১৫ আগস্ট ভারতের পতাকা, ১৭ আগস্ট পাকিস্তান! CHT-র বিস্মৃত দেশভাগের ইতিহাস - 24 Ghanta Bangla News
Home

১৫ আগস্ট ভারতের পতাকা, ১৭ আগস্ট পাকিস্তান! CHT-র বিস্মৃত দেশভাগের ইতিহাস

Spread the love

কলকাতা: ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাসে (Partition History) চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের (Chittagong Hill Tracts বা CHT) ঘটনা একেবারেই ব্যতিক্রমী। ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার দিন রাঙামাটিতে উড়েছিল ভারতের তেরঙ্গা। স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন, তাঁদের অঞ্চল ভারতের অংশ হয়েছে। কিন্তু মাত্র দু’দিন পর রেডিওতে ঘোষণা হল অন্য কথা। র্যাাডক্লিফের সীমারেখায় চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল চলে গেল পূর্ববঙ্গে, অর্থাৎ পাকিস্তানের অংশে।

প্রায় ১৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই পার্বত্য অঞ্চলে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ একাধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। সমকালীন বিভিন্ন বিবরণ অনুযায়ী, এখানকার প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮.৫ শতাংশ মানুষ ছিলেন অমুসলিম, মূলত বৌদ্ধ ও হিন্দু।

কেন ভারতভুক্তির আশা ছিল স্থানীয়দের?

ব্রিটিশ আমলেও চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের প্রশাসনিক অবস্থান ছিল কিছুটা আলাদা। ১৯০০ সালের Chittagong Hill Tracts Regulation-এর মাধ্যমে এই অঞ্চলকে বিশেষ প্রশাসনিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। সাধারণ বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে এর একটি পৃথক অবস্থান ছিল।

এই বিশেষ প্রশাসনিক ইতিহাস এবং জনসংখ্যার চরিত্রের কারণে স্থানীয় নেতাদের একটি বড় অংশের বিশ্বাস ছিল, CHT মুসলিম-অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হবে না।

দেশভাগের আগে Bengal Boundary Commission-এর কাছেও স্থানীয় প্রতিনিধিরা নিজেদের দাবি জানিয়েছিলেন। Chittagong Hill Tracts People’s Association-এর নেতৃত্বে থাকা স্নেহ কুমার চাকমা অঞ্চলটিকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। তাঁদের যুক্তির মধ্যে ছিল ভারতের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সঙ্গে CHT-এর ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক যোগাযোগ এবং এর বিশেষ প্রশাসনিক অবস্থান। শুধু স্থানীয় নেতারাই এমন আশা করেছিলেন, তা নয়। দিল্লির রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেও সেই ধারণার প্রতিফলন ছিল।

নেহরুর চিঠিতেও ছিল ভারতভুক্তির আশ্বাস

১৯৪৭ সালের ১৯ জুলাই লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে লেখা একটি চিঠিতে জওহরলাল নেহরু চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে তাঁর অবস্থান জানিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, তৎকালীন স্বাধীনতার পরিকল্পনা অনুযায়ী CHT পূর্ববঙ্গের অংশ নয় এবং স্থানীয় প্রধানরা ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে চান। নেহরু লিখেছিলেন যে তিনি তাঁদের আশ্বস্ত করেছিলেন, চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল ভারতীয় ইউনিয়নের অংশ হবে।

১৬ আগস্ট দিল্লির Government House-এ অনুষ্ঠিত বৈঠকের নথিতেও নেহরুর বক্তব্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের প্রধানদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে তাঁদের অঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কোনও প্রশ্ন নেই। তিনি CHT-এর প্রায় ৯৭ শতাংশ হিন্দু ও বৌদ্ধ জনসংখ্যার কথাও উল্লেখ করেন। এই পটভূমিই ব্যাখ্যা করে, কেন ১৫ আগস্ট রাঙামাটিতে ভারতের পতাকা উড়েছিল।

