ভারতে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যে উন্নতি, বাড়ছে স্থূলতা-ডায়াবেটিসের ঝুঁকি - 24 Ghanta Bangla News
Home

ভারতে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যে উন্নতি, বাড়ছে স্থূলতা-ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

Spread the love

অরিত্রী চন্দ, কলকাতা: ভারতের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনই সামনে এসেছে নতুন কিছু উদ্বেগ। মাতৃস্বাস্থ্য, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব, শিশুদের টিকাকরণ এবং অপুষ্টির কয়েকটি সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা চিন্তা বাড়াচ্ছে।

ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে বা এনএফএইচএস-৬-এর সাম্প্রতিক তথ্যের সঙ্গে আগের এনএফএইচএস-৫-এর পরিসংখ্যান তুলনা করলে ভারতের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির এই দুই বিপরীত ছবি সামনে আসে। একদিকে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য পরিষেবায় পৌঁছনোর সুযোগ বেড়েছে, অন্যদিকে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি ক্রমশ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

হাসপাতালে প্রসবের হার বেড়েছে

মাতৃস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হারে। এনএফএইচএস-৫-এ যেখানে ৮৮.৬ শতাংশ প্রসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে হয়েছিল, এনএফএইচএস-৬-এ সেই হার বেড়ে হয়েছে ৯০.৬ শতাংশ।

গর্ভাবস্থায় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। প্রায় ৯৫.৯ শতাংশ গর্ভবতী মহিলা কোনও না কোনও ধরনের প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্য পরিষেবা পেয়েছেন।

অন্তত চারবার অ্যান্টেনাটাল চেক-আপ করানোর হারও বেড়েছে। আগের ৫৮.৫ শতাংশ থেকে এই হার বেড়ে হয়েছে ৬৫.২ শতাংশ। প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে প্রসবের ক্ষেত্রেও উন্নতি হয়েছে। এই হার ৮৯.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯১.৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

পরিবার পরিকল্পনাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন

পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ৬৬.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৯.১ শতাংশ।
একই সময়ে পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পরিষেবা না-পাওয়ার হারও কমেছে। আগের ৯.৪ শতাংশ থেকে তা নেমে হয়েছে ৮.৫ শতাংশ।
দেশের মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট ২.০-তেই রয়েছে। এই হার প্রতিস্থাপন-স্তর ২.১-এর নিচে। অর্থাৎ দেশের জনসংখ্যার প্রজনন প্রবণতায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ছবিও স্পষ্ট হচ্ছে।

শিশুদের টিকাকরণে বড় অগ্রগতি

শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও রিপোর্টে একাধিক ইতিবাচক তথ্য উঠে এসেছে। ১২ থেকে ২৩ মাস বয়সি শিশুদের মধ্যে সম্পূর্ণ টিকাকরণের হার ৮৩.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৭.১ শতাংশ।

হাম প্রতিরোধের দ্বিতীয় ডোজের টিকাকরণেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে। এই কভারেজ ৫৮.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭১.৮ শতাংশ হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলির একটি দেখা গিয়েছে রোটাভাইরাস টিকাকরণে। এই টিকার আওতা ৩৬.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৫.৪ শতাংশ হয়েছে।

ভারতের সরকারি টিকাকরণ কর্মসূচিতে রোটাভাইরাসের মতো টিকা শিশুদের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিভার্সাল ইমিউনাইজেশন প্রোগ্রামের আওতায় রোটাভাইরাসজনিত ডায়রিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধের টিকাও দেওয়া হয়।

শিশুদের অপুষ্টির ছবিতেও উন্নতি

পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের পুষ্টির ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে উন্নতি হয়েছে। শিশুদের মধ্যে খর্বাকৃতি বা স্টান্টিং-এর হার ৩৫.৫ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ২৯.৩ শতাংশ। একই সময়ে গুরুতর অপুষ্টির একটি সূচক সিভিয়ার ওয়েস্টিং-এর হারও ৭.৭ শতাংশ থেকে কমে ৫.২ শতাংশে নেমেছে।

অর্থাৎ, শিশুদের পুষ্টির ক্ষেত্রে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও অপুষ্টি এখনও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। শিশুদের পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক নজরদারি এবং পুষ্টিকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রয়োজন।

এবার বড় উদ্বেগ স্থূলতা ও অতিরিক্ত ওজন

স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অন্য ছবিটি অবশ্য যথেষ্ট চিন্তার। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতার প্রবণতা বাড়ছে। ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে ওভারওয়েট বা স্থূলতার হার ৩০.৭ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ২৭.৩ শতাংশ।

অর্থাৎ, দেশের একটি বড় অংশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার মধ্যে অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা এখন গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে সামনে আসছে।
এর প্রভাব শুধু ওজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা ভবিষ্যতে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ফলে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য পরিষেবায় এই বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।

রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

ডায়াবেটিস এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতাও রিপোর্টে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ১৫ বছরের বেশি বয়সি মহিলাদের মধ্যে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির হার ১৩.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭.৮ শতাংশ। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ১৫.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২০.৯ শতাংশ।

অর্থাৎ, পুরুষ এবং মহিলা দুই ক্ষেত্রেই রক্তে শর্করার সমস্যার প্রবণতা বেড়েছে। এর ফলে আগামী দিনে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ভারতের স্বাস্থ্যনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

স্বাস্থ্য পরিষেবায় ডিজিটাল ব্যবস্থার বিস্তার

স্বাস্থ্য পরিষেবাকে আরও সহজলভ্য করার ক্ষেত্রেও ডিজিটাল ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আয়ুষ্মান ভারত ডিজিটাল মিশনের অধীনে ২০ জুলাই, ২০২৬ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৯৪.৮৭ কোটি এবিএইচএ আইডি তৈরি হয়েছে।

ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য পরিষেবা পরিকাঠামোর বিস্তারের ফলে রোগীর তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে মানুষের সংযোগ আরও সহজ করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে গ্রামীণ ও পরিষেবা-বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে এই ব্যবস্থার ব্যবহারিক সুবিধা কতটা পৌঁছয় তার উপর।

স্বাস্থ্য গবেষণায় বরাদ্দও বেড়েছে

স্বাস্থ্য গবেষণার ক্ষেত্রেও সরকারি বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে। স্বাস্থ্য গবেষণা দফতরের বাজেট বরাদ্দ ২০১৪-১৫ সালে ৯৩২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬-২৭ সালের বাজেট অনুমানে ৪,৮২১.২১ কোটি টাকা হয়েছে। স্বাস্থ্য গবেষণা, নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি, রোগ নির্ণয়ের প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নে এই ধরনের বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ভারতের স্বাস্থ্যচিত্রে দুই বিপরীত প্রবণতা

এনএফএইচএস-৬-এর দেওয়া সামগ্রিক ছবিতে ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন স্পষ্ট হচ্ছে। মাতৃস্বাস্থ্যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব বেড়েছে, প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্য পরিষেবা গ্রহণের হার উন্নত হয়েছে, শিশুদের টিকাকরণ বেড়েছে এবং অপুষ্টির কয়েকটি সূচকেও উন্নতি হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে স্থূলতা, অতিরিক্ত ওজন এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

ফলে ভারতের স্বাস্থ্যনীতিতে শুধু মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, সংক্রামক রোগ বা টিকাকরণের উপর নজর রাখলেই হবে না। প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণেও গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

ভারতের সামনে তাই এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ইতিবাচক অগ্রগতি ধরে রাখা, অন্যদিকে দ্রুত বাড়তে থাকা জীবনযাপন-সম্পর্কিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা। আগামী দিনের স্বাস্থ্যনীতিতে এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *