‘গদ্দারদের জায়গা নেই’! যাদবপুরে সায়নীর অফিসে তালা ঝোলালেন মমতার অনুগামীরা
কলকাতা: দক্ষিণ কলকাতায় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের ফাটল এ বার চরম আকার নিল। যাদবপুরের সাংসদ সায়নী ঘোষের ব্যবহৃত দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা।…
কলকাতা: দক্ষিণ কলকাতায় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের ফাটল এ বার চরম আকার নিল। যাদবপুরের সাংসদ সায়নী ঘোষের ব্যবহৃত দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা। তাঁদের স্পষ্ট অভিযোগ, দলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মেলানোর পর তৃণমূলের কোনও সম্পত্তি বা কার্যালয় ব্যবহার করার আর কোনও অধিকার নেই সায়নীর।
যাদবপুর এলাকার ১০৬ নম্বর ওয়ার্ডের গরফায় সায়নীর অফিসে এই নাটকীয় ঘটনাটি ঘটে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হওয়ার পর থেকেই এই অফিসটিতে বৈঠক, সাংগঠনিক কাজকর্ম এবং জনসংযোগের কাজ করতেন তিনি। এ দিন ওই অফিসে গিয়ে সায়নীর এক আপ্তসহায়ককে বেরিয়ে যেতে বলেন বিক্ষোভকারীরা। তিনি বেরিয়ে যাওয়ার পরেই অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। বাইরে টাঙিয়ে দেওয়া হয় একটি ব্যানার, যাতে হিন্দিতে লেখা, “গদ্দারোঁ কে লিয়ে কোয়ি জগা নহিঁ” (গদ্দারদের জন্য কোনও জায়গা নেই)।
বিক্ষোভকারী কর্মীদের মূল ক্ষোভের কারণটি অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁদের প্রশ্ন, যে সাংসদ বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি অফ ইন্ডিয়া (NCPI)-তে যোগ দিয়েছেন (যা এখন বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র অংশ), তিনি কেন এখনও তৃণমূলের দলীয় পরিকাঠামো ব্যবহার করবেন? প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালে তৃণমূলের টিকিটে জিতেছিলেন সায়নী। কিন্তু বর্তমানে যে ২০ জন তৃণমূল সাংসদ এনসিপিআই এবং এনডিএ-র দিকে ঝুঁকেছেন, সায়নী তাঁদের অন্যতম। দলত্যাগ বিরোধী আইনে তাঁদের সাংসদ পদ খারিজের আর্জি বর্তমানে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে বিচারাধীন।
রাজনীতির ময়দানে পা রাখার আগে বাংলা বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ ছিলেন সায়নী ঘোষ। ২০১৫ সালে ‘রাজকাহিনি’ এবং ২০২২ সালে সত্যজিৎ রায়ের জীবনী নির্ভর ‘অপরাজিত’ ছবিতে তাঁর অভিনয় নজর কাড়ে। ২০২১ সালে হুগলিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক নির্বাচনী জনসভায় তৃণমূলে যোগ দেন তিনি। সে বার আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে বিধানসভা ভোটে দাঁড়িয়ে বিজেপির অগ্নিমিত্রা পালের কাছে হেরে গেলেও, ওই বছরের জুন মাসেই তাঁকে তৃণমূলের যুব সভানেত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু একসময়ের সেই অনুগত নেত্রীই এখন বিদ্রোহী।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর থেকেই দলে এক নজিরবিহীন সাংগঠনিক সংকট তৈরি হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিদ্রোহী নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দুই শিবিরের মধ্যে দলের রাশ টানা নিয়ে সংঘাত ক্রমশ চরমে উঠছে। এই বিদ্রোহের সূত্রপাত হয় বিরোধী দলনেতা নির্বাচন ঘিরে। দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৬৫ জনই কালীঘাটের নির্দেশ অমান্য করে ঋতব্রতর পাশে দাঁড়ান। পরে বিদ্রোহী শিবির আলাদা সাংগঠনিক অধিবেশন করে প্রবীণ বিধায়ক অরূপ রায়কে তাদের চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করে এবং একটি সমান্তরাল জাতীয় নেতৃত্বের কাঠামো ঘোষণা করে। বিদ্রোহী শিবিরের যুক্তি ছিল, দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির আস্থা হারিয়েছে বর্তমান নেতৃত্ব। আর সেই আবহেই এ দিন সায়নীর অফিসে তালা ঝোলানোর ঘটনায় তৃণমূলের অন্দরের এই লড়াই আরও এক বার প্রকাশ্যে চলে এল।