার ফুটেজও খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে। পুজোর প্রস্তুতি ফের শুরু করার জন্য ঘটনাস্থলে পুলিশি নিরাপত্তারও আবেদন করেছে বর্তমান কমিটি। তবে এখনও পর্যন্ত ঘটনায় কারা জড়িত ছিল, পুলিশ তা নিশ্চিত করতে পারেনি। ভাঙচুরের প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়েও তদন্ত চলছে।
পাল্টা দাবি নতুন গোষ্ঠীর
বর্তমান কমিটির অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে পুজোর প্রস্তাবিত নতুন কমিটির সদস্যরা। তাঁদের বক্তব্য, বিষয়টি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বা ভাঙচুরের ঘটনা নয়, বরং পুজো কমিটির বৈধতা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং পরিচালনার অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। প্রস্তাবিত নতুন কমিটির সদস্য সূর্যনীল দাসের দাবি, আগের কমিটির ১৫ বছরের মেয়াদ ২০২৫ সালে শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এরপর কোনও সাধারণ সভা বা স্বচ্ছভাবে হিসাব, চুক্তি এবং অন্যান্য নথির হস্তান্তর হয়নি।
তাঁর অভিযোগ, এই পরিস্থিতিতেই পুরনো কমিটি পুজোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। নির্মাণকাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা বাঁশের কাঠামো খুলে দেন।
সূর্যনীল দাস রাজনৈতিক বহিরাগতদের জড়িত থাকার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কয়েক বছর ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের পুজোর সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। নতুন কমিটি আরও বেশি মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে পুজো আয়োজন করতে চায়।
প্রশাসনের নজরে গোটা বিষয়
স্থানীয় বিধায়ক তথা রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। তবে পুজো কমিটির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে চাননি তিনি।
তাঁর বক্তব্য, পার্কে বেআইনি দখল সংক্রান্ত একটি সমস্যা রয়েছে এবং প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করবে। অর্থাৎ পুজোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পাশাপাশি পার্কের জায়গা ব্যবহার এবং দখল সংক্রান্ত প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।
৭০ ফুটের প্যান্ডেল ঘিরে অনিশ্চয়তা
এ বছর দেশপ্রিয় পার্কে প্রায় ৭০ ফুট উঁচু প্যান্ডেল তৈরির পরিকল্পনা ছিল। পুরনো কমিটি ইতিমধ্যেই জুন মাসে খুঁটি পুজোর মাধ্যমে প্রস্তুতি শুরু করেছিল। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় টেনিস তারকা লিয়েন্ডার পেজ এবং বিজেপি নেত্রী লকেট চট্টোপাধ্যায়। এরপর প্যান্ডেল নির্মাণের কাজও শুরু হয়। কিন্তু কমিটির বৈধতা নিয়ে বিরোধ এবং সাম্প্রতিক ঘটনার পর পার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে আপাতত নির্মাণকাজও থমকে রয়েছে।
দুর্গাপুজো সামনে রেখে সময় দ্রুত এগিয়ে চলায় এই বিরোধ কবে মিটবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। দুই পক্ষের অভিযোগ এবং পাল্টা দাবির মধ্যে প্রশাসন ও পুলিশ কী পদক্ষেপ নেয়, তার উপরই নির্ভর করছে দেশপ্রিয় পার্কের এবারের পুজোর প্রস্তুতি কবে ফের শুরু হবে।