প্রশ্নবাণে ‘বিদ্রোহী’ তৃণমূলও, বিক্ষোভের আঁচে জোড়াফুলের সব শিবিরই
এই সময়: জট যেন কেটেও কাটছে না বিদ্রোহী শিবিরে! দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহদের উপস্থিতিতে এনডিএ সাংসদদের ‘মঙ্গল মিলন’ বৈঠকে গরহাজির রইলেন দুই বিদ্রোহী তৃণমূল, বর্তমানে এনসিপিআই সাংসদ আবু তাহের ও খলিলুর রহমান। এনসিপিআইয়ে নাম লেখানো আর এক বিদ্রোহী সাংসদ জগদীশ বর্মা বসুনিয়া এবং তাঁর স্ত্রী, বিদ্রোহী বিধায়ক সঙ্গীতা রায়কে কোচবিহারের সিতাইয়ে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে ফিরতে গিয়ে সাধারণ মানুষের প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়তে হলো। আবার পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশপুরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সভায় যোগ দিতে এসে স্থানীয় মানুষের বিক্ষোভের মুখে ফিরে যেতে হলো বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক শিউলি সাহাকে।
বাংলায় পালাবদলের পরে লোকসভায় তৃণমূলের বিদ্রোহী ২০ জন সাংসদ যোগ দিয়েছেন এনসিপিআইয়ে। বিদ্রোহী সাংসদদের মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলার তিন এমপি তাহের, খলিলুর ও ইউসুফ পাঠান আবার বেসুরো হয়ে রয়েছেন বেশ কিছু দিন ধরেই। তাঁদের সঙ্গে বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কদের ফারাক রয়েছে। কারণ, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, আখরুজ্জামান–সহ বিদ্রোহী বিধায়করা অন্য দলে যাননি, তাঁরা নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করে নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছেন। এই টানাপড়েনের মধ্যে একই দিনে তিনটি ঘটনাপরম্পরা সার্বিক ভাবে বিদ্রোহী তৃণমূল শিবিরের অস্বস্তি আরও বাড়ালো বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
ক’দিন আগে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও বঙ্গে নিযুক্ত বিজেপির কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক ভূপেন্দ্র যাদবের উপস্থিতিতে বৈঠক করেছেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদার সমেত বিদ্রোহী ২০ সাংসদ। সূত্রের দাবি, সেখানে তাঁদের অনেকে অনুযোগ জানান, তাঁরা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন। নিজ নিজ এলাকায় গেলেও ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে। যদিও জোড়াফুলের প্রতীক নিয়ে বিতর্কের অবসান হলে এই সমস্যা মিটে যাবে বলে তাঁদের আশ্বস্ত করেন পদ্ম–নেতৃত্ব। এই আবহে সোমবার সকালে দক্ষিণ কলকাতার গড়ফায় বিদ্রোহী তৃণমূল সাংসদ সায়নী ঘোষের অফিসে তালা লাগিয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করা একদল পুরুষ–মহিলা। আবার সোমবার রাত পৌনে ১১টা নাগাদ কোচবিহারের সিতাইয়ে নিজেদের বাড়িতে ফেরেন জগদীশ ও সঙ্গীতা। এর আগে গত ২৩ জুন জগদীশ কোচবিহারে এসেছিলেন। সেই সময়ে তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া হতে পারে বলে আশঙ্কায় আর সিতাইয়ে যাননি তিনি।
সোমবার রাতে সস্ত্রীক জগদীশ সিতাইয়ে পৌঁছতেই বহু মানুষ তাঁর বাড়ির বাইরে জমায়েত শুরু করেন। অল্প কিছু সংখ্যক পুলিশকর্মী সেখানে থাকলেও পরবর্তীতে পরিস্থিতি আয়ত্তে আনতে কোচবিহার শহর থেকে আরও পুলিশ সেখানে পাঠানো হয়। বাড়ির বাইরে স্লোগান ওঠে— ‘জগদীশ হটাও, সিতাই বাঁচাও। সঙ্গীতা হটাও সিতাই বাঁচাও’। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আর বাড়িতে থাকার ঝুঁকি নেননি জগদীশরা। রাত পৌনে ২টো নাগাদ আবার গাড়ি করে কোচবিহার শহরে চলে আসেন তাঁরা। জগদীশ পরে বলেন, ‘আমরা জামাকাপড় নিতে বাড়িতে ফিরেছিলাম। আমরা কোনও গন্ডগোল চাইনি বলে ফিরে চলে এসেছি। আমাদের কাছে রাজ্য ও দেশের উন্নয়ন বেশি জরুরি।’
