ইরানের হামলার ভয়! ক্যাটারিং গাড়িতে গোপনে সরানো হল ট্রাম্পকে
ওয়াশিংটন: বিশ্বের অন্যতম কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত রাষ্ট্রনেতা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে (Donald Trump) নিয়ে তুরস্ক সফরের সময় তৈরি হয়েছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা পরিকল্পনা। ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের উপর হামলার বিশ্বাসযোগ্য আশঙ্কা থাকায়, ন্যাটো সম্মেলনের পর আঙ্কারা ছাড়ার সময় তাঁকে গোপনে একটি বিমান থেকে অন্য বিমানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি এতটাই গোপন রাখা হয়েছিল যে ট্রাম্পের সঙ্গে সফররত হোয়াইট হাউসের প্রেস কর্পসের সদস্যরাও বিষয়টি জানতে পারেননি।
কীভাবে সরানো হয়েছিল ট্রাম্পকে?
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারা থেকে ফেরার সময় প্রথমে প্রকাশ্যেই পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানে ওঠেন ট্রাম্প। বিমানটি ক্যামেরার সামনে থেকেই যাত্রার প্রস্তুতি নেয়।
কিন্তু এরপরই শুরু হয় আসল নিরাপত্তা পরিকল্পনা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প এবং তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে গোপনে একটি বিমানবন্দরের ক্যাটারিং গাড়িতে করে প্রেসিডেন্টের বিমানের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাঁদের একটি ছোট এয়ার ফোর্স সি-৩২এ বিমানে তুলে দেওয়া হয়। সেই বিমানটি ট্রাম্পকে নিয়ে ব্রিটেনের দিকে রওনা দেয়। অন্যদিকে, আসল প্রেসিডেন্টের বিমানটি ডিকয় বা বিভ্রান্তিমূলক বিমান হিসেবে পিছনে উড়ে যায়। অর্থাৎ, বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল ট্রাম্প এখনও পুরনো এয়ার ফোর্স ওয়ানেই রয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি অন্য বিমানে ছিলেন।
Also Read | ২০৩০ র মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার ৫৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ভারতে! নজরে বাংলা
কেন এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা?
প্রতিবেদনগুলিতে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের নিরাপত্তা দল ইরানের তরফে তাঁর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিল। সেই কারণেই প্রেসিডেন্টের গতিবিধি আড়াল করতে এই অভিনব পরিকল্পনা করা হয়। ট্রাম্প এর আগেও একাধিক হত্যাচেষ্টার মুখে পড়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পেনসিলভেনিয়ার বাটলারে নির্বাচনী সমাবেশে তাঁর উপর গুলি চালানো হয়েছিল। এরপর ফ্লোরিডায় তাঁর গলফ খেলার সময়ও এক অস্ত্রধারীকে গ্রেফতার করা হয়। আরও সম্প্রতি ট্রাম্প উপস্থিত থাকা একটি অনুষ্ঠানে এক অস্ত্রধারী প্রবেশের চেষ্টা করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের উদ্বেগ নতুন নয়।
কাতারের দেওয়া ৪০ কোটি ডলারের বিমান নিয়েও প্রশ্ন
এই ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে কাতারের দেওয়া প্রায় ৪০ কোটি ডলারের বোয়িং ৭৪৭ বিমান নিয়ে বিতর্ক।, প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য বিদেশ থেকে পাওয়া বাণিজ্যিক বিমানকে এয়ার ফোর্স ওয়ানের উপযোগী করে তুলতে হলে অত্যন্ত উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করতে হয়।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিলাসবহুল অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা থাকলেই একটি বিমান প্রেসিডেন্টের জন্য নিরাপদ হয়ে ওঠে না। সেটিকে কার্যত একটি উড়ন্ত প্রেসিডেন্ট কমান্ড সেন্টার হিসেবে তৈরি করতে হয়। এর মধ্যে থাকতে হয় উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রতিরোধের ক্ষমতা, সম্ভাব্য পারমাণবিক হামলার পরিস্থিতিতে টিকে থাকার ব্যবস্থা, চিকিৎসা সুবিধা এবং অত্যন্ত শক্তিশালী শারীরিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
Also Read | চিনের বিরুদ্ধে ‘ম্যাপ-স্ট্রাইক’! অরুণাচলে কী করল ভারত, কেন ফুঁসছে বেজিং?
ট্রাম্পকে ক্যাটারিং গাড়িতে সরানো নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প সমর্থকদের একাংশ এই ঘটনাকে অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত নিরাপত্তা অভিযান হিসেবে দেখেছেন। তাঁদের মতে, ইরানের সম্ভাব্য হুমকি এড়াতে প্রেসিডেন্টের গতিবিধি গোপন রাখার পরিকল্পনা কার্যকর ছিল।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকা সাংবাদিক এবং কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে কেন সম্ভাব্য ডিকয় হিসেবে ব্যবহার করা হল।
আমেরিকার প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা কতটা কঠোর?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর সফরের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিকল্পনা করা হয়। সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরা আগে থেকেই ভবন, রাস্তা এবং ছাদ পরীক্ষা করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী যুদ্ধবিমানও সতর্ক অবস্থায় রাখা হতে পারে।
প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকে বিশেষ যোগাযোগ ব্যবস্থা, সুরক্ষিত মোটরকেড এবং বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী। এই নিরাপত্তার পিছনে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে মার্কিন প্রশাসন।
তার পরেও তুরস্কে ট্রাম্পকে একটি ক্যাটারিং গাড়িতে গোপনে সরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা দেখিয়ে দিল, প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিস্থিতি অনুযায়ী কতটা অপ্রচলিত কৌশলও নেওয়া হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের হত্যার ইতিহাসও আলাদা বার্তা দেয়
মার্কিন ইতিহাসে দায়িত্বে থাকা চার প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁরা হলেন আব্রাহাম লিংকন, জেমস গারফিল্ড, উইলিয়াম ম্যাককিনলি এবং জন এফ কেনেডি। এছাড়া থিওডোর রুজভেল্ট, ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট, হ্যারি ট্রুম্যান, জেরাল্ড ফোর্ড এবং রোনাল্ড রেগানও হত্যাচেষ্টা বা গুরুতর হামলার মুখে পড়েছিলেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, দায়িত্বে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্টদের হত্যার ঘটনাগুলি দেশের মাটিতেই ঘটেছে এবং হামলাকারীরা ছিল দেশেরই নাগরিক। ফলে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি সবসময় বিদেশি শত্রু বা কোনও বিদেশি বিমান হামলা নয়। তুরস্কের এই ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ব্যক্তিদের একজনকেও কখনও কখনও নিরাপত্তার স্বার্থে এমন অপ্রত্যাশিত এবং অদ্ভুত কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়।