সংসদের বাদল অধিবেশনে ৭,০২৩ মিনিট নষ্ট, খরচের হিসাব ১৭৫ কোটি টাকা খেসারত!
নয়াদিল্লি: সংসদের চলতি বাদল অধিবেশনে (Indian Parliament) বারবার হইচই, বিক্ষোভ এবং বিরোধীদের ওয়াকআউটের কারণে কার্যত ব্যাহত হয়েছে অধিবেশনের কাজ। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে শাসক ও বিরোধী…
নয়াদিল্লি: সংসদের চলতি বাদল অধিবেশনে (Indian Parliament) বারবার হইচই, বিক্ষোভ এবং বিরোধীদের ওয়াকআউটের কারণে কার্যত ব্যাহত হয়েছে অধিবেশনের কাজ। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে শাসক ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে সংঘাতের জেরে সংসদের দুই কক্ষে নির্ধারিত সময়ের বড় অংশ নষ্ট হয়েছে। তবে এর মধ্যেই লোকসভা এবং রাজ্যসভা মিলিয়ে মোট ২০টি বিল পাস হয়েছে।
তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দীর্ঘ আলোচনা বা বিতর্কের মাধ্যমে বিলগুলি পাস হয়নি। সংসদে হইচই চলাকালীন অথবা বিরোধী দলের সদস্যদের ওয়াকআউটের মধ্যে বেশ কিছু বিল পাস হয়েছে।
৭,০২৩ মিনিট নষ্ট, ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বাদল অধিবেশনে এখনও পর্যন্ত সংসদের ৭,০২৩ মিনিট সময় নষ্ট হয়েছে। লোকসভায় প্রতি মিনিটে আনুমানিক ২.৫ লক্ষ টাকা খরচ হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী, নষ্ট হওয়া সময়ের আর্থিক মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, সংসদের মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থেরও বিপুল পরিমাণ অপচয় হয়েছে। তবে এই ধরনের ঘটনা ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন নয়। গত কয়েক দশকে একাধিক অধিবেশন এমনভাবে ব্যাহত হয়েছে, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে কার্যত কোনও আইন প্রণয়নের কাজ হয়নি।
Also Read | প্রথম বারের জন্য ভারত থেকে গ্যাসোলিন আমদানি করতে চলেছে রাশিয়া
বোফর্স থেকে শুরু করে একাধিক ইস্যুতে অচল হয়েছে সংসদ
১৯৮০-এর দশকে বোফর্স কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে একাধিক রাজনৈতিক ও দুর্নীতির অভিযোগ সংসদের কাজকে থামিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দলগুলি নির্দিষ্ট ইস্যুতে তদন্ত, আলোচনা অথবা যৌথ সংসদীয় কমিটি গঠনের দাবিতে সংসদের ভিতরে বিক্ষোভ দেখিয়েছে।
এর ফলে কখনও পুরো অধিবেশন, আবার কখনও অধিবেশনের বড় অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
২০১০ সালের শীতকালীন অধিবেশন
২০১০ সালের শীতকালীন অধিবেশনেও ব্যাপক বিক্ষোভের সাক্ষী হয়েছিল সংসদ। সেই সময় ২জি কেলেঙ্কারি নিয়ে বিরোধীরা সরব হয়েছিলেন। কেলেঙ্কারির তদন্তের জন্য যৌথ সংসদীয় কমিটি বা জেপিসি গঠনের দাবিতে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
ফলে ওই অধিবেশনে আইন প্রণয়নের স্বাভাবিক কাজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
২০১২ সালের বাদল অধিবেশন
২০১২ সালের বাদল অধিবেশনেও সংসদের কাজ উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছিল। কমনওয়েলথ গেমস এবং লোকপাল বিল-কে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে লোকসভা নির্ধারিত ৬০ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ২৩ ঘণ্টা কার্যকরভাবে কাজ করতে পেরেছিল। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের বড় অংশই সংসদীয় কাজে ব্যবহার করা যায়নি।
২০১৫ সালের বাদল অধিবেশন
২০১৫ সালের বাদল অধিবেশনেও একাধিক রাজনৈতিক ইস্যুতে সংসদ অচল হয়ে পড়েছিল। ব্যাপম কেলেঙ্কারি এবং তৎকালীন আইপিএল চেয়ারম্যান ললিত মোদির দেশ ছাড়ার বিষয় নিয়ে বিরোধীরা বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। এর ফলে ওই অধিবেশনে নির্ধারিত কাজের মাত্র ৪৬ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছিল।
নোটবন্দির প্রতিবাদে ২০১৬ সালের শীতকালীন অধিবেশন
২০১৬ সালের শীতকালীন অধিবেশনের বড় অংশ ব্যাহত হয়েছিল নোটবন্দি নিয়ে বিরোধীদের প্রতিবাদের কারণে।
এই ইস্যুতে সংসদে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। এর ফলে লোকসভার প্রায় ৯২ ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়েছিল।
Also Read | ফের বাড়ল অস্থিরতার আশঙ্কা! ‘যন্তরমন্তর সিজন ২’ আসছে, বললেন দিপকে
২০১৮ সালেও বারবার ব্যাহত সংসদের কাজ
২০১৮ সালের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয়ার্ধেও সংসদের কাজ স্বাভাবিকভাবে চলেনি। ব্যাঙ্কিং কেলেঙ্কারি এবং অনাস্থা প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে খুব কম আইন প্রণয়নের কাজ সম্পন্ন হয়েছিল।
একই বছর বাদল অধিবেশনেও সংসদে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা যায়। রাফাল যুদ্ধবিমান চুক্তি এবং অনাস্থা প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিরোধিতা চলেছিল। ফলে নির্ধারিত সংসদীয় কাজের মাত্র ১৫ শতাংশ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিল।
২০২৩ সালের বাদল অধিবেশনেও তীব্র অচলাবস্থা
২০২৩ সালের বাদল অধিবেশনও ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। মণিপুরে হিংসা নিয়ে বিরোধীরা সংসদে সরব হয়েছিলেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এবং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের দাবিতে বিরোধীদের বিক্ষোভের জেরে সংসদের স্বাভাবিক কাজ বারবার ব্যাহত হয়েছিল।
সংসদের সময় নষ্ট হওয়া নিয়ে প্রশ্ন
সংসদের অধিবেশন বারবার অচল হওয়ার ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিরোধী দলগুলি সাধারণত সংসদের ভিতরে বিক্ষোভকে সরকারের উপর চাপ তৈরির সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পদ্ধতি হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে সরকার এবং শাসক দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, হইচইয়ের কারণে গুরুত্বপূর্ণ আইন নিয়ে আলোচনা এবং সংসদের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
চলতি বাদল অধিবেশনে ৭,০২৩ মিনিট সময় নষ্ট হওয়ার হিসাব এবং তার আনুমানিক ১৭৫ কোটি টাকা আর্থিক মূল্য সেই পুরনো বিতর্ককেই আবার সামনে এনেছে। একদিকে সংসদে আইন পাস করার কাজ চলছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের বড় অংশ হইচই ও বিক্ষোভে চলে যাচ্ছে। ফলে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রতিবাদ এবং কার্যকর আইন প্রণয়নের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা যায়, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।