১৫ আগস্ট রাঙামাটিতে উড়েছিল ভারতের তেরঙ্গা

ভারতের স্বাধীনতার দিন রাঙামাটিতে স্থানীয় মানুষ ভারতের তেরঙ্গা উত্তোলন করেন। চাকমা নেতা স্নেহ কুমার চাকমার ছেলে এবং ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক গৌতম চাকমার বর্ণনা অনুযায়ী, স্নেহ কুমার চাকমা CHT-এর তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার কর্নেল জি এল হাইডের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। হাইডের সম্মতির পর ১৫ আগস্ট সকালে রাঙামাটির ডেপুটি কমিশনারের বাংলোয় ভারতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় বলে তাঁর দাবি। চাকমা, ত্রিপুরা এবং অন্যান্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ সেই পতাকা উত্তোলনকে তাঁদের নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন।

স্নেহ কুমার চাকমার পরবর্তী বর্ণনায় ১৪-১৫ আগস্টের রাতের একটি কথোপকথনের কথাও উঠে আসে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, তিনি হাইডকে প্রশ্ন করেছিলেন, ভারত স্বাধীন হয়েছে কি না। উত্তরে হাইড স্বাধীনতার কথা স্বীকার করেন এবং CHT-কে ভারতীয় ডোমিনিয়নের অংশ হিসেবেই উল্লেখ করেন। কিন্তু সেই বিশ্বাস বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

১৭ আগস্ট বদলে গেল সবকিছু

১৫ আগস্টের স্বাধীনতার আনন্দের মাত্র দু’দিন পর, ১৭ আগস্ট র্যােডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড প্রকাশিত হয়। তাতে চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলকে পূর্ববঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে CHT পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়। এই সিদ্ধান্তে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের একাংশও অসন্তুষ্ট হয়েছিল। পরবর্তী নথিতে দেখা যায়, নেহরু CHT পাকিস্তানকে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, অঞ্চলটির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু ও বৌদ্ধ।

নেহরু ছাড়াও তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. বি আর আম্বেদকর এবং শিল্প ও সরবরাহমন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় Bengal Boundary Commission-এর সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁরা যৌথভাবে সীমারেখা নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে ‘অন্যায্য’ এবং ‘অবিচারমূলক’ বলে অভিহিত করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন, এটি দেশভাগের মূল নীতি ও Boundary Commission-কে দেওয়া নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কেন CHT পাকিস্তানের অংশ হল?

চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পিছনে শুধু জনসংখ্যার হিসাবই কাজ করেনি। চট্টগ্রাম শহর ও বন্দরের সঙ্গে অঞ্চলটির অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং কর্ণফুলি নদী নিয়ন্ত্রণের কৌশলগত গুরুত্বও বিবেচনায় এসেছিল। লর্ড মাউন্টব্যাটেন পরে তাঁর স্মৃতিচারণে জানান, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খানকে CHT ভারতের হাতে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছিলেন। তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কর্ণফুলি নদী এবং নদীর দুই তীরে প্রায় ১০ মাইল এলাকা নিজেদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে জানানো হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত সীমারেখার সিদ্ধান্ত বদলায়নি।

রাঙামাটির তেরঙ্গা নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা

সীমারেখার ঘোষণার পর মাটিতে দ্রুত বদলে যায় পরিস্থিতি। পাকিস্তানি সেনা চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলে প্রবেশ করে এবং ভারতীয় পতাকা নামিয়ে দেয়। রাঙামাটিতে উত্তোলিত তেরঙ্গা ২১ আগস্ট নামিয়ে পাকিস্তানের পতাকা তোলা হয় বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।

চাকমা রাজপরিবারের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। শান্তি বিকাশ চাকমার বক্তব্য অনুযায়ী, তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ও রাজপ্রাসাদের উপর ভারতীয় পতাকা তুলেছিলেন। পরে বালুচ রেজিমেন্টের সেনারা সেই পতাকা নামিয়ে দেয়।