আবার কেশপুরের মোহবনিতে ক্ষুদিরাম বসুর ১১৮তম আত্মবলিদান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মঙ্গলবার যোগ দিতে আসেন শুভেন্দু। মুখ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছনোর বেশ কিছুক্ষণ আগেই সেখানে চলে যান বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়ক শিউলি সাহা। অনুষ্ঠান শুরুর আগে তাঁর নাম ঘোষিত হতেই মঞ্চের সামনে বসে থাকা জনতার একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘শিউলি সাহা গো ব্যাক’ স্লোগান দিতে থাকেন। উত্তেজিত জনতার একাংশের অভিযোগ, গত দশ বছরে কেশপুরের মানুষ নানা অত্যাচারের শিকার হয়েছেন, তাই তাঁরা শিউলি সাহাকে মঞ্চে দেখতে চান না। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। মুখ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠান স্থলে পৌঁছনোর পরে আর শিউলিকে সেখানে দেখা যায়নি। কারা বিক্ষোভ দেখালো— এই প্রশ্নের জবাবে শিউলি পরে বলেন, ‘কে বা কারা স্লোগান দিয়েছে, আমার জানা নেই।’ তাঁর দাবি, একই দিনে বাঁকুড়ায় পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদের বৈঠকেও তাঁর থাকার কথা ছিল। তাই তিনি দ্রুত বাঁকুড়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন বলে দাবি শিউলির।
দিল্লিতে আবার তাহের, খলিলুররা প্রকাশ্যেই একাধিকবার জানিয়েছেন, তাঁরা বিজেপি বা এনডিএ–কে সমর্থন করছেন না। এনডিএ–র একাধিক বৈঠকেও তাঁরা হাজির হননি। ক’দিন আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ডাকা প্রাতরাশ বৈঠকে থাকলেও এ দিন সংসদের বালাযোগী অডিটোরিয়ামে এনডিএ–র সাপ্তাহিক বৈঠকও এড়িয়ে গিয়েছেন তাঁরা। ধর্মীয় স্থান থেকে মাইক খোলা নিয়ে তাঁরা ক’দিন আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপিও জমা দেন। ফলে এ দিন তাঁদের অনুপস্থিতি নতুন করে জল্পনা তৈরি করেছে রাজনৈতিক মহলে। সেখানে অবশ্য প্রথম সারিতে বসেছিলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার।
এই টানাপড়েন নিয়ে বিদ্রোহী শিবিরকে নিশানা করেছেন কালীঘাট–তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ‘এটাই হওয়ার ছিল। এঁরা মানুষের সঙ্গে বেইমানি করেছেন। বিজেপি–বিরোধী ভোট জয়ী হয়ে এখন বিজেপি’র বি–টিম হয়েছেন। তাই তাঁরা মানুষের রোষের মুখে পড়ছেন।’ কেশপুরের ঘটনা নিয়ে বিধানসভার প্রেস কর্নারে বিদ্রোহী তৃণমূলের বিধায়ক প্রসূন মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘কী কারণে এই ঘটনা ঘটেছে, তা বিধায়কের সঙ্গে কথা বলে জানতে হবে। অনেক সময়ে স্থানীয় কোনও ইস্যু থাকে। কখনও সাজানো কোনও ইস্যুও থাকে।’ জগদীশ বসুনিয়াকে নিয়ে প্রসূনের বক্তব্য, ‘উনি আমাদের দলের নন। উনি একটি পৃথক দলের সদস্য। তবে সঙ্গীতা বসুনিয়া আমাদের পরিষদীয় দলের সদস্য। কী ঘটনা ঘটেছে, সঙ্গীতা বসুনিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানতে হবে।’ বঙ্গ–বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকারের ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য, ‘কুচকুচে সাদা বা ধবধবে কালো, তৃণমূলে কেউ নয় ভালো।’