বান্দরবানেও স্থানীয় কিছু মানুষ বার্মার সঙ্গে ঐতিহাসিক যোগাযোগের কারণে বার্মার পতাকা তুলেছিলেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। সেই পতাকাও পাকিস্তানি বাহিনী নামিয়ে দেয়।

প্রতিবাদ থামেনি র্যা ডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড মেনে নিতে স্থানীয় নেতৃত্বের একাংশ প্রস্তুত ছিল না। ১৯ আগস্টের একটি জরুরি বৈঠকে CHT-এর নেতারা সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁরা র্যারডক্লিফের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন না। প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথাও আলোচনায় আসে।

স্নেহ কুমার চাকমা এবং অন্য কয়েকজন নেতা পরে আগরতলা হয়ে কলকাতা ও দিল্লিতে যান এবং তাঁদের দাবি ও প্রতিবাদের জন্য সমর্থন খোঁজেন। নতুন পাকিস্তানি প্রশাসন তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করে। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের এই রাজনৈতিক ক্ষোভ পরবর্তী কয়েক দশকেও পুরোপুরি শেষ হয়নি।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, তবুও সমস্যার অবসান হয়নি

১৯৪৭ সালে CHT পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর অঞ্চলটি বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু সেখানকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার, জমি ও পরিচয় নিয়ে বিরোধ অব্যাহত থাকে। পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয় এবং দীর্ঘ সংঘাতের পর ১৯৯৭ সালে Chittagong Hill Tracts Peace Accord স্বাক্ষরিত হয়।

চাকমা সংগঠনগুলির মধ্যেও ১৯৪৭ সালের সেই ঘটনার স্মৃতি আজও জীবিত। ২০১৬ সাল থেকে ত্রিপুরার কিছু চাকমা সংগঠন ১৭ আগস্টকে ‘Black Day’ হিসেবে পালন করে আসছে। তাঁদের বক্তব্য, ১৯৪৭ সালের সীমারেখা নির্ধারণের সিদ্ধান্তের ফলে তাঁদের জনগোষ্ঠী একটি অন্যায্য রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে পড়ে যায়।

স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরও কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ইতিহাস?

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট রাঙামাটিতে যখন ভারতের তেরঙ্গা উড়ছিল, তখন সেখানকার মানুষ জানতেন না স্বাধীন ভারতের সীমান্ত ঠিক কোথায় গিয়ে শেষ হবে। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, তাঁরা ভারতের নাগরিক হতে চলেছেন। কিন্তু ১৭ আগস্ট র্যাসডক্লিফের সিদ্ধান্ত সেই বিশ্বাস বদলে দেয়। মাত্র দু’দিনের মধ্যে একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিচয় পাল্টে যায়।

চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের এই ইতিহাস তাই ভারত-পাকিস্তান দেশভাগের প্রচলিত গল্পের বাইরে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার দিনে ভারতের পতাকা উত্তোলন, তারপর পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি এবং তার পরবর্তী দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাত দেখায়, ১৯৪৭-এর দেশভাগ শুধু সীমান্তের মানচিত্র বদলায়নি, বহু মানুষের পরিচয় ও ভবিষ্যৎও আমূল বদলে দিয়েছিল।

Also Read |  পরের স্টেশন মোহনবাগান! মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে মেট্রোর মানচিত্রে শতাব্দীপ্রাচীন ক্লাব

Also Read | কংগ্রেসের কারণে কলকাতা ছাড়েন তসলিমা! বিস্ফোরক তৎকালীন শরিক সিপিএম নেতা

Also Read | IRCTC-এর ৯ দিনের তীর্থযাত্রা ট্রেন: জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে দ্বারকা-অক্ষরধাম, ভাড়া ও রুট জানুন

Also Read | মিরিক লেককে আরও সুন্দর করতে ১০০কোটির পর্যটন প্রকল্প শুভেন্দু সরকারের

Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *